default-image

মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান হওয়ার পর দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চীনের ভূমিকা নিয়ে নানা কথাবার্তা হচ্ছে। অনেকে মনে করছেন, অং সান সু চি চীনের দিকে বেশি ঝুঁকে গিয়েছিলেন এবং সেটি মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে গভীরভাবে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। ফলে এই অভ্যুত্থান হয়েছে। এই ভাষ্যের সমর্থনে বলা হচ্ছে, সু চির দাতব্য প্রতিষ্ঠান চীনের রাষ্ট্রমালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে চাঁদা নিয়েছে। সে কারণেই সু চির ফাউন্ডেশনের নির্বাহীদের সেনাবাহিনী গ্রেপ্তার করেছে।

এমন প্রতিবেদনও বেরিয়েছে, চীনের মধ্যস্থতায় সু চি বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গা মুসলমানদের আবার মিয়ানমারে ফেরত নিতে রাজি হয়েছিলেন। খবরে বলা হচ্ছে, গত জানুয়ারিতে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জুন নাগাদ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করার উপায় খুঁজতে বৈঠক করেছিলেন এবং সেটি সেনাবাহিনী বরদাশত করতে পারেনি।

বিজ্ঞাপন

কথা হচ্ছে, সু চি যদি সত্যিই চীনের মধ্যস্থতায় সাড়া দিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে রাজি হয়ে থাকেন এবং সে কারণেই যদি তাঁকে সেনাবাহিনী উৎখাত করে থাকে, তাহলে তা চীনের সম্মানহানি করেছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই সেনাবাহিনীর ওপর চীনের খেপে যাওয়ার কথা। আর সে কারণেই বলা হচ্ছে, বেইজিংয়ের ক্রোধ প্রশমনে মিয়ানমারের সেনা সরকার চায়না-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডর প্রকল্পের মতো বড় বড় প্রকল্পে আগের চেয়ে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। তারা চীনের রাগ কমানোর জন্য আগের চেয়ে বেশি চীনা পণ্য আমদানি করবে এবং মিয়ানমারে চীনের বিনিয়োগকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেবে। এগুলো যদিও অনুমাননির্ভর যুক্তি, তথাপি মিয়ানমারে চীনের নীতি কী হবে, তা সবার কাছেই কৌতূহলের বিষয় হয়ে আছে।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে দেশটির বিভিন্ন আদিবাসী ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের উত্তেজনা আছে। এই চাপান–উতরই নেপিডোর ওপর বেইজিংয়ের প্রভাব খাটানোর সুযোগ করে দেয়।

মিয়ানমারের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় প্রায় ৩০ হাজার সশস্ত্র সদস্যের সরকারবিরোধী ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মিকে চীন সরকার গোপনে সহায়তা দিয়ে থাকে বলে বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে জানা যায়। খবর বেরিয়েছে, বিদ্রোহী গ্রুপ আরাকান আর্মিকে চীনের তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে।

গত বছরের জুনে থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনী তাদের দেশ হয়ে মিয়ানমারে যাচ্ছিল, এমন একটি চীনা অস্ত্রের চালান আটক করেছিল। ধারণা করা হয়, ওই অস্ত্র মিয়ানমারের বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর কাছে যাচ্ছিল। মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং এর আগে বলেছেন, তাঁর দেশের সন্ত্রাসীদের বাইরের শক্তি মদদ দিচ্ছে। বিশেষ করে আরাকান আর্মিকে ‘একটি বাইরের দেশ’ সমর্থন দিচ্ছে বলেও তিনি ঘোষণা করেছিলেন।

মূলত মিয়ানমারের আদিবাসী শান্তি প্রক্রিয়ায় চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। অতীতে মিয়ানমার ইউনিয়ন পিস কনফারেন্সে অংশ নিতে বেইজিং জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলোর জোট এথনিক আর্মড অর্গানাইজেশনস অব দ্য ফেডারেল পলিটিক্যাল নেগোসিয়েশন অ্যান্ড কনসালটেটিভ কমিটির যাবতীয় অর্থায়ন করেছিল।

অন্যদিকে মিয়ানমারে পশ্চিমা কোনো দেশের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব প্রতিহত করতে চায় চীন। যেমন ২০১৬ সালে মিয়ানমারে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত সেখানকার মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে ‘চীনের স্বার্থের প্রতি সম্মান রেখে’ কাচিন ও শান রাজ্যে সফর না করতে ‘অনুরোধ’ জানিয়েছিলেন। চীনের এই একক আধিপত্যকে মিয়ানমারের সেনা কর্মকর্তাদের অনেকেই ভালো চোখে দেখেন না। চীন সেখানে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করে অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করায় তা মিয়ানমারের জনগণের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীনের বিপুল বিনিয়োগের কারণে সেনা কর্মকর্তাদের পারিবারিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা কমে যাচ্ছে। এতে সেনা কর্মকর্তারা বিরক্ত হচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের কিছুই করার নেই। কারণ, চীনকে খেপিয়ে এখন তাঁদের পক্ষে সেনাশাসন ধরে রাখা সম্ভব হবে না।

বিজ্ঞাপন

এই অভ্যুত্থান যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এমনকি আসিয়ানভুক্ত বেশ কয়েকটি দেশকেও অখুশি করেছে। অর্থাৎ পশ্চিমা দুনিয়া সেনাশাসকদের পক্ষে নেই। এই অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে চীন। চীন ভালো করেই জানে, তারা বিরোধিতা করলে মিয়ানমারে সেনাশাসন চালানো সম্ভব হবে না। আর এ কারণেই সেখানকার সেনা সরকার চীনের সব ধরনের দাবিদাওয়া মেনে নিতে বাধ্য হবে।

তবে মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থীদের বিক্ষোভ চীনকে অনেকটা বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। বিক্ষোভকারীরা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর পাশাপাশি চীনকেও গণতন্ত্রের বাধা হিসেবে তুলে ধরছেন। সেনাবাহিনীর গুলিতে এ পর্যন্ত ৫০ জনের বেশি বিক্ষোভকারী মারা গেছেন, যা সেনাশাসকদের পাশে চীনের দাঁড়ানোর নৈতিক বৈধতাকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এ কারণে চীন মিয়ানমারের জনমতকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। খবর বেরিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের জন্য চীন মিয়ানমারের সেনা সরকারকে প্রযুক্তি সহায়তা দিচ্ছে। এসবের মাধ্যমে চীন একক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে।

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

সঞ্জয় পুলিপাকা: ভারতের দিল্লি পলিসি গ্রুপের একজন জ্যেষ্ঠ ফেলো এবং মোহিত মুসাদ্দি: একই গ্রুপের একজন গবেষণা সহযোগী

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন