বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২.

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ধারায় কৃষক জমির মালিকানা হারিয়েছেন। মালিকানা কলকাতার বাবুদের ঘরে গেছে। তার সঙ্গে উৎপাদনের শৃঙ্খলা ভেঙে গেছে। মন্বন্তরে মন্বন্তরে উৎপাদনের কেন্দ্র গ্রাম থেকে সরে শহরে গেছে। কারিগর তাঁর স্বাধীন পেশা হারিয়েছেন। কৃষক জমি হারিয়ে কৃষিশ্রমিক হয়েছেন। কারও ঠিকানা হয়েছে শহরে। নদ-নদী জীবনের উৎস হওয়ার বদলে দুঃখের কারণ হয়েছে। আমরা একে অর্থনীতির ভাষায় পুঁজিবাদের বিকাশ বলি!

কিন্তু যাঁদের কানাডা-আমেরিকায় নাগরিকত্ব আছে, তাঁরা এখানে মন্ত্রী হন, এমপি হন। করোনায় বিশেষ বিমানে নাগরিকত্বের সুবিধা নিয়ে বিদেশ যান। মুরাদেরা মন্ত্রিত্বের মধু পান শেষে দেশ ছাড়েন। কিন্তু জমিটুকু না থাকায় আসপিয়া-মিমদের চাকরি হয় না।

ব্রিটিশ রাষ্ট্র ভূমিহীনদের ক্রিমিনাল মনে করত। এখনো যে করে, আসপিয়ার ঘটনা সামনে না এলে কুষ্টিয়ার মিমের ঘটনা বোঝা যেত না। এর আগে একই কারণে সিলেটের চা-বাগানের কয়েকজন চাকরিপ্রার্থী পুলিশে যোগ দিতে পারেননি। চা-বাগানের খবর ভাইরাল করার মতো কেউ ছিলেন না

৩.

বরিশালের যোগেন মণ্ডল। তিনি পাকিস্তানের প্রথম আইনমন্ত্রী ছিলেন। তিনি জমিদারি উচ্ছেদ নিয়ে শেরেবাংলাকে প্রশ্ন করেছিলেন, তাঁর মতো জালুয়ারা স্বাধীন পাকিস্তানে কী পাবেন? স্বাধীন পাকিস্তানে কৃষক জমি পেয়েছেন। কিন্তু জেলে, তাঁতি, তেলিসহ জনসংখ্যার যে বিরাট অংশ কৃষক ছিলেন না, তাঁরা স্রেফ নিশ্চিহ্ন হয়েছেন। পূর্ব পাকিস্তানে তেভাগা হয়েছে, বড়জোর আধিয়ার হয়েছেন। স্বাধীন পাকিস্তানে তাই যোগেন মণ্ডলের জায়গা হয়নি। ’৬৯-এ জোতদারের গোলা তাঁরাই জ্বালিয়েছেন এবং ঢাকার রাজপথে এসেছেন আদমজী থেকে, টঙ্গী থেকে। ’৭১-এ বন্দুকের মুখে জান দিয়েছেন তাঁরাই।

ব্রিটিশের আইনে যাঁদের জমির ব্যক্তিমালিকানা নেই, তাঁরা চাকরি পেতেন না। এ কারণে সাঁওতাল, মুণ্ডা, গারো, হাজংসহ যাঁরা সামাজিক মালিকানায় বিশ্বাসী ছিলেন, তাঁরা চাকরি পেতেন না। ফকির-সন্ন্যাসীরাও জমির মালিক ছিলেন না। ব্রিটিশ কোম্পানি যে নবাবের বাহিনী ভেঙে দিল, তারা আর থিতু হয়নি। কিন্তু জমি থাকা মানে তার আলে বন্দী হয়ে যাওয়া। কৃষকদের জোর করে নীল চাষ করানো গেছে। কিন্তু জমির আলে যাঁরা বাধা ছিল না, তাঁরা লড়াই চালিয়ে গেছেন শেষ পর্যন্ত। তাই ব্রিটিশ রাষ্ট্র ভূমিহীনদের ক্রিমিনাল মনে করত। এখনো যে করে, আসপিয়ার ঘটনা সামনে না এলে কুষ্টিয়ার মিমের ঘটনা বোঝা যেত না। এর আগে একই কারণে সিলেটের চা-বাগানের কয়েকজন চাকরিপ্রার্থী পুলিশে যোগ দিতে পারেননি। চা-বাগানের খবর ভাইরাল করার মতো কেউ ছিলেন না!

প্রচলিত আইনের হেফাজতের নামে ১৪৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘এই সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে সব প্রচলিত আইনের কার্যকারিতা অব্যাহত থাকবে। তবে অনুরূপ আইন এই সংবিধানের অধীন প্রণীত আইনের দ্বারা সংশোধিত বা রহিত হতে পারবে।’ আর ১৫২ অনুচ্ছেদে ‘প্রচলিত আইন’ অর্থাৎ এ সংবিধান প্রবর্তনের অব্যবহিত পূর্বে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমানায় বা এর অংশবিশেষে আইনের ক্ষমতাসম্পন্ন কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সক্রিয় থাকুক বা না থাকুক, এমন যেকোনো আইন। ব্রিটিশ পুলিশ আইন যে বদলায়নি, তা আরেকবার বোঝা গেল। ব্রিটিশ পুলিশ আইনে শ্রমজীবী অর্ধেক জনগোষ্ঠী তাহলে বেনাগরিক?

প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে আসপিয়া-মিমরা হয়তো চাকরি পাবেন। কিন্তু যাঁদের খবর পত্রিকার পাতায় আসবে না, যাঁদের ভাইরাল হওয়ার ভাগ্য হবে না, তাঁরা? রাষ্ট্র তো ব্যক্তির ইচ্ছাধীন ব্যাপার নয়। গণতান্ত্রিক আইন ছাড়া গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ দুরাশা মাত্র।

  • নাহিদ হাসান রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সাবেক সভাপতি। [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন