বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মোল্লা বারাদারের সঙ্গে হাক্কানি নেটওয়ার্ক-সমর্থকদের কোন্দলের বিষয়টি শুরুতে গুজব মনে করা হলেও এখন আর একে গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ নেই। অনেকেরই বিশ্বাস, তালেবানের অভ্যন্তরে এই কোন্দলের মূল কারণ প্রধানমন্ত্রীর পদ। মোল্লা বারাদার ও সিরাজউদ্দিন হাক্কানি—উভয়ই ছিলেন এর দাবিদার এবং কেউই কাউকে ছাড় দিতে রাজি ছিলেন না। এ নিয়েই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। এ পরিপ্রেক্ষিতেই পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রধান ফয়েজ হামিদ এ মাসের প্রথম সপ্তাহে কাবুলে আসেন এবং বিবদমান পক্ষদ্বয়ের সঙ্গে আলোচনা করে মোল্লা মোহাম্মদ হাসান আখুন্দকে প্রধানমন্ত্রী করে মোল্লা বারাদারকে প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী ও সিরাজউদ্দিন হাক্কানিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগের ফর্মুলা দিয়ে আপাতত উভয় পক্ষকে শান্ত করে রেখে যান। কিন্তু এর আগেই যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। হাক্কানি-সমর্থকদের হাতে নিগৃহীত হয়েছেন তালেবানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা বারাদার। এখন শোনা যাচ্ছে, তিনি রাজধানী কাবুল ছেড়েই চলে গেছেন।

কিন্তু কেন এমন হলো? এত যুদ্ধ, এত মৃত্যু, এত ত্যাগের পর বিজয় আসতে না আসতেই এমন হলো কেন? দলটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাকেই-বা দেশ ছাড়তে হলো কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে গত শতাব্দীর আশির দশকে।

তখনো তালেবানের জন্ম হয়নি। সোভিয়েত বাহিনীকে ঠেকানোর জন্য মার্কিন ও পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে আফগানিস্তানের প্রায় প্রতিটি উপত্যকায় গড়ে তোলা হয়েছে ছোট ছোট ‘জিহাদি গ্রুপ’। গ্রুপের শক্তি আর লোকবল বুঝে ঢালা হয়েছে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার। এমনই একটি গ্রুপ হলো ‘হাক্কানি নেটওয়ার্ক’। এর প্রধান হলেন পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের ‘দারুল উলুম হাক্কানিয়া’ দেওবন্দি মাদ্রাসার গ্র্যাজুয়েট জালালউদ্দিন হাক্কানি। পাঠক লক্ষ করুন, আফগানিস্তানের প্রায় সবারই নামের শেষে তার জন্মস্থান বা গোত্রের পদবি ব্যবহার করা হয়, যেমন: হামিদ কারজাই, আশরাফ গনি আহমাদজাই ইত্যাদি। কিন্তু জালালউদ্দিনের জন্ম পাকতিয়ার জাদরান জেলায় হলেও তিনি তাঁর নামের সঙ্গে যোগ করেছেন তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম—হাক্কানি। সেই সূত্র ধরে তাঁর অনুসারীরাও এই নাম ব্যবহার করে চলেছেন।

সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে হাক্কানি নেটওয়ার্ক এমনই পারদর্শিতা আর দক্ষতা দেখিয়েছিল যে মার্কিন প্রশাসন তাঁকে খেতাব দিয়েছিল ‘সাক্ষাৎ দেবদূত’। সিআইএর ভাষায় তিনি ছিলেন ‘এক অমূল্য সম্পদ বা প্রাইসলেস অ্যাসেট’। ২০০১ সালের পর অবশ্য সিআইএ তাঁর ছেলে সিরাজউদ্দিনের মাথার দাম নির্ধারণ করেছিল ১০ মিলিয়ন ডলার।

যাক, সোভিয়েতবিরোধী জিহাদের শেষ দিকে ড. নাজিবুল্লাহর পিডিপিএ সরকারের পতন হলে দেশটি নিমজ্জিত হয়ে যায় গৃহযুদ্ধে। আর এই গৃহযুদ্ধের গর্ভ থেকেই জন্ম নেয় তালেবান। এ প্রসঙ্গে আরও একটি বিষয় বিবেচনার দাবি রাখে—তালেবান ব্যতীত অন্য যেসব দল বা গ্রুপ জিহাদে অংশ নেয়, তাদের কারও সুনির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দর্শন বা এজেন্ডা ছিল না। তাদের একটাই লক্ষ্য ছিল—সোভিয়েত হটানো। কিন্তু তালেবানের ছিল সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা—আফগানিস্তানে শরিয়াভিত্তিক ইসলামি আমিরাত প্রতিষ্ঠা। সেই অর্থে সে সময় তালেবানই ছিল একমাত্র রাজনৈতিক দল বা শক্তি, যার ছিল সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য। তালেবান আন্দোলনের প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে ১৯৯৫ সালে সিরাজউদ্দিন হাক্কানি তালেবানের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন।

আসলে ‘একদলীয় সরকার’ আর ‘বহুদলীয় জোট সরকারের’ মধ্যে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক রসায়ন। তালেবানের বর্তমান নেতৃত্ব এই রসায়ন সম্বন্ধে সম্যক ওয়াকিবহাল বলে মনে হয় না। তাই গোড়াতেই তাঁরা পড়ে গেছেন ফাঁদে। সঙ্গে আন্তর্জাতিক আম্পায়ারদের চাল তো আছেই।

বোধগম্য কারণেই তালেবানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তাঁর কণ্ঠ ছিল ক্ষীণ। সে জন্যই ১৯৯৬ সালে তালেবান ক্ষমতা দখল করে যে সরকার গঠন করে, তাকে তালেবানের ‘একক সরকার’ই বলা চলে, যার একক নেতা ছিলেন মোল্লা ওমর। অন্য কোনো দল বা গ্রুপের সেখানে বলার মতো কিছু ছিল না। তাই ২০০১ সালে তালেবানের পতনের আগমুহূর্ত পর্যন্ত তাদের কোনোরূপ অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের মোকাবিলা করতে হয়নি।

কিন্তু ২০২১ সালের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত ২০ বছরে যেমন বদলেছে বৈশ্বিক রাজনীতির চালচিত্র, তেমনি বদলেছে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ধারাও। ১৮ থেকে ২০ বছর ধরে মার্কিন ও জাতিসংঘ প্রশাসনের সহায়তাপুষ্ট সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তালেবানের মূলধারার সঙ্গে আরও অনেক উপধারা এসে মিশেছে। এর মধ্যে আছে হাক্কানি নেটওয়ার্ক, আছে গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের হিজবে ইসলামি, আছে মনসুর নেটওয়ার্ক। এ ছাড়া রয়েছে কারজাই বা গনি প্রশাসনের সুবিধাদির উচ্ছিষ্ট না পাওয়া স্থানীয় ছোটখাটো যুদ্ধপতির দল। তারা সব মিলেমিশেই চেয়েছে মার্কিন-সমর্থিত প্রশাসনের পতন। (অনেকে আবার এর মধ্যে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের গন্ধও পাচ্ছেন)।

ফলে, ২০২১ সালের তালেবান আসলে একক তালেবান নয়—এটি একধরনের ‘জোট সরকার’। আর এই বহুদলীয় (নাকি বহুগোত্রীয়) জোট প্রশাসন পরিচালনার অতীত কোনো অভিজ্ঞতা তালেবান নেতৃত্বের নেই। নেই মোল্লা ওমরের মতো ক্যারিশমাটিক একক নেতৃত্ব। তাই শুরুতেই তারা হোঁচট খেতে শুরু করেছে।

আসলে ‘একদলীয় সরকার’ আর ‘বহুদলীয় জোট সরকারের’ মধ্যে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক রসায়ন। তালেবানের বর্তমান নেতৃত্ব এই রসায়ন সম্বন্ধে সম্যক ওয়াকিবহাল বলে মনে হয় না। তাই গোড়াতেই তাঁরা পড়ে গেছেন ফাঁদে। সঙ্গে আন্তর্জাতিক আম্পায়ারদের চাল তো আছেই।

আরও একটা বিষয় এ ক্ষেত্রে স্মর্তব্য; আশির দশকে সোভিয়েতবিরোধী জিহাদে যেসব দল বা গ্রুপ অংশ নেয়, তাদের প্রায় সব কটিরই প্রধান ছিল স্থানীয় জোতদার বা সম্ভ্রান্ত গোত্রের লোকেরা। আবদুর রশিদ দোস্তাম, গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার, জালালউদ্দিন হাক্কানি, আহমদ শাহ মাসউদ—তাঁরা সবাই ছিলেন স্থানীয় প্রভাবশালী মানুষ। অন্যদিকে, তালেবান নেতৃত্ব উঠে এসেছে একেবারেই মাটির কাছ থেকে—নিম্নবিত্ত শ্রেণি থেকে। মোল্লা ওমর, মোল্লা আখতার মনসুর, মোল্লা বারাদার—তাঁরা সবাই তৃণমূল থেকে উঠে এসেছেন। তালেবান ‘জোট সরকারে’ এই শ্রেণির বিষয়ও নেতৃত্বের কোন্দলের একটি কারণ হলে হতেও পারে।

সবশেষে পরিস্থিতি বিবেচনায় এ কথা বলা যেতেই পারে, গত শতাব্দীর কান্দাহারি আদি তালেবান একবিংশ শতাব্দীতে এসে ক্রমেই তার আদি প্রভাব হারিয়ে ফেলছে। তার স্থলে জায়গা করে নিচ্ছে হাক্কানি নেটওয়ার্ক। এখন দেখার বিষয়, তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমরের ছেলে মোল্লা ইয়াকুব কতটুকু তাল মিলাতে পারেন পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে।

মোশতাক আহমেদ জাতিসংঘ সাবেক কর্মকর্তা, জাতিসংঘ

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন