রবীন্দ্রনাথের শৈশবে তাঁর সমবয়সী ছেলেরা যখন ভিনদেশি ভাষা ইংরেজি শেখার অমন কসরত করছিল, তিনি তখন মন দিয়ে শিখছিলেন মাতৃভাষা বাংলা। ইংরেজি তিনি শিখেছিলেন আরও পরে, বাংলা ভাষার গাঁথুনি বা ভিত শক্ত হওয়ার পর। ওই বিদেশি ভাষা তিনি বেশ ভালোভাবেই শিখতে পেরেছিলেন; নিজের লেখা বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন নিজেই। সেই সব লেখা পড়েই সুইডিশ নোবেল কমিটি তাঁকে সাহিত্যে অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার দিয়েছিল।

এখন, এতকাল পর ভাষাবিজ্ঞানী, মস্তিষ্কবিজ্ঞানী ও শিক্ষা গবেষকেরা গবেষণা করে বলছেন, রবীন্দ্রনাথের সেজদাদা হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাতলানো পদ্ধতিটাই বিদেশি ভাষা শেখার সবচেয়ে কার্যকর ও ফলপ্রসূ পদ্ধতি। প্রথমে মাতৃভাষার ভিতটা মজবুত করতে হবে, তাহলে বিদেশি ভাষা শেখার কাজটা সহজ হয়ে আসবে।

কারণ, শিশু যখন মাতৃভাষায় পড়া ও লেখা শিখতে শুরু করে, তখন থেকে ভাষার মাধ্যমে চারপাশের জগৎ সম্পর্কে জানা ও বোঝার ক্ষমতা অর্জনের পাশাপাশি আরও অনেকগুলো সক্ষমতা বা দক্ষতা তৈরি হতে থাকে; বিশেষ করে, যুক্তি–বুদ্ধি খাটিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা, ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ক্রিটিক্যাল থিংকিং। এই সমস্ত ক্ষমতা নিয়েই সে পড়াশোনার পরবর্তী ধাপে যায়। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে বলছেন, মাতৃভাষার মাধ্যমে অর্জিত কোনো সক্ষমতাই হারিয়ে যায় না; বড় হয়ে দ্বিতীয় কোনো ভাষায় পড়াশোনা করতে গেলে মাতৃভাষায় রপ্ত করা বিষয়গুলো আর নতুন করে শিখতে হয় না।

যেমন, যদি কোনো শিশু তার মাতৃভাষার কোনো অজানা শব্দের মানে পারিপার্শ্বিক অবস্থা বা কনটেক্সট থেকে অনুমান করার সক্ষমতা অর্জন করে, কিংবা মাতৃভাষায় কোনো কিছু পড়ে তার আক্ষরিক অর্থ ছাড়িয়ে নিহিতার্থটা বুঝে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে, তাহলে যখন সে বিদেশি কোনো ভাষায় পড়াশোনা শুরু করে, তখন তার এই দুই সক্ষমতা সহজেই স্থানান্তরিত হয়। অর্থাৎ মাতৃভাষায় সে যা পারে, বিদেশি ভাষায়ও তা পারে। কিন্তু এ ধরনের বিমূর্ত সক্ষমতাগুলো সরাসরি বিদেশি ভাষায় গড়ে তোলা অনেক কঠিন।

গবেষকেরা আরও বলছেন, শিশুর ব্যক্তিগত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়বোধ গঠনে মাতৃভাষার ভূমিকা ব্যাপক। যে শিশুর মাতৃভাষার ভিত মজবুত, সে নিজেকে গভীরভাবে বুঝতে পারে, তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়, সে সমাজে নিজের অবস্থান সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে। এই সক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই তার শিক্ষাগত অর্জনসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই কাজে লাগে।

এই কারণে পৃথিবীজুড়ে দ্বিভাষিক শিক্ষাপদ্ধতির জনপ্রিয়তা বাড়ছে; ইন্টারন্যাশনাল স্কুলগুলো শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ মাতৃভাষার ভিত শক্ত করে গড়ে তোলার ওপর বেশি বেশি জোর দিচ্ছে। তারা শিক্ষার্থীদের মা–বাবাদের নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করছে; তাঁদের বোঝাচ্ছে যে বাচ্চারা বিদ্যালয়ে যে ভাষায় পড়াশোনা করছে, তাদের সঙ্গে বাসায়ও সেই ভাষায় কথা বললে তারা সেই ভাষা তাড়াতাড়ি এবং ভালোভাবে রপ্ত করতে পারবে—এই ধারণা ভুল। এতে বরং উল্টো ফল হয়, শিশু মাতৃভাষা বা বিদ্যালয়ের ভাষা—কোনোটাই ভালোমতো রপ্ত করতে পারে না।

এই লেখার শুরুতে যে কল্পিত পরিস্থিতি বর্ণনা করেছি, তা পুরোপুরি কল্পিত নয়। শিক্ষাবিষয়ক ব্রিটিশ মাসিক ম্যাগাজিন ইনডিপেনডেন্ট এডুকেশন টুডের ওয়েবসাইটে (ie-today.co.uk) কম্বোডিয়ার কিছু বিদ্যালয়ে ‘ইংলিশ অ্যাজ অ্যান অ্যাডিশনাল ল্যাঙ্গুয়েজ’ (ইএএল) কর্মসূচির আওতায় এ ধরনের উদ্যোগের বিবরণ রয়েছে। সে দেশে বিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে সান্ধ্য কর্মশালা পরিচালনা করে; শিশুদের মা–বাবাদের সেখানে আমন্ত্রণ জানায়। সেখানে বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে তাঁদের দেখান, শিশুরা কীভাবে ভাষা শেখে, বিদ্যালয়টি কী পদ্ধতিতে তাদের ভাষা শেখায়। তারা বিশেষভাবে ব্যাখ্যা করেন শিশুর মাতৃভাষার মজবুত গাঁথুনির গুরুত্ব, এবং সেটা গড়ে তোলার জন্য মা–বাবা কত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

শিশু যখন মাতৃভাষায় পড়া ও লেখা শিখতে শুরু করে, তখন থেকে ভাষার মাধ্যমে চারপাশের জগৎ সম্পর্কে জানা ও বোঝার ক্ষমতা অর্জনের পাশাপাশি আরও অনেকগুলো সক্ষমতা বা দক্ষতা তৈরি হতে থাকে; বিশেষ করে, যুক্তি–বুদ্ধি খাটিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা, ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ক্রিটিক্যাল থিংকিং।

‘আমাদের মাতৃভাষার অনাদর কাটবে কবে’ শিরোনামে এই লেখকের একটি নিবন্ধ প্রথম আলোয় ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হওয়ার পর এক বন্ধুর সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ হচ্ছিল। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বললেন, তিনি তাঁর সন্তানের ইংরেজি ভাষার ভিত শক্ত করার জন্য প্রথম দুই বছরের জন্য তাকে একটি ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছেন। তাঁর ইচ্ছা, সন্তানের ইংরেজির ভিত মজবুত হলে তাকে বাংলা মাধ্যমের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনবেন। এতে বোঝা যায়, বন্ধুটির মাতৃভাষা বাংলার প্রতি ভালোবাসা এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা আন্তরিক।

কিন্তু যে পদ্ধতিতে তাঁর এই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে বলে তিনি ভেবেছেন, আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা সেই পদ্ধতিকে সমর্থন করছে না। বরং গবেষণায় উল্টো ফলই পাওয়া যাচ্ছে। এভাবে শিশুর মাতৃভাষা বা বিদেশি ভাষা কোনোটার গাঁথুনিই শক্ত হয় না। শুধু তা–ই নয়, এই পদ্ধতিতে শিশুর যুক্তি–বুদ্ধি খাটিয়ে চিন্তা করার সক্ষমতা গড়ে ওঠা ব্যাহত হয়, সে হয়ে ওঠে মুখস্থনির্ভর। তা ছাড়া মাতৃভাষায় শিক্ষার ভিত শক্ত হলে আরও যেসব দরকারি ও উপকারী দক্ষতা বা সক্ষমতা গড়ে ওঠে, সেগুলো থেকেও শিশু বঞ্চিত হয়।

সুতরাং, মাতৃভাষায় শিক্ষার ভিত রচনার গুরুত্ব নিছক দেশপ্রেম বা ভাষাপ্রেমের মতো বিমূর্ত ভাবের বিষয় নয়, ফেব্রুয়ারি মাসের ‘গালভরা বুলি’ নয়; এই গুরুত্ব বাস্তবিক, ব্যবহারিক, প্রায়োগিক এবং বৈষয়িক। আমরা যারা বৈষয়িক বিবেচনায় সন্তানের ‘উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ’ চাই, অর্থাৎ পেশাজীবী হিসেবে সন্তানের সাফল্য দেখতে চাই এবং একমাত্র এই উদ্দেশ্যেই তাকে লেখাপড়া শেখাই, তাদের চিন্তাভাবনা বদলানোর সময় এসেছে। আমাদের সরকার দেশের প্রতি জেলায় ইংরেজি মাধ্যমের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে—সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেনের এই বক্তব্য সত্য হলে আমরা বলব, এই দুর্বুদ্ধি অবিলম্বে ত্যাগ করা উচিত।

মশিউল আলম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদক।

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন