বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় শ্রেণি হিসেবে মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের সাফল্যে আমরা বিচলিত নই। বরং তাদের মূলধারায় প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানাই। তবে এ প্রতিযোগিতা যথাযথ হচ্ছে কি না, সেটা দেখার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। নতুন পরিস্থিতিতে এটা যাচাই করে দেখার প্রয়োজনও সামনে এসেছে

দাখিল ও আলিম সরকার স্বীকৃত মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পরীক্ষা। বর্তমানে দেশের তিনজন ছাত্রের একজন মাদ্রাসার এবং সংখ্যাটি দেড় কোটির মতো বলে অনেকে দাবি করেন। যদিও এসব তথ্যের সমর্থনে নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র পাওয়া যায় না। তবে সংখ্যাটি নিয়ে বড় রকমের বিতর্কে যাওয়ার সুযোগ কম। দেশে মাদ্রাসার সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। আলিয়া মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষক-কর্মচারীরা বেসরকারি স্কুল-কলেজের মতো সরকারের এমপিও সুবিধার আওতায় বেতন-ভাতা পেয়ে থাকেন। স্বাধীনতার পরপর ভিন্নমত থাকলেও প্রথম শিক্ষা কমিশনই মাদ্রাসাশিক্ষা বহাল রাখার পক্ষে মত দেয়। আর বর্তমান সরকার কওমি মাদ্রাসাগুলোর ডিগ্রির সমতাকরণ করে এদেরও মূলধারায় এনেছে। ধরে নিতে হবে দেশের বাস্তবতার নিরিখেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগ সত্য যে কওমি মাদ্রাসা পরিচালনায় সরকারের কোনো নিয়মনীতি বা নিয়ন্ত্রণ নেই। তা সত্ত্বেও এগুলো আছে এবং ক্রমবিকাশ ঘটছে।

আলিয়া মাদ্রাসা থেকে মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থায় সুযোগ করে নেওয়া নতুন কোনো বিষয় নয়। স্বাধীনতার আগেও অনেকেই এসেছেন। কৃতী হয়েছেন কেউ কেউ। ঠিক তেমনি আসছে স্বাধীনতার পরও। সফলও হয় অনেকে। আর আসে এবং টিকে থাকে প্রতিযোগিতা করেই। সিভিল সার্ভিসে আসা একজন তো চাকরিজীবনে সাফল্যের পরিচয় দিয়ে সরকারের বেসামরিক প্রশাসনের শীর্ষ পদে ছিলেন। এখনো বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের আমরা ঠেকিয়ে রাখব কেন? তারা তো বরং সমৃদ্ধ করছে আমাদের শিক্ষাজগৎকে। বাঁকা পথে তাদের আগমন বা পথচলা নয়। মূলধারাতেও তাদের অনেক লড়াই করতে হয়েছে। তেমনি এবার একজন এলেন খ ইউনিটে প্রথম স্থান অধিকার করে। জানা যায়, ছাত্রটি সাধারণ লাইনেও কিছুদিন পড়াশোনা করেছিল। বৃত্তি পেয়েছিল পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে। এবার দাখিল ও আলিমে ভালো ফল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়। তার এ ফলাফল খুব স্বাভাবিক বলে ধরা চলে। এতে কেউ কেউ বিচলিত হচ্ছেন দেখে হতাশ হই। সে ভর্তি পরীক্ষার স্বাভাবিক নিয়মকানুন অনুসরণ করে সফলতার স্বাক্ষর রাখল। আমাদের তো তার মূলধারায় প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানানোই উচিত।

তবে আলিম ও ফাজিল পরীক্ষায় নমনীয় নম্বর দেওয়ার সুযোগে কেউ বেশি নম্বর পেয়ে সাধারণ লাইনের ছাত্রছাত্রীদের ঠেকিয়ে সুযোগ করে নেওয়ার বিষয় থাকলে সমর্থনযোগ্য নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় নিয়মকানুন ঠিক করেন তার শিক্ষকেরাই। এসব কমিটিতে মাদ্রাসাশিক্ষকদের কোনো প্রতিনিধিত্ব থাকে না। আলিম ও ফাজিল পরীক্ষায় নমনীয় নম্বর দেওয়ার যে অভিযোগের কথা বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা উচিত। যদি এমনটা হয় ভর্তি পরীক্ষায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা স্তরের ফলাফলের জন্য নির্ধারিত নম্বর হ্রাস করে নিজেদের পরীক্ষার নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া চলে। তবে তা করতে হলে সমভাবে সাধারণ ও মাদ্রাসা দুই ক্ষেত্রের জন্যই করতে হবে। তাই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড চাই।

বিবেচনায় নিতে হবে যে আমাদের মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের আর্থসামাজিক অবস্থান সাধারণ লাইনের ছাত্রছাত্রীদের চেয়ে পেছনে। তা-ও তাদের জন্য বিশেষ কোনো সুযোগ দেওয়ার দাবি কেউ করে না। তবে প্রাপ্য থেকেও বঞ্চিত করা যাবে না। বরং সাধারণ বিচারে মাদ্রাসাছাত্রদের লেখাপড়ার মান তুলনামূলকভাবে কিছুটা দুর্বল। এ দুর্বলতাকে অতিক্রম করে কেউ যদি ভালো করে, তাকে উৎসাহ দেওয়া উচিত। তা না করে তাদের প্রতি বৈরী আচরণ সমর্থনযোগ্য হবে না। ছাত্রছাত্রীদের এক-তৃতীয়াংশ যদি মাদ্রাসার হয়ে থাকে, তাদের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার জন্য নানামুখী পদক্ষেপ দরকার।

সারা দেশের শিক্ষার মানই আজ প্রশ্নবিদ্ধ। সে প্রশ্নের মুখোমুখি শিক্ষার্থী-শিক্ষক সবাই। তার মধ্যেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই দেশের সেরা, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এখানে অনেক মেধাবী শিক্ষক কঠোর শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। রয়েছে অনেক মেধাবী ছাত্র। তেমনি শিক্ষকদের কারও কারও পিএইচডি থিসিস বা গবেষণাপত্র নিয়ে যখন চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ ওঠে, শাস্তি হয়, তখন কিন্তু ভিত কেঁপে ওঠে প্রতিষ্ঠানটির। আর সে অভিযোগ আকস্মিক নয়। প্রায়ই আসে।

মাদ্রাসা থেকে আসা ছাত্রদের ইংরেজি জ্ঞান নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, তা সম্ভবত ব্যাপকভাবে অন্য অনেকের জন্যও প্রযোজ্য। বিস্ময়ের ব্যাপার, ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজি ন্যূনতম নম্বর ধরে একটি মানদণ্ড আছে। প্রয়োজন মনে করলে সেটা আরও বাড়ানো যায়। অবশ্য সারা দেশের শিক্ষার মানই আজ প্রশ্নবিদ্ধ। সে প্রশ্নের মুখোমুখি শিক্ষার্থী-শিক্ষক সবাই। তার মধ্যেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই দেশের সেরা, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এখানে অনেক মেধাবী শিক্ষক কঠোর শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। রয়েছে অনেক মেধাবী ছাত্র। তেমনি শিক্ষকদের কারও কারও পিএইচডি থিসিস বা গবেষণাপত্র নিয়ে যখন চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ ওঠে, শাস্তি হয়, তখন কিন্তু ভিত কেঁপে ওঠে প্রতিষ্ঠানটির। আর সে অভিযোগ আকস্মিক নয়। প্রায়ই আসে।

সহজেই বোঝা যায় সেসব শিক্ষক কিন্তু সবাই ধরাও পড়েন না। তাহলে ধরে নিতে হবে এখানে অনেক গুণী-জ্ঞানী শিক্ষকের পাশাপাশি বিপথগামীও কেউ কেউ আছেন। তাঁরাও পড়াচ্ছেন। তাই এ গলদ থাকবে এবং সেটা ক্রমান্বয়ে বাড়তে পারে। বছর তিনেক আগে সিনেট সভায় ট্রেজারার ইভিনিং কোর্সের নামে বিশ্ববিদ্যালয় নিম্নমানের গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে বলে অভিযোগ করেছিলেন। খণ্ডন করেননি কেউ অভিযোগটি। প্রতিকারও হয়নি। প্রথাটি চলমান। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদই পাচ্ছে। তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ এরূপ হলে এখান থেকে উন্নত মেধাবী ছাত্রছাত্রী সরবরাহ কি নিশ্চিত করা যায়? সুতরাং মাদ্রাসাই একমাত্র বাধা হিসেবে চিহ্নিত করবেন না। আরও অনেক গলদ এর মধ্যে আছে।

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় মাদ্রাসা ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণ ও সাফল্য এবং গোটা দেশের মাদ্রাসাশিক্ষার্থীর অনুপাত আলোচনার প্রয়োজন ছিল। অজানা ছিল এগুলোর অনেক কিছুই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় শ্রেণি হিসেবে মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের সাফল্যে আমরা বিচলিত নই। বরং তাদের মূলধারায় প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানাই। তবে এ প্রতিযোগিতা যথাযথ হচ্ছে কি না, সেটা দেখার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। নতুন পরিস্থিতিতে এটা যাচাই করে দেখার প্রয়োজনও সামনে এসেছে।

আলী ইমাম মজুমদার সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন