বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বৈশ্বিক স্তরে চ্যালেঞ্জ এবং তা মোকাবিলায় নেওয়া ব্যবস্থার মধ্যে বিস্তর ফারাক দেখা যাচ্ছে এবং সে ব্যবধান দিনকে দিন বেড়ে চলেছে। কোভিড-১৯ মহামারি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সার্বিক প্রস্তুতির অপ্রতুলতাকে প্রকাশ করে দিয়েছে। আমরা মহামারির তৃতীয় বছরে পদার্পণ করছি, কিন্তু চীনের অসহযোগিতার কারণে এখনো এর উৎপত্তি সম্পর্কে জানতে পারিনি। আমরা যেটি জানতে পেরেছি, সেটি হলো নিশ্চিতভাবে ৫০ লাখের বেশি এবং কারও কারও ধারণামতে দেড় কোটির বেশি লোক মারা গেছে। আমরা আরও জানতে পারছি, প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ (তাদের অনেকেই আফ্রিকার) এখনো কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজই পায়নি। আমরা জানতে পেরেছি, মহামারির কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে।

জলবায়ু ঝড়ের গতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে। শিল্পবিপ্লবের সূচনাকালের তুলনায় এ পর্যন্ত ধরিত্রী ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস উত্তপ্ত হয়েছে এবং সেই উষ্ণায়নের গতি বাড়ছেই। চরমভাবাপন্ন আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ আগের চেয়ে ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার অনেক বেড়েছে। জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় সরকারগুলো আরও ভালো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে প্রতিশ্রুতির সঙ্গে তাদের কাজের মিল দেখতে এখনো অনেক বাকি আছে। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দুটি দেশ চীন ও ভারত যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার সঙ্গে তাদের পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্যে বিস্তর ফারাক দেখা যাচ্ছে।

গণতন্ত্র শুধু মিয়ানমার ও সুদানেই কোণঠাসা হচ্ছে তা নয়, লাতিন আমেরিকার একটি অংশে এমনকি ইউরোপেও কর্তৃত্ববাদ হানা দিয়েছে। লিবিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেনের মতো হাইতি এবং ভেনেজুয়েলাও কার্যত ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

সাইবার জগৎ শেরিফবিহীন আদিম পশ্চিমা সমাজের মতো চলছে, যেখানে কোন আচরণ কতটুকু গ্রহণযোগ্য, সে সীমানা টেনে দেওয়ার ইচ্ছা বা সামর্থ্য কারোর নেই। অন্যদিকে পারমাণবিক কার্যক্রমের বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। উত্তর কোরিয়া তার পারমাণবিক অস্ত্রের পরিমাণ, গুণমান এবং ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ও নির্ভুলতা বাড়িয়েছে। ২০১৮ সালে ইরান চুক্তি থেকে একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে। শীতল যুদ্ধের সময় বড় পরাশক্তিগুলোর মধ্যে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো, এখন তার চেয়ে তা বেশি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি হয়েছে। এ দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব বাড়ছে। তাইওয়ান নিয়ে দুই দেশের তিক্ততার পারদ দ্রুত চড়ছে।

অন্যদিকে রাশিয়া তর্কাতীতভাবে আগের তুলনায় বেশি আক্রমণাত্মক অবস্থায় রয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের তিন দশক পরে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ন্যাটোর অগ্রযাত্রাকে থামাতে বা সম্ভব হলে অকার্যকর করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পুতিন তাঁর প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেন এমন দেশ ও সরকারকে অস্থিতিশীল করতে সামরিক শক্তি প্রয়োগ এবং সাইবার আক্রমণ করতে চাইছেন। পুতিনের এখনকার লক্ষ্যবস্তু ইউক্রেন হলেও তাঁর ছুড়ে দেওয়া কৌশলগত চ্যালেঞ্জের বিস্তৃতি আরও ব্যাপক।

যুদ্ধ ও দুর্যোগের কারণে বিশ্বব্যাপী ৮০ লাখের বেশি মানুষের, অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনের মধ্যে একজনের নিজ ভিটাবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়া বৈশ্বিক উদ্বেগে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গণতন্ত্র শুধু মিয়ানমার ও সুদানেই কোণঠাসা হচ্ছে তা নয়, লাতিন আমেরিকার একটি অংশে এমনকি ইউরোপেও কর্তৃত্ববাদ হানা দিয়েছে। লিবিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেনের মতো হাইতি এবং ভেনেজুয়েলাও কার্যত ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

সবচেয়ে বড় বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানকার অভ্যন্তরীণ পরিসরে পাঁচ বছর আগে যে অস্থিরতা ছিল, এখন তার চেয়ে তা অনেক বেশি। সেখানে রাজনৈতিক মেরুকরণ বেড়েছে এবং রাজনৈতিক সহিংসতা ভয়ানক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। সেখানেও রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া মসৃণ হওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না। এটি স্পষ্ট যে এমনি এমনি এ পরিস্থিতি ঠিক হয়ে যাবে না। পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হলে রাজনীতি ও অর্থনীতিসহ সব ক্ষেত্রে উদ্ভাবন, কূটনীতি এবং সমন্বয়—এ তিন জিনিস দরকার। পরিতাপের বিষয়, শেষ দুটির জোগানে স্বল্পতা আছে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

  • রিচার্ড হাস কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের প্রেসিডেন্ট

মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন