default-image


সামরিক অভ্যুত্থান ও সামরিক শাসনের দেশ মিয়ানমার। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ১৯৬২ সালের অভ্যুত্থানের পর ৫০ বছর সরাসরি সামরিক শাসনের অধীনেই ছিল। কার্যত এখনো আছে। ২০০৮ সালে সাংবিধানিকভাবে সামরিক বাহিনীকে দেশ পরিচালনার অংশীদার করা হয়েছে। সংসদে ২৫ শতাংশ আসন সেনাবাহিনীর জন্য বরাদ্দ আছে। এ ছাড়া প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্তবিষয়ক মন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয় সেনাবাহিনী থেকে। ফলে সেনাবাহিনী একরকম ক্ষমতায়ই ছিল। মাঝে ক্ষমতা ভাগাভাগি করেছিল কিছুদিন। এখন আবার ক্ষমতা নিজেরাই পুরোটা দখল করেছে। তাই মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করায় গণতন্ত্র নস্যাৎ হয়ে যাচ্ছে বলে নতুন করে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। সেখানে গণতন্ত্র আগেও ছিল না, এখনো নেই। তাই নতুন করে নস্যাৎ হওয়ার সুযোগ নেই।

গণতন্ত্রের হিসাবে মিয়ানমার এমনিতেই পিছিয়েই ছিল। তাদের সামরিক বাহিনী গত শতকের ষাট বা সত্তরের দশকের সামরিক শাসনের নীতিতেই আছে। গত তিন দশকে বিশ্বে সামরিক অভ্যুত্থানের মাত্রাগত পরিবর্তন হয়েছে। এখন আর রাতের আঁধারে সামরিক বাহিনীর লোকেরা সরকারপ্রধানকে হত্যা করে ক্ষমতাচ্যুত করেন না। এখন সিভিল মিলিটারি মিলেমিশে অভ্যুত্থান করে। এটাকে বলে সিভিল মিলিটারি ক্যু। এ নিয়ে একাধিকবার লিখেছি। এরপরও মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য  সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করছি। বিশ্বের এমন কোনো দেশ নেই যেখানে অসন্তোষ বা ক্ষোভ নেই। এই অসন্তোষকে পুঁজি করে সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে নাগরিকদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে।

বিজ্ঞাপন

শুরুতে বিক্ষুব্ধ নাগরিকদের রাজপথে নামিয়ে দেওয়া হয়। বিক্ষোভে জনসাধারণের অংশগ্রহণ বাড়তেই থাকে। একপর্যায়ে বিদেশি শক্তিগুলো প্রকাশ্যে আসতে থাকে। সরকারের সমালোচনা করে বা সমর্থন প্রত্যাহার করে। এরপর মঞ্চে আবির্ভূত হয় সামরিক বাহিনী। দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও দায়িত্ব হাতে তুলে নেয় দেশপ্রেমিক সামরিক বাহিনী। এই প্রেম এতই মধুর যে দেশের প্রতি দায়িত্ব আর ছাড়তে চায় না। এটাই সাম্প্রতিক সময়ে সিভিল মিলিটারি ক্যুর নতুন চিত্র। কিন্তু মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী সোমবার সকালে কোনো ভান-ভণিতা করেনি। সরাসরি প্রকাশ্যে ক্ষমতা দখল করেছে।

২০১০ সালে ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি নির্বাচনে জয়লাভ করলেও আড়াল থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করত সামরিক বাহিনী। ২০১৫ সালে অং সান সু চির পার্টি ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি জয়লাভ করলেও দেশটি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণেই ছিল। ওই সময় সামরিক বাহিনী রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের বর্বর নির্যাতন করে বের করে দিলেও সু চি গণতান্ত্রিক নেতা হিসেবে জোরালো বিরোধিতা করতে পারেননি। বরং তিনি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ড সমর্থন করছেন। ২০২০ সালে সর্বশেষ নির্বাচনে সু চির দল জয়লাভ করলেও সামরিক বাহিনী কারচুপির অভিযোগ করে আসছিল। টানাপোড়েনের এই পর্যায়ে কিছুদিন বিরতি দিয়ে আবারও ক্ষমতায় এখন মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী।

মিয়ানমারের রাজনীতিতে স্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী গেড়ে বসেছে। এখান থেকে মিয়ানমার শিগগির বের হতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ, তাদের শাসনক্ষমতা অনেকটা প্রতিবেশী চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপরও নির্ভর করে।

মিয়ানমারের রাজনীতির একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, দীর্ঘদিন শাসন করার পর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী মূলত একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তারাও সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতার ভাগ চায়। এই কারণে ২০০৮ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতার অংশীদার করা হয়েছে। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে সামরিক বাহিনীর এ রকম সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতার অধিকার আছে বলে জানা নেই। সামরিক বাহিনী তৈরিই হয় দেশের নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ড কখনোই শুধু নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

প্রাচীন ইতিহাস থেকে বর্তমান সময়, সব আমলেই সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের নজির পাওয়া যায়। দেশপ্রেম ও দেশকে রক্ষার কথা বলেই সামরিক বাহিনী সব সময় ক্ষমতা দখল করে। রোমের সম্রাট জুলিয়াস সিজার সামরিক বাহিনী থেকে এসেই সম্রাট হয়েছিলেন। তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত সেনাবাহিনীই করেছিল। সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখল রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে ঢুকে গেছে। বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্র এই কাঠামোর পুনর্গঠন করতে পারলেও মিয়ানমারের রাজনীতিতে স্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী গেড়ে বসেছে। এখান থেকে মিয়ানমার শিগগির বের হতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ, তাদের শাসনক্ষমতা অনেকটা প্রতিবেশী চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপরও নির্ভর করে।

বিজ্ঞাপন

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় উত্তরণের জন্য আশায় থাকা ইতিবাচক প্রক্রিয়া। কিন্তু এর সঙ্গে বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে মিয়ানমারে একটি গণতান্ত্রিক সরকার থাকা প্রয়োজন, তবেই সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। অন্যথায় সুযোগ কম। ভৌগোলিক অবস্থান, ভারত মহাসাগরের নৈকট্য, প্রাকৃতিক সম্পদের সমাহার, চীনের সঙ্গে সীমান্ত—এসব কিছু বিবেচনা করেই মিয়ানমারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে হবে। এসব বিষয় মিয়ানমারের জন্য যেমন সম্পদ ও সুবিধা, আবার অভিশাপও বটে। এ জন্যই মিয়ানমারে গণতন্ত্র আসে না। বিদেশি শক্তির পুতুল হিসেবে সামরিক বাহিনী দেশ পরিচালনা করে।

অনেকেই সন্দেহ করছেন, মিয়ানমারের অভ্যুত্থানে চীনের ইন্ধন রয়েছে। মাত্র তিন সপ্তাহ আগে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মিয়ানমার সফর করেছেন। তিনি মিয়ানমারের সেনাপ্রধান ও সু চির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। চীন কখনোই চাইবে না একেবারে ঘাড়ের ওপর যুক্তরাষ্ট্র এসে নিশ্বাস ফেলতে শুরু করুক। সু চির দল ফের ক্ষমতায় এলে এবং সরকারে চীনপন্থী সামরিক অফিসারদের প্রভাব হ্রাস পেলে চীন বেকায়দার পড়তে পারে। কিছুদিন আগে মিয়ানমার যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল কিছুটা। ওই সময় মিয়ানমারের সামরিক কর্মকর্তারা কারেন বিদ্রোহীদের মদদ দেওয়ার জন্য চীনকে দায়ী করতেন। চীন যদি সত্যিই এই অভ্যুত্থানে ইন্ধন দিয়ে থাকে, তবে বুঝতে হবে মিয়ানমারে চীনের অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে।

সবাই মিয়ানমারের নতুন সামরিক সরকারের সঙ্গে নতুন করে বোঝাপড়া শুরু করবে। নিজ নিজ স্বার্থ আদায়ের চেষ্টা করবে। চীন নতুন নতুন বিনিয়োগের ঝোলা নিয়ে উপস্থিত হবে। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চুক্তি করতে চাইবে।

আবার এই অভ্যুত্থানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা আছে কিনা— এই প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন প্রশাসন কাজ শুরু করেছে। সবাইকে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে উসকে দিতে পারে।

এ সবই ধারণা। কোনো চাক্ষুষ প্রমাণ নেই । তবে মনে রাখতে হবে, স্নায়ুযুদ্ধকালীন কূটনীতির পরিবর্তন হয়েছে। ওই সময়ে অপছন্দের সরকারকে ফেলে দেওয়া হতো যেকোনো প্রকারেই হোক। এখন অন্য দেশের সরকারকে নিজের পক্ষে আনতে হবে যে করেই হোক।

এই পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় মিয়ানমারের অভ্যুত্থান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না। বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ঝুলে থাকবে। সবাই মিয়ানমারের নতুন সামরিক সরকারের সঙ্গে নতুন করে বোঝাপড়া শুরু করবে। নিজ নিজ স্বার্থ আদায়ের চেষ্টা করবে। চীন নতুন নতুন বিনিয়োগের ঝোলা নিয়ে উপস্থিত হবে। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চুক্তি করতে চাইবে। অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব করতে পারে। সবার সঙ্গে হিসাব মেলাতে পারলে মিয়ানমারের সামরিক সরকার লম্বা সময় থাকতে পারবে বা নির্বাচন দিয়ে নিজেদের দলকে ক্ষমতায় নিয়ে আসবে।

অভ্যুত্থানের পর বিশ্ব মোড়লদের প্রতিক্রিয়া দেখলে এ বিষয়গুলো আরও পরিষ্কার হবে। যুক্তরাষ্ট্র যথারীতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সু চিকে আটকের নিন্দা জানিয়েছে। তাদের সঙ্গে নিন্দায় যোগ দেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নও। কিন্তু খুব বেশি কঠোর পদক্ষেপ নেবে না। টুকটাক নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে।

ওদিকে চীন সবাইকে শান্ত থাকার অনুরোধ জানিয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সবাই মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে মেনে নিয়েছে। এতে করে সবাই লাভবান হবে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতি হবে মিয়ানমারের। গণতন্ত্র আরও দুর্বল হবে, কখনোই স্থিতিশীল ও শক্তিশালী দেশ হিসেবে দাঁড়াতে পারবে না।

ড. মারুফ মল্লিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন