বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কয়েক দিন আগে এক জাপানি মা তাঁর দুই সন্তানের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে বাংলাদেশে ছুটে আসেন। তাঁর অভিযোগ, বাংলাদেশি স্বামী তাঁকে না জানিয়েই দুই সন্তানকে টোকিও থেকে ঢাকায় নিয়ে এসেছেন। তিনি আইনি লড়াইয়ে আংশিক জয়ীও হয়েছেন। মহামান্য আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, বাবা-মা সন্তানদের নিয়ে একই বাসায় থাকবেন। জাপানি মা সন্তানদের কাছে পেয়ে খুশি। এ রকম বিচ্ছেদ হওয়া পরিবারে মাকেই বেশি কষ্ট ও যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। আদালত রায় দেওয়ার পরও অনেক মা সন্তানকে ফিরে পান না। পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ বরাবর মায়েদের বঞ্চিত করে আসছে।

প্রথম আলোর অনলাইনে মাগুরা প্রতিনিধি কাজী আশিক রহমানের প্রতিবেদনে আরেক মায়ের করুণ কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার হোগলডাঙা গ্রামের মোমেনা বেগম। বয়স পঁচাত্তর। তাঁর পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন, ছেলেরাও বিয়ে করে আলাদা সংসার করছেন। মোমেনা বেগমের স্বামী শফি উদ্দিন চার বছর আগে মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলেরা তাঁর খোঁজ নেন না। বড় ছেলে ইব্রাহিম খলিফা হোমিও চিকিৎসক। মেজ ছেলে আয়েব আলী কৃষিকাজ করেন। অন্য তিন ছেলে জাহিদুল ইসলাম, নুর ইসলাম ও সুরুজ আলী ব্যবসা-বাণিজ্য করেন। সবাই মোটামুটি সচ্ছল। কিন্তু মাকে ভরন–পোষণ দেন না। অথচ আইনানুযায়ী তাঁরা মাকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য।

২০১৩ সালে এ বিষয়ে আইন প্রণীত হয়। আইনের ৫ ধারার (১) অনুযায়ী, কোনো প্রবীণ ব্যক্তি তাঁর সন্তানদের বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো অভিযোগ আনলে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে, তাঁদের এক লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হবে। আইনে বলা হয়—কোনো সন্তানের স্ত্রী, ছেলেমেয়ে বা নিকটাত্মীয় যদি বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি সন্তানকে দায়িত্ব পালনে বাধা দেন, তাহলে তাঁরাও একই অপরাধে অপরাধী হবেন। ফলে তাঁদেরও একই শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

মোমেনা বেগম প্রথম আলোকে জানান, তাঁর স্বামী মারা যাওয়ার সময় ১১০ শতাংশ চাষযোগ্য জমি রেখে গেছেন। যে জমি তিনি বর্গা দিয়ে রেখেছেন। সেখান থেকে যে টাকা পান, তা দিয়ে নিজের খাওয়া-পরা আর ওষুধ বাবদ খরচ করেন। কিন্তু ছেলেরা চাপ দেন এই জমি তাঁদের ভাগ করে দিতে। না দেওয়ায় মাঝে মধ্যে তাঁকে মারধর করতেন ছেলেরা। গত সপ্তাহে বিচার চাইতে তিনি শ্রীপুরের ইউএনওর কার্যালয়ে যান। অভিযোগ শুনে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন কর্মকর্তা।
এই অবস্থায় বাড়ি ফেরার পর গত ৩০ আগস্ট তাঁকে আবারও মারধর করেন ছেলেরা। ছেলেদের মার খেয়ে তাঁকে ভর্তি হতে হয় মাগুরা জেলা হাসপাতালে। চার দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে ২ সেপ্টেম্বর ছাড়পত্র পান তিনি। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে ওই দিন আবারও ইউএনওর কার্যালয়ে যান তিনি। অভিযোগ শুনে ইউএনও লিউজা-উল জান্নাহ ছেলেদের ডেকে পাঠান। সোমবার পাঁচ ছেলের মধ্যে চারজন সেখানে উপস্থিত হন। সবার কথা শুনে কর্মকর্তা ছেলেদের পুলিশে দেওয়ার নির্দেশ দেন।

এটাই ছিল এই কুলাঙ্গার সন্তানদের উপযুক্ত শাস্তি। কিন্তু মায়ের মন সেই শাস্তি মানতে পারেনি। যে সন্তানেরা মাকে নির্যাতন করে হাসপাতালে পাঠিয়েছেন, সেই সন্তানেরা কারাভোগ করবেন এটা মায়ের সহ্য হয়নি। তিনি হাউমাউ করে কেঁদে ইউএনওর কাছে আরজি জানান, আমার ছেলেদের জেলে পাঠাবেন না। তাঁদের কোনো দোষ নেই। মায়ের আহাজারি শুনে ইউএনও চার ছেলেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেন। মুচলেকা হলো, তাঁরা প্রতিমাসে মাকে এক হাজার করে টাকা দেবেন। এ বিষয়ে ইউএনও লিউজা-উল জান্নাহ বলেন, লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে মোমেনা বেগমের পাঁচ ছেলেকে উপস্থিত হতে বলা হয়েছিল। চার ছেলে উপস্থিত হন। মায়ের ভরণপোষণের জন্য ছেলেদের মাসে এক হাজার করে টাকা দিতে বলা হয়েছে।

চিন্তা করে দেখুন—যে ছেলেরা মাকে খাবার দেন না, খোঁজখবর নেন না, জমি লিখে নেওয়ার জন্য নিয়মিত নির্যাতন চালান, সেই ছেলেদের রক্ষা করার জন্য মা আকুতি করছেন তাঁদের হাতকড়া না পরানোর জন্য। তিনি একজন মহান মা। এ রকম মহান মা বাংলাদেশের ঘরে ঘরে আছেন। পৃথিবীর ঘরে ঘরে আছেন। আবার হয়তো মোমেনা বেগমের ছেলেরা মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করবেন, তাঁকে খাওয়া–পরার টাকা দেবেন না। জমি লিখে দেওয়ার জন্য চাপ দেবেন। তখনো মা তাঁদের ক্ষমা করে দেবেন।

আমরা দেশকেও মা বলে ডাকি। মাতৃভূমি বলি। আমাদের জাতীয় সংগীতে একটি লাইন আছে, ‘মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি।’ মাগুরার মোমেনা বেগমের ছেলেদের মতো আরও অনেক ছেলেই মায়ের বদন মলিন হলে নয়ন জলে ভাসেন না। বরং তাঁরা মায়ের বদন মলিন করে দিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। তাঁরা মায়েদের কষ্ট দেন।

এখন খতিয়ে দেখা যাক, ‘বাংলাদেশ’ নামের মায়ের ছেলেরা কী করছেন। তাঁরা সবাই যে মাতৃভূমির মুখ উজ্জ্বল করছেন তা নয়। বরং যাঁরা ক্ষমতাবান ও ধনবান, তাঁদের একাংশ বাংলা মায়ের সব ধনসম্পদ বিদেশে পাচার করছেন। পিকে হালদার নামের যে ব্যবসায়ী তিন হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে পাচার করে বিদেশে আরামে আছেন, তিনিও এই দেশের সন্তান! তবে কুলাঙ্গার সন্তান।

সম্প্রতি পত্রিকায় দেখলাম, সোহেল রানা নামে পুলিশের এক এসআই ই-অরেঞ্জ নামে বেনামে ব্যবসা করে মানুষের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন এবং পালাতে গিয়ে ভারতে ধরা পড়েছেন।ধরা পড়ার পর এই পুলিশ কর্মকর্তা বড়াই করে বলেছেন, ১১–১২ বছর তিনি গুলশান এলাকায় চাকরি করেছেন। তিনি সেখানকার সবকিছু সম্পকে৴ জানেন। সদ্য সাময়িক বরখাস্ত হওয়া এই কর্মকর্তা বলতে চেয়েছেন, আমি আরও অনেকের অপরাধ সম্পর্কে জানি। তিনি যদি সবকিছু জানেনই চাকরিতে থাকতে ফাঁস করলেন না কেন? লক্ষ্মীপুরের আরেক কৃতী সন্তান শহিদ ইসলাম কুয়েতে জেল খাটছেন মানব পাচার ও অর্থ পাচারের দায়ে। আমি মাত্র তিনজনের কথা উল্লেখ করলাম। আরও অনেক ‘কীর্তিমান’ সন্তান আছেন, যাঁরা মায়ের বদন মলিন হলে আর চোখের জলে ভাসেন না।

বরং নিজেদের অপকর্ম দিয়ে বহির্বিশ্বে দেশের বদনাম করেন। মাথা হেঁট করেন।
এই বাংলা মায়ের ছেলেরা যখন বিশ্বসেরা ক্রিকেট দলকে হারিয়ে দেন, যখন গণিত অলিম্পিয়াডে স্বর্ণ কিংবা রুপা জয় করেন, তখন গর্বে আমাদের বুক ফুলে যায়। আর যখন এই বাংলা মায়ের কুসন্তানেরা বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করেন, তখন লজ্জিত হতে হয়।
লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া বাংলাদেশে যেমন সুসন্তানেরা আছেন, তেমনি আছেন কুলাঙ্গার সন্তানেরাও।

মাগুরার মহান মা তার পাঁচ সন্তানকে ক্ষমা করলেও বাংলা মা তার কুলাঙ্গার সন্তানদের ক্ষমা করবেন না।

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি।

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন