default-image

কোভিড মহামারির সংকটের ভেতর মানব পাচারের ঘটনায় দেশ ও বিশ্বের গণমাধ্যমে বাংলাদেশ আবারও শিরোনাম হয়েছে। প্রথমে, সুদূর লিবিয়ার মরুভূমিতে পাচারকারীর হাতে ইউরোপে অভিবাসনপ্রয়াসী ৩৬ বাংলাদেশির হত্যাকাণ্ড। এ মর্মন্তুদ ঘটনায় সরকারের প্রতিটি আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগকারী সংস্থা একযোগে তৎপর হয়ে ওঠা এবং র‍্যাব, পুলিশ ও সিআইডির হাতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ইউরোপে পাচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের সংবাদ জনমনে কিছুটা আস্থা আনে। এর পরই মানব ও মুদ্রা পাচারের অভিযোগে দেশের একজন সাংসদের কুয়েতে গ্রেপ্তার হওয়া ও হাজতবাস মূলত অভিবাসনের নামে মানব পাচারের বিদ্যমান বাস্তবতাকেই প্রকাশ করে।

এটা বাংলাদেশের বাস্তবতা যে জীবিকা আর উন্নত জীবনের আশায় প্রতিবছর দেশ ছাড়েন লাখো মানুষ। এঁদের স্বপ্ন একটুখানি সুখ আর একটুখানি সমৃদ্ধির। দুঃখজনক হলেও এসব স্বপ্নচারী মানুষের বেশির ভাগই পড়েন মানব পাচারকারীর খপ্পরে। জমি, বসতভিটা বিক্রি করে শেষ সম্বলটুকু তাদের হাতে তুলে দিয়ে প্রতারিত হন। অনেক সময় অনেক কষ্টে বিদেশের মাটিতে পা রাখতে পারলেও কাজ আর মেলে না। পালিয়ে, অনাহারে কাটাতে হয় জীবন। তাঁরা না পারেন দেশে ফিরতে, না পারেন বিদেশের মাটিতে টিকতে। এটা আমাদের ত্রুটিপূর্ণ অভিবাসন ব্যবস্থার এক কলঙ্কিত অধ্যায়—এটা বন্ধে কখনো সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

প্রশ্ন আসতে পারে, কেন সিলেট, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালী, মাদারীপুর, শরীয়তপুরসহ সুনির্দিষ্ট কিছু এলাকার লোকজন অবৈধ পথে ইউরোপে যান! কেন এই এলাকাগুলো ঘিরেই দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী দালাল চক্র গড়ে ওঠার সুযোগ মেলে! বিভিন্ন সময়ের গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও অভিবাসন নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠাগুলোর গবেষণা থেকে জানা যায়, লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে ইউরোপ যাত্রায় এসব মধ্যবিত্ত যুবকদের লিবিয়া বা ভূমধ্যসাগর তীরের আশপাশের দেশে নিয়ে, সেখানে তাঁদের জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে বড় মাপের মুক্তিপণ আদায় করে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পাচার চক্র। কিন্তু কেন প্রতিবার এদের ভূমধ্যসাগরে সলিলসমাধি অথবা পাচারকারীদের হাতে মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হলেই কেবল আমাদের টনক নড়ে!

এক যুগের বেশি সময় এই অমানবিক কাজ চলছে! মনে রাখতে হবে, অবৈধ অভিবাসনের চক্রগুলো সারা বছর ধরেই মানব পাচার করে। তবে যেহেতু এরা প্রতিবার নতুন কৌশল আর পথ ব্যবহার করে কাজ করে, তাই মহামারি ও দুর্যোগজনিত অস্থিরতার সুযোগ তারা নেবেই । লিবিয়ায় মানব পাচার চক্রের গুলিতে ৩৬টি তাজা প্রাণের সঙ্গে গড়ে প্রতি পরিবারের ১০ লাখ করে টাকা গেলেও শুধু সাড়ে তিন কোটি গেছে দালালের পকেটে! এটি সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসাগুলোর অন্যতম ।

দালাল চক্র শুরুর দিকে বিমানে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড নিয়ে তারপর ‘টারজান’ ভিসা লাগিয়ে জঙ্গলের পর জঙ্গল হাঁটিয়ে রাতের অন্ধকারে ট্রাকে, মালগাড়িতে, নৌকায় পাচার শুরু করে। মাঝারি গোছের একজন পাচারকারী যদি প্রতি কেসে কমপক্ষে কয়েক শ ডলার বা ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা পায়, তাহলে এর চেয়ে লাভজনক কাজ আর হতে পারে না। এই দালালদের রাজনৈতিক যোগাযোগ এত পোক্ত যে মানুষ এদের কথা প্রকাশ্যে বলে না। পুলিশ মামলা নেওয়া তো দূরের কথা, সাধারণ ডায়েরি পর্যন্ত নেয় না। পাচারকারী চক্রের হোতারা বরাবরই তাদের অপরাধের জন্য বড় ধরনের বিচার বা শাস্তির বিষয়টি পাশ কাটিয়ে যেতে সক্ষম হয়!

বিচারহীনতার কারণে সমাজে এদের অবাধ বিচরণ। নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় রোহিঙ্গাদের জাহাজের খোলে ভর্তি করে দাস পাচারের মতো ‘ডলফিন ভিসা’ বা ‘শিপে’ সাগরপথে মানব পাচার জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছে! কালে কালে এই আন্তর্জাতিক মানব পাচারচক্র, ধর্মীয় জঙ্গি নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সমুদ্র উপকূল-সংলগ্ন ৬০০ মানব পাচারকারী ও ১৬০০ জলযান বা ট্রলার ও জাহাজ পরিচালনার এজেন্ট, দুষ্ট রাজনৈতিক চক্র মিলে একটি জমজমাট ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হয়। থাইল্যান্ডের সাগরে সমুদ্র সম্পদের আকাল আর বিদ্যমান মানব পাচারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্র মিলে ২০১৫ সালের আন্দামান সাগরে শুধু মানব বিপর্যয়েরই জন্ম দেয়নি, থাই-মালয়েশিয়া সীমান্তে সন্ধান মেলে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের গণকবর !

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ-থাই সরকার সাগরপথে মানব পাচার দমন করলেও, মানব পাচারের মূল হোতাদের চিহ্নিত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো অগ্রগতি হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নজরে আন্দামান সাগরপথে পাচার কমে এলেও এই দালাল চক্র অবৈধ পথে ইউরোপে পাঠানোর স্বপ্ন দেখিয়ে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণদের মোহে ফেলে বিদেশে ‘রিসিভ ঘর’-এ আটকে মুক্তিপণ আদায় করছে। এতে তাজা প্রাণ ঝরে যায় এবং পরিবার ভিটেবাড়ি হারিয়ে পথে বসে। আমার নিজের সাম্প্রতিক গবেষণায় আর্থসামাজিক প্রভাবের চিত্র অতি ভয়ংকর। শুধু আর্থিক ক্ষতির হিসাবে মালয়েশিয়া যেতে ইচ্ছুক, সাগরপথে মানব পাচারের শিকার প্রায় অর্ধেক (৪৮ শতাংশ) ফেরত আসা ব্যক্তি ও তাঁর পরিবার নিম্নে ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ ২০ হাজার পর্যন্ত নগদ টাকা দালালকেই দিয়েছেন। পাশাপাশি হারিয়েছেন জমি, ভিটেবাড়ি আর অন্যান্য স্থাবর সম্পদ। এর ওপর স্বাস্থ্য আর মানসিক স্বাস্থ্যের হিসাবে ৪০ শতাংশ ফিরে আসা প্রবাসী স্বাভাবিক কাজ করার ক্ষমতা হারান। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব স্বপ্নচারী নিম্ন আয়ের মানুষ মানব পাচারের শিকার হয়ে চরম দারিদ্র্যসীমায় নেমে আসেন! এসব হতভাগ্য মানুষ ও তাঁদের পরিবারের অধিকাংশই না পেয়েছেন বিচার, না ঘটেছে তাঁদের পুনর্বাসন ।

ইতিমধ্যেই পেশাদার কূটনীতিক-সাবেক পররাষ্ট্রসচিব এম শহীদুল হক বলেছেন, দেশীয় দালাল চক্র এবং তাদের প্রশ্রয়দানকারী সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হলে কেবল লিবিয়া বা ইতালির নয়, নিশ্চিতভাবে অন্য দেশেও মানব পাচার বন্ধ হবে। এই যে দালাল চক্র এবং তাদের প্রশ্রয়দানকারী, যারা রাজনৈতিক ক্ষমতায় থেকে এসব অবৈধ কাজ চালিয়ে যেতে পারে, এদের প্রতিহত করতে হবে। তার আগে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। মজার বিষয়, দেশের প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে সরকারিভাবে মানব পাচারবিরোধী কমিটি রয়েছে। কিন্তু একজনও প্রভাবশালী নেতা নেই, যিনি রুখে দাঁড়াতে পারেন।

নিরাপদ অভিবাসন নিয়ে যাঁরা কাজ করেন তাঁরা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল দাবি করছেন—খুবই প্রায়োগিক প্রস্তাব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মানব পাচারবিরোধী এবারের প্রতিবেদনে সুশাসনের অভাবের স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। জনশক্তি রপ্তানির সিন্ডিকেট সরকারি ৩৭ হাজার টাকার প্যাকেজের জায়গায় মালয়েশিয়ায় অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রত্যেকের কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করে! এ ক্ষেত্রে উঁচু পর্যায়ের রাজনীতিক যাঁরা এ অবৈধ কাজে লিপ্ত থাকেন, তাঁদের চিহ্নিত ও বিচার করা জরুরি। কেননা অভিবাসনের নামে বৈধ বা অবৈধ পথে মানব পাচারেও এঁদের সক্রিয় ভূমিকা থাকে। সাগরপথে মানব পাচারে জড়িত একজন সাবেক সাংসদের নাম বারবার গণমাধ্যমে এসেছে। বিচারের অপেক্ষায় আছে হাজার মামলা! https://www.prothomalo.com/bangladesh/article/1660502/ প্রশ্ন হলো, সুশাসন নিশ্চিত না হলে কীভাবে এর সমাধান সম্ভব!

শুধু ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করেই এসব দালাল ও দুষ্কৃতকারীদের চিহ্নিত করা সম্ভব। হ্যাঁ, সামান্য কটা দালাল চিহ্নিত করতে কোনো রকেট সায়েন্স লাগে না। আজকাল ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজেই পাচারকারী ও তার অবস্থান শনাক্ত করা যায়। সামান্য মুঠোফোনের কল আর বিকাশের ট্রান্সফার ট্র্যাক করেই এসব করা সম্ভব। এবং সে প্রযুক্তি স্থানীয় পুলিশের কাছে রয়েছে। আর সরকার যদি মোবাইল অপারেটর ও মোবাইল মানি ট্রান্সফার কোম্পানিগুলোকে তাদের বিগ ডেটা থেকে তথ্য দিতে বাধ্য করে, তাহলে তো আর সমস্যাই নেই। দেশে এখন একটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনও আছে। সহজেই পাচারকারীর ফোন রেকর্ড ও টাকা পাঠানোর বিকাশ, নগদ, রকেট রেকর্ড থেকে তাকে অভিযুক্ত করে ডিজিটাল প্রতারণার মামলা করা যায়। তবে আজ পর্যন্ত এই আইনে একটিও মানব পাচারের মামলা হয়নি!

সাদা কথা হলো, এই দালাল ‘এলিয়েন’ কেউ না। সে কারও ভাই, ভাস্তে, চাচা, ভগ্নিপতি অথবা বন্ধুর পরিচিত। তারা আপনার-আমার চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায়। হ্যাঁ, তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা আছে। কিন্তু বছরের পর বছর স্বপ্নতাড়িত তরুণদের করুণ পরিণতি এবং তাঁদের পরিবারের নিঃস্ব হয়ে যাওয়া কোনোমতেই মেনে নেওয়া যায় না।

আহমেদ আবিদ : গবেষক, মানবাধিকার, সমাজ ও সমন্বিত শাসন। ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয় ও পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ইতালি।
ah.abid@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0