default-image

করোনা এসে দুনিয়াজুড়ে যত খেল দেখাচ্ছে, এর মধ্যে মাস্ক নিয়ে রশি টানাটানি জমেছে বেশ। জুত করে বসে মজায় মজায় এ খেলা দেখছে পাজির পা-ঝাড়া করোনা। এ যেন যোগীন্দ্রনাথ সরকারের সেই ‘কাজের ছেলে’ কবিতার দুটি চরণ, ‘বাহবা বাহবা ভোলা ভুতো হাবা খেলিছে তো বেশ।

দেখিব খেলাতে, কে হারে কে জেতে, কেনা হলে শেষ।’

মুখে মাস্কের ব্যবহারে স্বাস্থ্য সুরক্ষা কতটা সফল, এ নিয়ে বিতর্কেরও শেষ নেই। ধন্দের ধাঁধা আছে ষোলো আনাই: মাস্ক পরব কি পরব না? আর ব্যবহার করলে কোন মাস্ক? সস্তার ওয়ানটাইম সার্জিক্যাল মাস্ক, না দামি এন৯৫ মাস্ক, নাকি মধ্যম দামের গেঞ্জি বা সুতি কাপড়ের মাস্ক?

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশ্বগুরু এক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাই মাস্ক নিয়ে কত কথা বলছে। জবানের ঠিক নেই। আজ এ কথা বলে তো কাল সে কথা। এই তো, রোববারই সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে, স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে যে ১২ বছর বা তার বেশি বয়সী শিশুদের মাস্ক পরা উচিত। পাঁচ-ছয় বছরের শিশুদের মাস্ক না পরলেও চলবে।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের শুরুতেই তারা বলেছিল, সুস্থ মানুষের মাস্ক পরার দরকার নেই। এটি আবশ্যক বলে কোনো প্রমাণ মেলেনি। এরপরই আবার তারা ঘোষণা করে, করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে গণজমায়েতের স্থানগুলোয় সবার মাস্ক পরা দরকার।

ভাবগতিকে করোনার বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অবস্থান লাঠি ভর করা বুড়োর মতো, যে লাঠি কুটকুট করে ঘুণপোকার মতো খেয়ে দিচ্ছে এ ভাইরাস।

বিজ্ঞাপন

তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান কিন্তু মুখে মাস্ক এঁটে চলাফেরা করারই পক্ষে। তাদের ব্যাখ্যাটি হচ্ছে করোনায় সংক্রমিত মানুষের মুখনিঃসৃত মিহি জলকণা বা ড্রপলেটস থেকে এ ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটতে পারে। যেহেতু ব্যাপক পরীক্ষার বালাই নেই, কাজেই কার মধ্যে করোনা ঘাপটি মেরে আছে, কে জানে? জনে জনে পরীক্ষা করে করোনায় সংক্রমিত সব মানুষ শনাক্ত করা বাস্তবে সম্ভবও নয়। সে ক্ষেত্রে মাস্ক পরাই শ্রেয়।

জলজ্যান্ত সত্য কথাটা হচ্ছে করোনা এখন গোটা বিশ্বেই গ্যাঁট হয়ে আছে। করোনা ঝুলছে, দুলছে, কানের কাছে সেকালের গ্র্যান্ডফাদার ক্লকের মতো ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজাচ্ছে, যমদূত হাজির! তবে বাস্তবে যে সমস্যা অষ্টপ্রহর ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো ঝুলে থাকে, তা নিয়ে ব্যাঙের ছাতার মতো নানা মুনির নানা মত জন্মে। রুচি আর অনুভূতিই-বা বিভেদ ভুলে থাকবে কেন? তাই একজন যেখানে মাস্ক পরে স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে, অন্যজনকে মাস্ক পরিত্যাগে গোঁয়ারগোবিন্দ না হলেই নয়। মাস্ক তার কাছে ঘোড়ার লাগাম বা গরুর গুমাই ছাড়া আর কী? কারও-বা আছে ভয়ানক ফোবিয়া। মাস্ক পরলেই দম বন্ধ হয়ে আসে। চোখে ভাসে মাচা ভরা পটোল, কেবল তুলে নেওয়ার অপেক্ষা। মুখগহ্বরের হাওয়ায় যাদের সমস্যা, নাসারন্ধ্র রক্ষায় তারা মাস্কবিমুখ হলে সে দায় কে নেবে? আর মাস্ক পরে হ্যাঁচ্চো? সে যত শাবাশই দিই না কেন, কাজটা মোটেই প্রীতিকর কিছু নয়।

বিজ্ঞাপন

কায়িক শ্রমের রোজগেরে মানুষের পক্ষেও মুখে হরদম মাস্ক এঁটে কাজ করা কঠিন। দিনমানে তাদের এমন সময়ও আসে, যখন হাঁ করে দম নিতে হয়। তখন মাস্ক দূরে থাক, খোলা মুখে স্বস্তিকর হাওয়া থাকলে বরং ভালো। এসব বাস্তবতা না মানার জো আছে?

রিকশায় যাব, দেখি মুখের বদলে চালকের থুতনিতে লেপ্টে আছে মাস্ক। সেও আবার এমন তেল চিটচিটে, করোনা এর নাগাল পেতে আরাম করে বংশবিস্তারে বসে যাবে। বলি, ‘মুখের বদলে থুতনিতে মাস্ক কেন, ভাই?’

চালক বলেন, ‘রিকশা চালানোর সময় মুখে দিতাম ফারি না। দম লইতে কষ্ট অয়। ইতা রাহি খালি পুলিশের ডরে।’

বিজ্ঞাপন

মাস্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলে একটু বিপদেই পড়ে গেলাম। প্যাডেল মারতে মারতে রিকশাচালক আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘রোজ রোজ আমরা যে ভেজাল খাবার খাই, দূষিত বাতাস খাই, এর চাইতে করুনা কি খুব বেশি খারাপ?’

রিকশাচালকের কথা শেষ হতে না হতে মুখোশের ভেতরেই ভক করে একটা উৎকট গন্ধ এসে ধাক্কা মারল নাকে। রাস্তায় এক জায়গায় বেশ খানিকটা জলকাদা। বৃষ্টির পানি জমে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। রিকশাচালক থুতনির মাস্ক তুলে নাকমুখ ঢেকে যা বোঝানোর বুঝিয়ে দিলেন।

কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখি, বেশির ভাগ বিক্রেতার মুখে মাস্ক নেই। শুধু বেশির ভাগ বললে ভুল হবে। বলা যায়, ৯০ ভাগেরই মাস্ক নেই। অল্প যে কজনের আছে, তাঁরা হয় থুতনিতে ঝুলিয়ে, নয়তো পকেটে পুরে রাখেন মাস্ক। কেউ কেউ পয়সা উশুলের ঢঙে মাস্কটাকে রুমালের কাজেও লাগান। আর সামাজিক দূরত্ব? তার তো কবেই চাট্টিবাট্টি গোল।
এক মাছ বিক্রেতাকে বললাম, ‘মাস্ক কই?’

বিজ্ঞাপন

তিনি এমনভাবে হাসলেন, যেন এর মতো রঙ্গের কথা আর শোনেননি। তাঁর হয়ে জবাব দিলেন মাস্ক না পরা পাশের বিক্রেতা, ‘এই হগল পইরা ব্যবসা চলে না। মুখে এই ত্যানাকাপড় থাকলে আপনেরা আমগোর কথা বুঝতে পারবেন না।’

ট্যাংরা-পুঁটি বেচতে বসা এসব চুনোপুঁটির দোষত্রুটি ঘেঁটে আর কী হবে? সভ্যভব্যের ঝান্ডা ধরে চটাক করে তুড়ি বাজানো মার্কিন মুলুকেই মাস্ক নিয়ে কত–কী হয়ে যাচ্ছে! ট্রাম্প নিজেই তো গোঁ ধরেছিলেন মাস্ক পরবেন না। মাস্ক নাকি তাঁকে নাকি ওয়েস্টার্ন হিরো লোন রেঞ্জারের কথা মনে করিয়ে দেয়। মানে নিজেকে সে রকম লাগে। কথা তো আর ছাড়লেই হলো না। জায়গামতো লাগতে হবে। কাল্পনিক হিরো লোন রেঞ্জারের যে ছবি, এতে মাস্ক রয়েছে মুখের ওপরের অংশে। আর ভাইরাসরোধী ফেসমাস্ক ব্যবহার করতে হয় মুখের নিচের অর্ধে। আকাশ-পাতাল তফাত। তবে ‘দ্য মাস্ক’ ছবিতে কমেডি তারকা জিম ক্যারি গোটা মুখে জাদুর মাস্ক এঁটে যে কেরামতি দেখিয়েছেন, ট্রাম্প মাস্ক না পরেই কমেডিতে তাঁকে টেক্কা দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

ট্রাম্পকে শুধু ঘাঁটাঘাঁটি কেন? মুখে মাস্ক আঁটায় অরুচি গোটা আমেরিকায়। যুক্তরাষ্ট্রের ৩৪টি অঙ্গরাজ্যে ভাইরাসরোধী মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই কঠোর সুরক্ষাবিধিকে গুল্লি মেরে মাস্কবিরোধীরা সড়কে সরব। যুক্তরাজ্যেও হাজারো মানুষ মাস্কবিমুখ। মাদ্রিদ আর ডাবলিনের মতো বড় বড় শহরে অগণিত মাস্কবিরোধী বিক্ষোভ করেছে। তাদের কথা, এই বাধ্যবাধকতা ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী। স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়?

তা স্ফুরণ যতই ঘটুক, বাস্তবতা কিন্তু মেনে নিতেই হয়। তাই নাছোড়বান্দা ট্রাম্পকেও গোঁয়ার্তুমি ছেড়ে সোজা হতে হয়েছে। গত জুলাইয়ে মুখে কালো মাস্ক এঁটে জনসমক্ষে এসে ট্রাম্প বলেন, ‘মাস্ক পরা খুব ভালো একটা ব্যাপার।’

তবে কথা হলো যে মুখে মাস্ক এঁটে চলাফেরা করায় ভালো লাগুক বা মন্দ লাগুক, সেটা এখন বিবেচনার বিষয় নয়। সময়ের দাবি, নিজেকে করোনা থেকে নিরাপদ রাখতে, অন্যদের সুরক্ষা দিতে মাস্ক পরাটা আবশ্যক।


শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।

shariful.bhuiyan@prothomalo.com

মন্তব্য পড়ুন 0