default-image

তাদের সুশৃঙ্খল রাখার জন্যও যদি কোনো ব্যবস্থা নিতে হয়, তাদের সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে করা যাবে না এবং মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা যাবে না। এ ধারায় এমনকি প্রাথমিক স্কুল পর্যায়ের শিশুদের শারীরিক নিরাপত্তার কথাও স্পষ্ট উল্লেখ আছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য শিশু নির্যাতন বন্ধে আইন প্রণয়নের নৈতিক বাধ্যবাধকতাও ছিল। তারপর ৯টি বছর লেগে গেল ‘নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধ আইন ২০০০’ পেতে। এ উদাহরণ থেকেই বোধগম্য কেন আমাদের হাতে করপোরাল পানিশমেন্টের সমতুল্য বাংলা শব্দ নেই।

শুনেছিলাম ও পড়েছিলাম যে এক শ-দেড় শ বছর আগে গ্রামের অভিভাবকেরা সন্তানদের টোলে রেখে এসে বলতেন, ‘পণ্ডিতমশাই, আপনার হাতে তুলে দিলাম। মানুষ করতে গিয়ে মাংস-চামড়া তুলে ফেলার প্রয়োজন হলে তুলে ফেলবেন। শুধু হাড্ডিগুলো ফেরত দিলেই চলবে।’ গবেষণাটি করতে নেমে দেখলাম সেই ২০১২ সালেও ‘মাংস-চামড়া রেখে হাড্ডি ফেরত দিলেই চলবে’ কথাটি গ্রামেগঞ্জের লোকেরা বলছে। আমরা বুঝি এটি আক্ষরিক অনুরোধ নয়। এটি শিক্ষকের একক কর্তৃত্বে অভিভাবকের আস্থা রাখার রূপক। মানে শাস্তি যা দেওয়ার দেবেন, আমরা প্রতিবাদ জানাব না।

এক শ-দেড় শ বছর আগের পণ্ডিতের পাঠশালার ঐতিহ্য ক্রমে স্কুলে, মাদ্রাসায়, মক্তবে, এতিমখানায় সমাজ স্বীকৃত আচরণিক উত্তরাধিকারের রূপ নিয়েছে। ফলে বিদ্যায়তনে শিশু নির্যাতন অলিখিত সামাজিক অনুমোদন পেয়ে গিয়েছিল। আমরা খেয়াল করলাম অনেকেই সমস্যাটিকে হয় খুবই হালকা করে দেখেছিলেন অথবা আদৌ কোনো সমস্যাই ভাবছিলেন না। কেউ কেউ বলছিলেন, ‘ভাই, মারধর খেয়েছি বলেই তো মানুষ হয়েছি।’ এমনও বলেছেন, ‘মাইরের ওপর কোনো ওষুধ নাই।’

বিজ্ঞাপন

শিশুদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ মোটেই করা যাবে না, তার বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে ১৯৯১-এর জাতিসংঘ শিশুবিষয়ক সনদের ২, ৬, ১২ ও ২৮ ধারা, বিশেষত ২৮ (১ ক), ২৮ (১ঙ) ২৮ (২) ধারায়। সেগুলোকে আমলে নিলে পিতা-মাতার বাইরে অন্য কেউ শিশুদের উচ্চ স্বরে ভর্ৎসনা বা তিরস্কারও করার অধিকার রাখেন না। গবেষণাকালে একটি স্কুলের একজন প্রধান শিক্ষককে এ কথাগুলো জানানোর পর তিনি কতটা বিরক্ত হয়েছিলেন, এখনো স্পষ্ট মনে আছে। সরাসরি বলেছিলেন, ‘ভাই, আপনি এসে পড়ান। আপনারা দূর থেকে উড়ে এসে কী করে বুঝবেন, কী রকম যন্ত্রণা নিয়ে আমাদের কাজকর্ম।’ সেই গবেষণাকালে জানলাম, মন্ত্রণালয় থেকে এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা তদারকি বিভাগগুলো থেকে প্রায়ই নির্দেশনা পাঠানো হয়। তবে সেগুলোকে আমলে নিলে শিক্ষকদের চলে না। থানার শিক্ষা কর্মকর্তারাও ‘মুখে মারধর করবেন না’ বললেও নাকি আকারে-ইঙ্গিতে জানান দেন যে শিশুদের সুশৃঙ্খল করার জন্য মারধরে তাঁদের আপত্তি নেই।

সে সময়ই আরও জেনেছিলাম যে মক্তব-মাদ্রাসা, এতিমখানা, হেফজখানা, ইবতেদায়ি ও কওমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ভাবসাব এ রকম, ‘চাপ এলে আসুক, আমরা আমাদের শৃঙ্খলা পদ্ধতিতে বিশেষ হেরফের ঘটাব না।’

জেনেছিলাম শারীরিক নির্যাতনকে মক্তব-মাদ্রাসায় শারীরিক শিক্ষাদানের অপরিহার্য অনুষঙ্গ মনে করা হয়। যেহেতু শারীরিক-মানসিক আঘাত অনুমোদিত এবং কতটা আঘাত করা যাবে, কতটা যাবে না এ বিষয়ে নিয়ম নেই, শাস্তির অপব্যবহার বাড়বে জানা কথা। মারের চোটে অনেক শিশুর পঙ্গু হয়ে যাওয়ার ঘটনাও কম নয়। নির্মম মারের পরও শিক্ষকদের গায়ে আঁচড় না লাগায় তাঁদের সাহস বাড়তেই থাকে। পরের পর্যায়টি শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতা।

একজন থানা শিক্ষা কর্মকর্তা সে সময় জানালেন, মাদ্রাসা-মক্তবে করপোরাল পানিশমেন্টের প্রতিবিধান কঠিন। কারণ, এসব শিশুর পিতা-মাতা অত্যন্ত দরিদ্র এবং স্বল্পশিক্ষিত। শিক্ষা বিষয়ে তাঁদের বদ্ধমূল ধারণা এই যে নির্যাতন শিক্ষারই অংশ। যাঁরাই পড়াশোনা শিখেছেন, সবাই এসব অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছেন। তাহলে নতুন আপত্তির তো অর্থ হয় না। আরও সমস্যা এই যে তাঁদের ধর্মবোধও আদি স্তরের। ধর্মাচরণ শিখতে পাঠিয়েছেন, তাঁদের প্রতিবাদ বা শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গোনাহর কাজ না হয়ে যায়, এ ভাবনায় তাঁদের দ্বিধার শেষ থাকে না।

তা ছাড়া তাঁরা মনে করেন মামলা করা মানেই থানা-পুলিশ, হেনস্তা, টাকাপয়সা খরচ। দুই বেলা খেতেই পান না, কোথায় পাবেন মামলা চালানোর টাকা। কামাই-উপার্জনেরই সময় পান না, থানা-পুলিশের পেছনে সময় নষ্ট করবেন কীভাবে। শিক্ষকেরা মেরে-ধরে বিপদ দেখলে তাঁদের কাছে এসে হাতে-পায়ে ধরেন। তাঁরাও লিখে আনা কাগজে স্বাক্ষর করে দেন। সেগুলোতে লেখা থাকে, ‘হুজুরের বিরুদ্ধে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই।’
সত্তরের দশকে এবং আশির শুরুতে আমাদের স্কুলজীবনেও শিক্ষকদের হাতে শিশু-কিশোরদের নিষ্ঠুর শাস্তি পেতে দেখেছি। তবে ২০১২ সালে আমাদের গবেষণাকালে বাংলা-ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে মারধরের চল কমে আসছিল। পাশাপাশি আলিয়া মাদ্রাসাগুলো থেকেও করপোরাল পানিশমেন্ট উঠে যাচ্ছিল।

পরিবারবর্গকে শেখানোর রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি কোথায়? রেডিও, টেলিভিশনে, ইন্টারনেটে, প্রচারমাধ্যমেও বিষয়টি বিশেষ প্রচারিত নয়। বাকি রইল এনজিওগুলোর প্রচেতনীকরণ কর্মসূচি। সেগুলোর আয়ুষ্কাল নিতান্তই দাতাদের খয়রাত ও প্রকল্পের সময়সীমায় সীমিত।
বিজ্ঞাপন

কারণ সরকারি নির্দেশ। ইউনিসেফ, সেভ দ্য চিলড্রেন এবং কয়েকটি এনজিও বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে শাস্তির ব্যাপকতা এবং ক্ষতির ধরন নিয়ে ২০০০ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে কয়েকটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের প্রতিবেদনে ‘করপোরাল পানিশমেন্ট’-এর কুফল হিসেবে অসংখ্য শিশুর চিরতরে স্কুল ছেড়ে দেওয়া, মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়া, আক্রমণাত্মক আচরণমুখিতা রপ্ত করা, শারীরিক বৈকল্য ইত্যাদি অনেক বিষয় উঠে আসে।

কিছু দাতাদের তরফ থেকে স্কুল-মাদ্রাসায় শাস্তি বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চাপও আসে। কিছু কিছু দুর্বল আলোচনাও শুরু হয় যে ২০০০ সালের আইন ও ২০০৩ সালের সংশোধনী কার্যকর নয়। শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ধারা-উপধারাগুলোকে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার আইনে অন্তর্ভুক্ত রাখা সমস্যাজনক।তাতে শিশুদের প্রতি নির্যাতনের প্রতিবিধানটি নিতান্তই গৌণ হয়ে পড়ে।

মক্তব-মাদ্রাসাবিরোধীদের মাদ্রাসায় নির্যাতন নিয়ে যতটা সরব দেখা যায়, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে ততটা সরব দেখা যায় না। কিন্তু সমস্যাটি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই আছে। পরিবার, সামাজিক সংঘ এবং আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষই যেখানে শাস্তির ভয়াবহতা সম্পর্কে অনেকটা নির্লিপ্ত ও এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল নেয়, তখন তাদের শিশুবান্ধব মনে করার সুযোগ থাকে না। বরং মনে হয় যে কাগুজে আইনটি আসলে লোকদেখানো কাজির গরু, যেটি শুধু কিতাবেই আছে, গোয়ালে নেই।

পরিবারবর্গকে শেখানোর রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি কোথায়? রেডিও, টেলিভিশনে, ইন্টারনেটে, প্রচারমাধ্যমেও বিষয়টি বিশেষ প্রচারিত নয়। বাকি রইল এনজিওগুলোর প্রচেতনীকরণ কর্মসূচি। সেগুলোর আয়ুষ্কাল নিতান্তই দাতাদের খয়রাত ও প্রকল্পের সময়সীমায় সীমিত। মাদ্রাসা বিষয়ে বড় এনজিওগুলোর একধরনের অস্বস্তি রয়েছে। তাদের প্রগতিশীল ভাবভঙ্গির কারণে মক্তব-মাদ্রাসাকে সেকেলে, মধ্যযুগীয় কর্মক্ষেত্র ভাবার চল আছে।

ফলে ছোট ছোট স্থানীয় দু-একটি এনজিও খুবই ক্ষুদ্র আঞ্চলিক পরিসরে করপোরেট পানিশমেন্ট নিয়ে কাজ করলেও দেশজুড়ে সেগুলোর বিশেষ কোনো প্রভাব নেই। এদিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের চাপে বাংলাদেশের সুশীল সমাজ মৃতপ্রায়। তাদের নীরবতার কুফল সব রকমের জননিবর্তন বেড়ে যাওয়া। তাই শুধুই মাদ্রাসাশিক্ষকদেরই দায়ী করলে এ সমস্যার সমাধান হবে না। উল্লিখিত কাঠামোগত সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য জাতীয়ভিত্তিক সক্রিয় ও টেকসই কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করতে হবে।

ড. হেলাল মহিউদ্দীন: অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান। সদস্য, সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন