বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

শুল্ক ও আবগারি বিভাগে আমার এক কনিষ্ঠ সহকর্মী তাঁর বিয়েতে আমাদের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে দাওয়াত করতে আমার শরণাপন্ন হন। আমি তাঁকে নিয়ে গেলে তিনি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে ভবিষ্যৎ জীবন গড়ার বিষয়ে উপদেশ চাইলেন। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তাঁকে বললেন, ‘তুমি মেধাবী ছেলে, নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই গড়বে। আমার পরামর্শের প্রয়োজন হবে না। তবে তোমাকে বিয়ের দাওয়াত করার ব্যাপারে একটা পরামর্শ দিতে পারি।’ ‘স্যার বলেন, আপনার পরামর্শ শিরোধার্য,’ কনিষ্ঠ সহকর্মীর ব্যগ্র জবাব। ‘শোনো, তোমার বিয়ের অনুষ্ঠানে, একান্তই সহকর্মী না হলে বিভাগের অধস্তন কর্মকর্তাদের দাওয়াত দেওয়া পরিহার করবে।’ ‘কেন স্যার?’ কনিষ্ঠ সহকর্মীর উদ্বিগ্ন প্রশ্ন। জবাবে স্যার বললেন, ‘তারা তোমাকে তাদের আয়ের সংগতিপূর্ণ নয়, এমন উচ্চ মূল্যের উপহার প্রদান করবে, যা তোমার গ্রহণ করা উচিত হবে না।’ আমি ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দুজনেই অফিসার্স ক্লাবে বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিই। গিয়ে দেখি, আমার কনিষ্ঠ সহকর্মী পরামর্শটি একটু বেশিই আমলে নিয়েছেন! অধস্তন কর্মকর্তাদের কাউকেই তিনি আমন্ত্রণ করা থেকে বাদ দেননি এবং তাঁদের সবার হাতেই দামি দামি উপহার! আজকাল তাই পরামর্শ দিতে ভয় পাই। কারণ, উল্টোটাই যে ঘটবে, এটা প্রায় নিশ্চিত। তবু সাবেক সহকর্মীর অনুরোধে আবার লিখতে বসেছি। পরামর্শ গোল্লায় যাক। কিন্তু সাবেক সহকর্মীকে নারাজ করে এ বয়সে বন্ধুহীন হওয়া সমীচীন হবে না।

কেন এ সিদ্ধান্ত

আগের লেখাতেই সরকার অনুসৃত ‘আর্থিক নিষ্পেষণ’ বা ফিন্যান্সিয়াল রিপ্রেশন বিষয়ে বলেছি। এর উদ্দেশ্য হলো ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মেয়াদি আমানতের সুদের হার কমিয়ে সরকারের ব্যয় কমানো। এ সিদ্ধান্তের পক্ষের যুক্তি ছিল, সঞ্চয়পত্রের সুদের উচ্চ হার—১. এর অপব্যবহার করছে কেউ কেউ—একই ব্যক্তি একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মেয়াদি আমানত রাখছে। এ অপব্যবহার রোধের জন্য প্রক্রিয়াটি ডিজিটাইজ করা হলে আমরা তাকে স্বাগত জানাই। ২. এর কারণে ব্যাংকে মেয়াদি আমানত কমেছে, ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ৩. ফলে শেয়ারবাজারে অর্থলগ্নি হচ্ছে না। পুঁজিবাজার চাঙা হচ্ছে না।

এখন যুক্তিগুলো একে একে দেখা যাক। বাংলাদেশ ব্যাংকসূত্রে জানা গেছে, গত জুন পর্যন্ত ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে ২ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে একেবারে অলস পড়ে আছে ৬২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অলস এই অর্থের বিপরীতে কোনো সুদ পায় না ব্যাংক। এতে অধিকাংশ ব্যাংক এখন আমানত নিতে অনীহা দেখাচ্ছে। করোনাভাইরাসের প্রভাব শুরুর পর বাংলাদেশ ব্যাংক গত বছর বাজারে তারল্য বাড়াতে নানা নীতিসহায়তা দিলেও ঋণের চাহিদা বাড়েনি। যে কারণে অলস অর্থ বাড়ছে। তাই সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর যুক্তিটি নিতান্তই অসার।

শেয়ারবাজার চাঙা করার দায়িত্ব অবসরভোগীদের কেন নিতে হবে? দু–দুবার শেয়ারবাজার বিপর্যয়ের পরও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সর্বস্ব খোয়াতে অবসরভোগীরা সেখানে যাবেন কোন দুঃখে? পুঁজিবাজারে ভালো বন্ড একটিও কি আছে, যেখানে অবসরভোগীরা নিশ্চিন্তে বিনিয়োগ করতে পারবেন? তাই সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমালেই অবসরভোগীরা পুঁজিবাজারে যেতে বাধ্য হবেন—এমন আশা করা অমূলক। পুঁজিবাজারে ভালো বন্ড আসুক, বাজার অস্থিরতার নেপথ্যের কুশীলবদের শাস্তি হোক, তাহলে অবসরভোগী–সাধারণ নাগরিকনির্বিশেষে সবাই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে এগিয়ে আসবেন।

সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর সপক্ষে বাজার অর্থনীতির দোহাই দেওয়া হচ্ছে। আমানত ও ঋণের সুদের হার কোন বাজার অর্থনীতিতে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়!

আসল কারণ কী

সরকারি তহবিল ব্যবস্থাপনার বিষয়টি আদতে খুবই সহজ। বাজেটঘাটতি সহনীয় সীমার মধ্যে রেখে আয় ও ব্যয়ের সংগতি বিধান করতে হবে। আবর্তক ও উন্নয়ন ব্যয় বেড়ে গেলে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। আর রাজস্ব আদায় কমে গেলে আবর্তক ও উন্নয়ন ব্যয় কমাতে হবে।

গত অর্থবছর (২০২০-২১) সংশোধিত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা। সেখানে আদায় হয়েছে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৮৮১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আদায় কমেছে ৪১ হাজার ১১৯ কোটি টাকা। এ আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ কম। করোনা–পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দার কারণে এটা ঘটেছে। দেশে ও বিশ্বব্যাপী করোনা পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা দূর না হওয়ায় বর্তমান অর্থবছরেও রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির রেশ কাটবে বলে মনে হয় না। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন ছিল অপ্রয়োজনীয় আবর্তক ব্যয় কমানো ও অর্থহীন উন্নয়ন প্রকল্প কাটছাঁট করে বাদ দেওয়া। প্রয়োজন ছিল অপব্যয় হ্রাসের ও দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার। এর কোনোটাই করা হয়নি।

শেয়ারবাজার চাঙা করার দায়িত্ব অবসরভোগীদের কেন নিতে হবে? দু–দুবার শেয়ারবাজার বিপর্যয়ের পরও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সর্বস্ব খোয়াতে অবসরভোগীরা সেখানে যাবেন কোন দুঃখে? পুঁজিবাজারে ভালো বন্ড একটিও কি আছে, যেখানে অবসরভোগীরা নিশ্চিন্তে বিনিয়োগ করতে পারবেন?

আবার রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল উদ্ভাবনী পদ্ধতি অনুসরণের। সম্প্রতি মাছরাঙা টিভির একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, কারওয়ান বাজারের সরকারি রাস্তায় দোকান বসিয়ে সেখান থেকে তিন শিফটে নিয়মিত ভাড়া আদায় করছেন সরকারি দলের সমর্থক এক পাতিনেতা। তিনি আবার আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের আশীর্বাদপুষ্ট। নানান জায়গায় সরকারি সম্পত্তি অবৈধভাবে ভাড়া দিয়ে যে পরিমাণ অর্থ আদায় হয়, তার অর্ধেকও যদি নিয়ম করে সরকারের আয়ের অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তার পরিমাণ ৪১ হাজার ১১৯ কোটি টাকা রাজস্বঘাটতির বেশি ছাড়া কম হবে না।

তাই প্রয়োজনীয় রাজস্ব আদায়, অপ্রয়োজনীয় আবর্তক ব্যয় কমানো ও অর্থহীন উন্নয়ন প্রকল্প কাটছাঁট করে বাদ না দেওয়া, অপব্যয় হ্রাস ও দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার সব দায়দায়িত্ব এখন পড়েছে অবসরভোগী ও সঞ্চয়ের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর ওপর। সরকারি দেনার দায় কমিয়ে সরকারের ব্যয় হ্রাসের দায়িত্ব পড়েছে তাঁদের ওপর।

সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমার খাঁড়ার ঘা তাই নেমে এসেছে তাঁদের ওপর, যাঁদের প্রতি সরকারের কোনো দায়িত্ব নেই। কেননা, তাঁরা সরকারের লাভ বা ক্ষতি কোনোটাই করতে পারবেন না। অন্যদিকে, রাজস্ব ফাঁকি প্রদানকারী ব্যবসায়ী ও তাঁদের সহযোগী কর্মকর্তা, উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদার ও দুর্নীতিতে সহযোগী ব্যক্তিরা প্রবল পরাক্রমশালী। তাঁরা চাইলেই পাশা উল্টে দিতে পারেন।

এমনিতেই করোনার অভিঘাতে বয়োজ্যেষ্ঠ এসব অবসরভোগী ব্যক্তি নিজের কিংবা পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করে পর্যুদস্ত হয়ে প্রান্তসীমায় এসে ঠেকেছেন। তাঁদের জীবনযাত্রায় বোঝার ওপর শাকের আঁটি হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের এই সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর সিদ্ধান্ত। স্বরহীন এমন সব মানুষের কথা মাথায় রেখেই জীবনানন্দ দাশ সম্ভবত তাঁর ‘সমারূঢ়’ কবিতায় লিখেছিলেন ‘চোখে তার অক্ষম পিঁচুটি।’

করোনার কারণে দরিদ্র হতদরিদ্র হয়েছে। সরকারের ভ্রান্ত আর্থিক নীতির কারণে মধ্যবিত্ত এখন নিম্নবিত্ত হবে কি?

মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সাবেক সচিব ও অর্থনীতিবিদ

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন