মহাদুর্যোগ থেকে মহাসুযোগ

বিজ্ঞাপন

সারা পৃথিবীর মতো করোনাভাইরাস মহামারি আমাদের জন্য মহাদুর্যোগ তৈরি করেছে। এটি জনগণের জন্য জীবনের ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। আমাদের অর্থনীতিকে তছনছ করে দিয়েছে। ফলে দেশের একটি বিরাট জনগোষ্ঠী তাদের জীবিকা হারিয়েছে। করোনাভাইরাসের বিপর্যয়ের সঙ্গে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো যুক্ত হয়েছে দক্ষিণবঙ্গে ঘূর্ণিঝড় আম্পান এবং পরবর্তীকালে উত্তরবঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা। এসব বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে আমাদের জনগোষ্ঠীর বিরাট অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে, যা আমাদের গত কয়েক যুগের অর্জনকে ধূলিসাৎ করে দেবে।

মহাদুর্যোগ থেকে আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে অনেকগুলো প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে একটি হলো আমাদের অর্থনীতি, রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থার মহাদুর্বলতা। ভাইরাসের প্রভাব নিয়ে সব অনিশ্চয়তার মধ্যে এই মহাদুর্বলতা আমাদের দুশ্চিন্তার অন্যতম কারণ। অর্থনীতির ক্ষেত্রে দুর্বলতার বড় উৎস হলো আমাদের ব্যাকিং খাতে চরম বিশৃঙ্খলা ও মহালুটপাট। সিপিডির হিসাবমতে, গত এক দশকে আমাদের ব্যাংকিং খাত থেকে ২৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি লুট হয়েছে। উপর্যুপরি লুটপাটের কারণে জনগণ শেয়ারবাজারের ওপর আস্থা হারিয়েছে, যা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের লক্ষ্যে পুঁজি সংগ্রহের পথ সংকুচিত করে ফেলেছে। নিঃসন্দেহে এর ফলে কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হবে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আরেকটি চরম মহাদুর্বলতা হলো অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের প্রাধান্য। আমাদের কর্মসংস্থানের অন্তত ৮৫ শতাংশ আসে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত থেকে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত দুর্যোগকালে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা আমরা হাড়ে হাড়ে অনুভব করেছি বর্তমান মহামারিকালে। দুর্ভাগ্যবশত অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের পক্ষে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো সহজসাধ্য নয়।

এ ছাড়া আমাদের কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় বহুলাংশে তৈরি পোশাক ও বিদেশে শ্রমিক রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। করোনার কারণে এই দুই খাত ব্যাপকভাবে ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং সামনে এর প্রভাব আরও টের পাওয়া যাবে। শ্রমিক আমদানিকারক দেশগুলোর অর্থনীতিতে ব্যাপক ধস নামার ফলে বিদেশে কর্মরত বহু শ্রমিক জীবিকা হারিয়েছেন। আর অবৈধভাবে যাঁরা বিদেশে কর্মরত ছিলেন, তাঁদের পক্ষে পুরোনো কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। 

আমাদের দ্বিদলীয় ভারসাম্যমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা বর্তমানে ভেঙে পড়েছে। সংসদে কিংবা সংসদের বাইরে কোথাও সরকারের কোনো অবস্থান বা নীতি নিয়ে বিরোধিতা নেই। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে সরকারের ‘হরাইজন্টাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ বা সমান্তরাল দায়বদ্ধতার ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ ছাড়া সব প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের ফলে সরকার ও সরকারি দল একাকার হয়ে গেছে, যা সরকারকে বেসামাল করে তুলেছে। এ ধরনের দায়বদ্ধতার অনুপস্থিতি ও বেসামাল পরিস্থিতি সরকারকে লাগামহীন হতে এবং দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নকে নিয়ন্ত্রণহীন পর্যায়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করছে।

দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন নিয়ন্ত্রণহীন পর্যায়ে পৌঁছানোর আরেকটি কারণ হলো সরকারের ‘ভার্টিক্যাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ বা নিম্নমুখী দায়বদ্ধতার অবসান। ক্ষমতাসীনদের নিম্নমুখী দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠিত হয় নির্বাচনের মাধ্যমে। প্রতি পাঁচ বছর পর ক্ষমতাসীন দলকে যদি জনগণের দ্বারস্থ হতে হয় এবং জনগণ তাদের নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেন, তাহলেই এ ধরনের দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠিত হয়। দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে কারচুপিমুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের নিশ্চয়তা থাকলে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, ‘সরকার পরিচালনায় দুর্নীতি ও কালোটাকা কামাই করবার প্রবণতাও কমতে বাধ্য হবে...সরকার সচেতন হবে, সমাজ থেকে দুর্নীতির ব্যাধি কিছুটা হলেও লোপ পেতে শুরু করবে’ (দারিদ্র্য দূরীকরণ: কিছু চিন্তাভাবনা, আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৫, পৃ. ৭৮)

দুর্ভাগ্যবশত নির্বাচন কমিশনসহ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সীমাহীন দলীয়করণের কারণে আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা বর্তমানে ভেঙে পড়েছে। ফলে ক্ষমতাসীনদের এখন আর জনগণের মতামতের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করলেও চলে। যাঁরা তাদের ক্ষমতায় এনেছেন ও টিকিয়ে রেখেছেন, তাঁদের প্রতি মনোযোগী হওয়াই সরকারের জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে সরকারের তেমন আগ্রহ লক্ষ করা যায় না। দু-এক ক্ষেত্রে অতি বাড়াবাড়ির কারণে কিংবা ব্যাপক আলোচিত কাউকে গ্রেপ্তার করলেও তাঁদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে সরকারের অপারগতা এবং তাঁদের গডফাদারদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখা দুর্নীতির মূলোৎপাটনে সরকারের জিরো টলারেন্সের ঘোষণাকে নিছক স্লোগানেই পরিণত করেছে।

দুর্নীতির লাগামহীন বিস্তারের মাধ্যমে সমাজে অপরাধী চক্রের উদ্ভব হয়, শাসনব্যবস্থায় অবক্ষয় ঘটে, রাষ্ট্রের কার্যকারিতা লোপ পায় এবং দেশ অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হওয়ার দিকে এগোয়। ফায়দা প্রদানের রাজনীতি এবং ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’–এর চর্চার কারণে বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে সে পথেই হাঁটছে। তাই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে না পারলে আমাদের সমান্তরাল ও নিম্নগামী দায়বদ্ধতার কাঠামো কার্যকর হবে না, আমরা দুর্নীতির পাগলা ঘোড়ায় লাগাম লাগাতে পারব না।

আমাদের মহাদুর্বলতার আরেকটি দিক হলো ভঙ্গুর শাসনব্যবস্থা। একটি রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা তিনটি স্তম্ভের ওপর দণ্ডায়মান—আইন, বিধিবিধান ও এগুলোর প্রয়োগ; নিয়ম-পদ্ধতি এবং প্রতিষ্ঠান। জনকল্যাণমুখী আইন ও এগুলোর সঠিক প্রয়োগ হলে, নিয়ম-পদ্ধতি যথাযথভাবে কাজ করলে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করলে শাসনব্যবস্থা কার্যকারিতা প্রদর্শন করে ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের ভঙ্গুর শাসনব্যবস্থার কারণে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা বর্তমানে কেন্দ্রীভূত হয়ে গেছে, করোনাভাইরাসের অভিঘাত থেকে উত্তরণের পথে যা বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিশেষে, করোনাভাইরাসের সৃষ্ট মহাদুর্যোগ সফলভাবে মোকাবিলা করতে হলে আমাদের অর্থনীতি, রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থায় আমূল সংস্কার করতে হবে, এগুলোকে ঢেলে সাজাতে হবে। তবে এসব সর্বব্যাপী ও সর্বগ্রাসী সমস্যা এখন আর সরকার বা সরকারি দলের সমস্যা নয়, এগুলো জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং জাতীয়ভাবে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এগুলোর সমাধান করতে হবে। বর্তমান মহাদুর্যোগকে মহাসুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো যায়। আশা করি, জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সরকার সাহসিকতা প্রদর্শন করে এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করবে এবং কতগুলো মৌলিক বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টির উদ্যোগ নেবে। তা না হলে আমরা আমাদের আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেব, যার জন্য ইতিহাস আমাদের কোনো দিন ক্ষমা করবে না। 

ড. বদিউল আলম মজুমদার সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন