default-image

বেশ কিছুদিন আগে একটি প্রচারমাধ্যম আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভালো ও মন্দ স্পর্শ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য শিশু, অভিভাবক ও শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করতে। সেখানে শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করেছিলাম, বাড়িতে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কী কৌশলে তাঁরা শিশুদের এ বিষয়ে সচেতন করতে পারেন। শিক্ষক-অভিভাবকদের সামনে শিশুদের একটি সেশন পরিচালনা করে দেখিয়েছিলাম, কীভাবে শিশুদের সঙ্গে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলা যেতে পারে।

শিক্ষক-অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলার সময় উপলব্ধি করেছি, বিষয়টি নিয়ে আমরা বড়রা অনেক বেশি অস্বস্তি অনুভব করি। কিন্তু শিশুরা বেশ স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় অংশ নিয়েছিল। তাদের অংশগ্রহণ ছিল অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত। আমার সেদিনের অভিজ্ঞতা বলে, সামান্য প্রস্তুতি আর অল্প কিছু কৌশলের মাধ্যমে বিষয়গুলো সম্পর্কে আমরা শিশুদের সচেতন করে তুলতে পারি। তবে বিষয়গুলো উপস্থাপন করতে হবে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে সাবলীলভাবে।

বিজ্ঞাপন

প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিশুরা, বিশেষত মেয়েশিশুরা বড় হচ্ছে মন্দ স্পর্শের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়ে। নোংরা হাতের মন্দ স্পর্শ বিবর্ণ করে দেয় শিশুর রঙিন শৈশব। মন্দ স্পর্শ সুস্পষ্টভাবেই যৌন নির্যাতন। যৌন নির্যাতনের ভয়াবহতার সঙ্গে প্রতিদিন পরিচিত হচ্ছে শিশুরা, যার পরিসংখ্যান আমাদের অজানা। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, যেসব শিশু এই অপরাধের শিকার হচ্ছে, তারা অনেকেই জানে না যে এই অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণগুলো আসলে অপরাধ। এ কারণে প্রকাশিত হচ্ছে না এই ধরনের অপরাধের খবর। অথচ এর ফলে ব্যাহত হচ্ছে শিশুর মানসিক বিকাশ। ভালো ও মন্দ স্পর্শ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব শিশুদের বিপদগ্রস্ত করছে বারবার। মন্দ স্পর্শ যদিও শিশুর শরীরকে ছুঁয়ে যায়, কিন্তু এর কদর্যতা শিশুর মনোজগৎকে কয়েক গুণ বেশি প্রভাবিত করে।

নতুন এক দুর্ভাবনা হিসেবে এখন হাজির হয়েছে সাইবার অপরাধ। বিকৃত মন্দ আনন্দের কালো থাবা শিশুদের ছুঁয়ে যাচ্ছে ভার্চ্যুয়াল জগতেও। সেখানে রোজ ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছে শিশুরা। ভালো আর মন্দের পার্থক্য বোঝার আগেই শিশুরা অনলাইনে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতিতে ভার্চ্যুয়াল জগতে যুক্ত হয়েছে বিপুলসংখ্যক শিশু। সম্প্রতি আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে, করোনা পরিস্থিতিতে ৩০ শতাংশ শিশু সাইবার অপরাধের শিকার হয়েছে। পরিস্থিতির উত্তরণে শিশুদের ভালো ও মন্দ স্পর্শ সম্পর্কে সঠিকভাবে জানানোর কোনো বিকল্প নেই।

২০১৮ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চাইল্ড অ্যাডোলেসেন্ট অ্যান্ড ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রির সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ একটি গবেষণা প্রকাশ করেছিলেন। এ গবেষণায় উঠে এসেছিল শিশুদের ওপর যৌন হয়রানির ভয়াবহ চিত্র। তাঁর এই গবেষণায় দেখা যায়, ৭৫ শতাংশ যৌন হয়রানির ঘটনাই ঘটে পরিবারের ঘনিষ্ঠজন, বন্ধু বা আত্মীয়দের মাধ্যমে। অনেকে ভাবেন, শুধু নারী কিংবা মেয়েশিশুই মন্দ স্পর্শ ও যৌন হয়রানির শিকার হয়, যা একটি অসম্পূর্ণ ধারণা।

তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, যেখানে প্রতি চারটি মেয়েশিশুর মধ্যে একটি মেয়েশিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়; সেখানে ছেলেদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা প্রতি ছয়জনে একজন। কাজেই নিরাপদ নয় ছেলেশিশুরাও। অনেকে আবার শুধু পুরুষকেই অপরাধীর তালিকায় রাখেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, কিছুসংখ্যক নারীও এই ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত। অনেক অভিভাবক আছেন, যাঁরা শিশুদের মন্দ স্পর্শের ঝুঁকির বিষয়টি তেমন আমলেই নেন না। আবার অনেকে আছেন বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, অথচ এ বিষয়ে শিশুদের জানাতে কুণ্ঠাবোধ করেন। কিন্তু শিশুদের নিরাপদে রাখতে হলে এসব বিষয় নিয়ে শিশুদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। তাই সমস্ত অস্বস্তি ঝেড়ে ফেলে বিষয়গুলো নিয়ে শিশুদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

বিজ্ঞাপন

চিন্তার বিষয় হলো এসব নিয়ে শিশুদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলা যেতে পারে, সে সম্পর্কে মা-বাবা কিংবা অভিভাবকদের জ্ঞানের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষকেরাও এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করেন। শরীরের একান্ত ব্যক্তিগত অংশগুলো শিশুদের চেনানো। এই অংশগুলো কেন ব্যক্তিগত, সেটি বোঝানো, ভালো ও মন্দ স্পর্শ বলতে কী বোঝায়, মন্দ স্পর্শের ঝুঁকিগুলো কী কী, কীভাবে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা যায়, দূরের এমনকি কাছের মানুষ কীভাবে শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, এসব অভিজ্ঞতায় করণীয় কী, এ বিষয়গুলো শিশুদের বোঝানো যে খুব কঠিন তা কিন্তু নয়। সামান্য কিছু কৌশল অবলম্বন করলেই এই বিষয়গুলো সহজেই শিশুকে বোঝানো যায়। তবে এর জন্য চাই নিজেদের সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি।

এ ছাড়া নিশ্চিত করতে হবে অনুকূল পারিবারিক পরিবেশ। আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো, বিষয়টি সম্পর্কে আমাদের সচেতনতামূলক উপকরণের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। এ বিষয়ে শিশুদের উপযোগী বই বাজারে নেই বললেই চলে। আবার এসব বিষয় নিয়ে বই প্রকাশ করতেও আগ্রহী নন অধিকাংশ প্রকাশক।

শিশুদের শৈশবকে মন্দ স্পর্শের ঝুঁকিমুক্ত করতে হলে এই বিষয়ে ব্যাপকভাবে কাজ করতে হবে। শিশুদের ভালো আর মন্দ স্পর্শ সম্পর্কে সচেতন করতে স্কুলপর্যায়ে সচেতনতামূলক ওয়ার্কশপ করা যেতে পারে। শিশুরা যেন নির্ভয়ে খোলামেলাভাবে বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে পারে এবং কথা বলতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। লক্ষ রাখতে হবে, কোনোভাবেই শিশুরা যেন ভয় না পায়। শুধু শিশুদের নিয়ে কাজ করলেই হবে না, বাসায় অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে মা-বাবা ও অভিভাবককেও এ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

এ ছাড়া ভালো ও মন্দ স্পর্শ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য শিশুদের বয়সের উপযোগী বই, অভিভাবকদের প্রস্তুতির জন্য উপকরণ এবং সচেতনতা সৃষ্টির জন্য প্রচুর যোগাযোগ উপকরণ তৈরি করতে হবে। বড়রা যেন অস্বস্তি ঝেড়ে ফেলে শিশুদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন, সে ব্যাপারে তাঁদের উৎসাহিত করতে হবে। শিশুর প্রতি ক্রমবর্ধমান যৌন সহিংসতার চিত্রটি জানান দিচ্ছে, আর দেরি নয়, জেগে উঠতে হবে এখনই। শিশুদের শুনতে হবে, বুঝতে হবে, বলতে হবে। আমরা চাই, প্রতিটি শিশুর জন্য নিশ্চিত হোক নিরাপদ শৈশব।

নিশাত সুলতানা লেখক ও গবেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন