বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মাদক থেকে আয় যতটা বাড়ানো যায়, সেই চেষ্টায় এখন তালেবান করছে। তালেবান ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর আফগানিস্তানে আফিমের দাম তিন গুণ বেড়েছে। ভারতে গত কয়েক মাসে আফগানিস্তানে উৎপাদিত হেরোইন জব্দের পরিমাণ বেড়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক সংস্থা সতর্ক করেছে, আফগানিস্তানের চলমান অর্থনৈতিক সংকট দেশটির কৃষকদের পপির মতো অবৈধ শস্য আবাদে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করবে। সমস্যা শুধু আফিমে সীমাবদ্ধ নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফগানিস্তানে মেথামফেটামাইন উৎপাদন ভীষণভাবে বেড়েছে। এর একটি কারণ হচ্ছে, ক্রিস্টাল মেথ উৎপাদন হেরোইন থেকে অনেক বেশি লাভজনক।

মাদক পাচারের জন্য তালেবান বেশ কয়েকটি পথ ব্যবহার করে। ককেশাস ও বলকান অঞ্চল দিয়ে তারা পশ্চিম ইউরোপে মাদক পাচার করে। উত্তর আমেরিকা তাদের মাদক পাচারের বড় ক্ষেত্র। উত্তর দিকে তাজিকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জামাত-আনসারুল্লাহের মাধ্যমে রাশিয়ায় মাদক পাচার করে। দক্ষিণ-পূর্ব দিকে পাচারের জন্য পাকিস্তান ব্যবহৃত হয়। ঘুষের (স্থানীয় ভাষায় তানজিম) বিনিময়ে পাকিস্তানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তালেবান ও পাচার চক্রকে এ কাজে সহায়তা করেন।

মাদক বিক্রির মুনাফা থেকে অর্জিত টাকা তালেবান সরাসরি তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রমে ব্যবহার করে। মাদক চোরাকারবারি ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে সম্পর্ক অস্বীকার করা যাবে না। শুধু তালেবান নয়, বোকো হারাম, আল-শাবাব ও আল-কায়েদার মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গেও মাদক কারবারের সম্পর্ক রয়েছে। ২০২০ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইসলামিক স্টেট খোরাসান (আইএসআইএস-কে) মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে। এ কারণে তালেবান তাদের শত্রু মনে করে।

আফগানিস্তানে উৎপাদিত আফিমজাত মাদক যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ায় মাদকাসক্তি ও মাদকজনিত মৃত্যুর জন্য অনেকাংশে দায়ী। আফগানিস্তানে অর্থনৈতিক দুর্দশা মাদক উৎপাদন ও পাচারে তালেবানকে আরও প্রণোদনা জোগাবে। আফগানিস্তানে আফিম ও মেথ উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র যদি আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব না দেয়, তাহলে তালেবানের ক্ষমতা এবং তাদের নৃশংসতাই কেবল বাড়বে।

আইএসআইএস-কে যখন আফগানিস্তানের সীমান্ত প্রদেশ নাঙ্গাহারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল, তখন তারা পাকিস্তানে তালেবানের মাদক পাচারের পথটি বন্ধ করে দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও আফগান সরকারের শক্ত অভিযানে আইএসআইএস-কে সেখান থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর আবার মাদকের সেই পথ চালু হয়েছিল।

বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের ব্যর্থতাকে আরও বড় করে সামনে নিয়ে আসে। ২০০১ সাল আফগানিস্তানে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর মাদক পাচার কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে বেশ কয়েকজন তালেবান নেতার বিচার হয়েছিল। এতে মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তালেবানের গ্রহণযোগ্যতা অনেক কমে গিয়েছিল।

২০১২ সালেও এ রকম একটা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। ২৪০ পৃষ্ঠার ওই প্রস্তাবে মার্কিন মাদক নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বিচার বিভাগের কর্মকর্তারা ২৬ জন উচ্চপদস্থ তালেবান নেতা ও মাদকসম্রাটকে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে বিচারের সুপারিশ করেছিল। কলম্বিয়ার মাদক অর্থায়নে পরিচালিত বিপ্লবী গোষ্ঠী ফার্কের সঙ্গে শান্তি স্থাপনের আগে কলম্বিয়ার সরকার এ ধরনের একটি উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু তালেবানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে সম্মত হননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এটি ছিল কৌশলগতভাবে ভুল। এর মাশুল সবে দেওয়া শুরু হয়েছে। ২০ বছর ধরে মাদক ব্যবসার মুনাফা থেকে তালেবানকে হৃষ্টপুষ্ট হতে সহায়তা করার ফল হচ্ছে, আফগানিস্তান থেকে মার্কিনিদের অপমানজনক বিতাড়ন।

মার্কিন ফেডারেল আদালতে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার কারণে তালেবান নেতাদের বিচারের সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। আফগানিস্তানে উৎপাদিত আফিমজাত মাদক যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ায় মাদকাসক্তি ও মাদকজনিত মৃত্যুর জন্য অনেকাংশে দায়ী। আফগানিস্তানে অর্থনৈতিক দুর্দশা মাদক উৎপাদন ও পাচারে তালেবানকে আরও প্রণোদনা জোগাবে। আফগানিস্তানে আফিম ও মেথ উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র যদি আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব না দেয়, তাহলে তালেবানের ক্ষমতা এবং তাদের নৃশংসতাই কেবল বাড়বে। তখন এই মাদকরাজ্য আল-কায়েদা এবং অন্যান্য সহিংস জিহাদি গোষ্ঠীর স্বর্গভূমি হয়ে উঠবে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

ব্রহ্ম চেলানি নয়াদিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বিষয়ের অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন