বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

শৈশবের শিক্ষক মানে গ্রিক দেবতা জানুস। তাঁর এক মুখে আদর-স্নেহের কোমলতা, অন্য মুখে শাসনের কঠোরতা। তাঁদের মনে হতো সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তাঁদের কেউ ছোট করার কথা ভাবতেও পারত না। প্রধান শিক্ষক ছিলেন নামাজি ও নিষ্ঠাবান মানুষ। তাঁর ঘরে গেলে মনে হতো সবচেয়ে ক্ষমতাধর কারও সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এখন দেখি দাপুটে নেতা শিক্ষকের গালে চড় মারছেন।

বগুড়া মিশন স্কুলটা ছিল আশ্চর্য রকম সুন্দর। ছোটবেলায় ওটাকেই মনে হতো আস্ত একটা পৃথিবী। যত পশ্চিমা উপন্যাস পড়েছি, কল্পনায় সেসবের আবহ ওইটুকু স্কুলের জগতেই এঁটে যেত। স্কুলের মাঠের পাশ দিয়ে হাঁটাপথের শেষে বড় দিদিমণির বাংলো, তার পাশে ব্যাচেলর শিক্ষিকাদের নিবাস। স্কুলের আঙিনা দিয়ে তাঁরা যখন হাঁটতেন, মনে হতো কী গরিমাময়, কী অসাধারণ! এখন ভাবি, কী করুণ আর মামুলি জীবন ছিল তাঁদের। অথচ শিক্ষকতার মহৎ জ্যোতির্বলয়ে ঢাকা থাকত তাঁদের মলিনতা, তাঁদের দারিদ্র্য। শেষ সম্বল ওই মহিমাটুকুও কেড়ে নিয়েছে একুশ শতক।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ওই শিক্ষকেরা খেটে খাওয়া মানুষই ছিলেন। পরিবার চালাতে হতো, মধ্যবিত্ত রুচির পোশাক পরতে হতো। চলনে-বলনে থাকতে হতো অনুসরণীয়। কী সামান্য বেতনে তাঁরা এত দায়িত্বের বোঝা বয়ে বেড়াতেন!

খ্রিষ্টান মিশনারি স্কুলের আলমারি থেকেই বই পড়ার শুরু। একদিন গল্প বলা ক্লাসে বড় দিদিমণি দাঁড় করিয়ে দিলেন। সেবা প্রকাশনীর অনুবাদে রবিনসন ক্রুশো উপন্যাসটা পড়া ছিল। কাঁপতে কাঁপতে সেই দ্বীপবাসী নিঃসঙ্গ মানুষটার গল্প বলা শুরু করলাম…আরেক দিন তিনি দেখে ফেললেন আমার আঁকা তিতুমীরের ছবি। ক্যালেন্ডারের পেছনের সাদা পাতায় পেনসিলে আঁকা। বললেন, ‘তুই এঁকেছিস! যা, ওই বড় দেয়ালে টাঙিয়ে দে।’ শিশুর লজ্জাকে এভাবে তিনি সাহস বানিয়ে দিলেন। বড় হয়ে, অনেক পরে গিয়েও ছবিটা সেখানেই পেয়েছিলাম।

হাইস্কুলের বণিক স্যার বাংলা ব্যাকরণ পড়াতেন। রাগীও ছিলেন, আবার ছিলেন তুমুল সরস। জন্ম থেকে তাঁর এক পা বাঁকানো ছিল। গৌরবর্ণের মানুষটি স্কুলে ঢুকতেন মাথা উঁচু করে। তাঁর শারীরিক অপূর্ণতাকেও মনে হতো তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

সাহিত্যের ক্লাস নিতেন সহকারী প্রধান শিক্ষক। ফরসা ছোটখাটো মানুষ। সাদা পায়জামার ওপরে সাদা খাটো পাঞ্জাবি বা হাফহাতা সাদা ফতুয়া পরতেন। তাঁর রহস্য একদিন আবিষ্কার করে ফেললাম। প্রায় বিকেলেই দেখতাম তিনি হেঁটে হেঁটে কোথায় চলেছেন। গোয়েন্দার মতো পিছু নিলাম। কী অদ্ভুত, তিনি কাছেরই ভাই পাগলা মাজার গোরস্থানে ঢুকছেন। কী ব্যাপার! সেখানে যে পাঠাগার, দাতব্য ঔষধালয় ও সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে, তিনি এসবের সেক্রেটারি। পাঠাগারটিতে ২০ থেকে ৩০ আলমারি বই ছিল। ছোটদেরগুলো শেষ করে বড়দের আলমারি হাতিয়ে পেলাম আবুল মনসুর আহমদের ফুড কনফারেন্স উপন্যাসটি। টুকটাক বই সংগ্রহ থেকে তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন বইয়ের বিরাট দুনিয়ায়।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ওই শিক্ষকেরা খেটে খাওয়া মানুষই ছিলেন। পরিবার চালাতে হতো, মধ্যবিত্ত রুচির পোশাক পরতে হতো। চলনে-বলনে থাকতে হতো অনুসরণীয়। কী সামান্য বেতনে তাঁরা এত দায়িত্বের বোঝা বয়ে বেড়াতেন! কয়েক বছর আগের কথা। বেতনের দাবিতে আন্দোলনকারী এক শিক্ষক ঢাকায় এসে পুলিশের নির্যাতনে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর এক সহকর্মীর বুকে সাঁটা কাগজে লেখা ছিল, ‘দারুণ কষ্টের নির্বাক কারিগর এই বঞ্চিত শিক্ষকসমাজের দুঃখ ও দাবির কথা কি কেউ শোনার নেই?’

সস্তা শ্রমের কারবার দিয়েই ধনী হচ্ছে ওপরতলার লোক। তারা চাইবে শিক্ষক গরিব থাকুন, হীনম্মন্য থাকুন, যাতে তাঁর ছাত্রছাত্রীরাও ওটাই শেখে। দেশে বা বিদেশে মাথা হেঁট করা দাসশ্রম দিতে যতটা লাগে, তার বেশি শিক্ষার দরকার শাসকদের নেই। তাঁদের কজনের ছেলেমেয়ে দেশে পড়ে? তাঁদের ঠেকাটা কোথায়?

দারুণ কষ্টের ওই নির্বাক কারিগরেরা এখনো নির্বাক। নতুন শিক্ষকেরা উপেক্ষা পেতে পেতে মানুষ গড়ার প্রেরণা হারাচ্ছেন। লোভের আগুন আর দুর্নীতির যে জোয়ার দেশটাকে গ্রাস করেছে, তাতে পুড়ে বা সাঁতরে বিত্তের কূলে ওঠার চেষ্টা করলে কি তাঁদের দোষ দেওয়া যাবে? সরকারি কলেজের শিক্ষকেরা তা–ও কিছুটা সম্মান আর সচ্ছলতা পান। বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষকদেরও প্রতিষ্ঠা আছে। কারও কারও দাপটও কম না। কিন্তু দারুণ কষ্টের নির্বাক কারিগর যে প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকেরা, উন্নয়নের ঝলকানির মধ্যে তাঁরা দিনের জোনাকির মতো নিভে আছেন।

গ্রামের স্কুলে ইংরেজি শিক্ষক বইয়ের ভাষায় কথা বলতেন। ছাত্রছাত্রীদেরও বলতেন, আধুনিক হও, উন্নত হও। তিনিও প্যান্ট ছেড়ে লুঙ্গি ধরেছেন, চাষবাসও করেন। তাঁর ছাত্রছাত্রীরা যত প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, আপন সন্তানেরা সেটা পারেনি; এই ভাবনা কি তাঁকে কষ্ট দেয়? সস্তা শ্রমের কারবার দিয়েই ধনী হচ্ছে ওপরতলার লোক। তারা চাইবে শিক্ষক গরিব থাকুন, হীনম্মন্য থাকুন, যাতে তাঁর ছাত্রছাত্রীরাও ওটাই শেখে। দেশে বা বিদেশে মাথা হেঁট করা দাসশ্রম দিতে যতটা লাগে, তার বেশি শিক্ষার দরকার শাসকদের নেই। তাঁদের কজনের ছেলেমেয়ে দেশে পড়ে? তাঁদের ঠেকাটা কোথায়?

এ লেখার সময় ছোট হতে হতে আবার আমি স্কুলপড়ুয়া বালক হয়ে যাচ্ছি। বুকে বই চেপে স্কুলে যাচ্ছি। ওই তো, দূর থেকে স্কুলের চাল দেখা যায়। সাইকেলে চেপে আমাদের পাশ দিয়েই, ওই তো চলে গেলেন রাশভারী প্রধান শিক্ষক। ওই তো গঞ্জের হাটে পেপার পড়ছেন রহমান স্যার। পরদিন সাধারণ জ্ঞানের ক্লাসে মজাদার তথ্য দিয়ে মুগ্ধ করে দেবেন আমাদের। ভাবছি, সেই সব শিক্ষক, সৈয়দ মুজতবা আলীর গল্পের সেই সাহেবের কুকুরের এক ঠ্যাঙের সমান মূল্যের মানুষটি আমার কে? আমাদের কে? দেশের কে?

আর আমরাই–বা কে? আমরাও কি ওই নেতার মতো বড় হয়ে ছোটবেলার শিক্ষকদের নিচে ফেলে ওপরে উঠিনি? প্রতিষ্ঠিত আমরাও কি হাতজোড় করিয়ে তাঁদের দাঁড় করিয়ে রাখছি না?

ফারুক ওয়াসিফ লেখক ও সাংবাদিক

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন