বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর বার্লিন প্রাচীর পতনের দিন থেকেই পুতিন ও ম্যার্কেলের জটিল সম্পর্কের শুরু হয়েছিল। ঘটনাটি পূর্ব জার্মানি নামের পুলিশি রাষ্ট্র থেকে ম্যার্কেলের সার্বিক মুক্তি পাওয়ার স্মারক হয়ে আছে। কারণ, পশ্চিম জার্মানিতে জন্ম নেওয়া ম্যার্কেল বাবার সঙ্গে পূর্ব জার্মানিতে এসে ৩৫ বছর আটকা পড়েছিলেন। বার্লিন প্রাচীর ভেঙে যাওয়ার পরপরই ম্যার্কেল তাঁর বিজ্ঞানীর (কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রিতে ডক্টরেট ডিগ্রি নেওয়া ম্যার্কেল ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত গবেষণা বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেছিলেন) সাদা অ্যাপ্রোন খুলে ফেলে খ্রিষ্টান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নে যোগ দেন। পরে দলটির নেতা হন এবং একপর্যায়ে জার্মানির প্রথম নারী চ্যান্সেলর হন।

১৯৮৯ সালের নভেম্বরের ওই ঘটনা এবং পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত সাম্রাজ্যের পতন (পুতিন যাকে ‘বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেছিলেন) পূর্ব জার্মানিতে একজন কেজিবি কর্মকর্তা হিসেবে পুতিনের কর্মজীবনের সমাপ্তি ঘটায়। ম্যার্কেল ও পুতিনের মধ্যে বয়সের ব্যবধান দুই বছরের। তাঁরা দুজনেই একই সোভিয়েত আমলের ‘প্রোডাক্ট’। তাঁদের মধ্যে অনেক আগে থেকেই একটি স্পষ্ট বোঝাপড়া রয়েছে। তাঁরা আক্ষরিক ও রূপকভাবে একে অপরের ভাষায় কথা বলে থাকেন।

ম্যার্কেল চ্যান্সেলর হওয়ার পর তাঁর মেধা পরীক্ষা করার জন্য পুতিন তাঁর ওপর বিভিন্ন কেজিবি কৌশল প্রয়োগ করেছিলেন। ম্যার্কেল কুকুর ভয় পান। কেজিবির ফাইলের এ তথ্য জেনে ২০০৭ সালের একটি বৈঠকে পুতিন ম্যার্কেলের পাশে তাঁর (পুতিনের) একটি দানবাকৃতির ল্যাব্রাডর জাতের কুকুর ছেড়ে দেন। ম্যার্কেল অবশ্য তাতে মোটেও দমে যাননি। ম্যার্কেল পরে বলেছিলেন, ‘নিজের পৌরুষ প্রদর্শনের জন্য তাঁকে (পুতিনকে) এসব করতে হয়।’ ম্যার্কেল বলেছিলেন, ‘তিনি (পুতিন) সারা দিন আপনাকে পরীক্ষা করতে থাকবেন এবং আপনি যদি তাঁর সঙ্গে টক্কর না দেন, তাহলে আপনাকে ছোট থেকে আরও ছোট করে ফেলবেন।’

ম্যার্কেলের রাজনৈতিক অতীত ও পটভূমি তাঁকে পুতিনের নিষ্ঠুরতা এবং ছলচাতুরীর সঙ্গে আগে থেকেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল বলে পুতিন কখনোই তাঁকে ছোট করতে পারেননি। তাঁদের বহুবার আলাপ হয়েছে এবং যখনই পুতিন কোনো বিস্ফোরক কথা বলেছেন কিংবা ভয়ংকর নীরবতা প্রদর্শন করেছেন, তখনই ম্যার্কেল তাঁর স্বভাবজাত ব্যক্তিত্ব দিয়ে তা সম্ভ্রমে উপেক্ষা করে গেছেন। ২০১৪ সালেই ম্যার্কেল পুতিনের মধ্যে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার প্রবণতা দেখতে পেয়েছিলেন। তারপরও তিনি ইউক্রেন ইস্যুতে ‘এক ইঞ্চি পরিমাণ’ হলেও অভিন্ন মত খুঁজে বের করতে টানা ১৫ ঘণ্টা পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করে যাচ্ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ম্যার্কেল বলেছিলেন, ‘আমি ওই সময় দড়ির ওপর হাঁটা মানুষের মতো মনোযোগী হয়ে শুধু পরবর্তী পদক্ষেপের কথা ভাবছিলাম।’

ম্যার্কেল সম্ভবত এই গ্রহের একমাত্র ব্যক্তি, যিনি পুতিনকে না ভয় পান, না প্রকাশ্যে অবজ্ঞা করেন এবং একই সঙ্গে পুতিনকে যিনি সম্মান করেন বলেও মনে হয়। তাঁদের দীর্ঘ পারস্পরিক বোঝাপড়ার ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে ম্যার্কেলকেই পুতিনের সঙ্গে আলোচনায় বসানো দরকার।

রাশিয়া ক্রিমিয়াকে দখল করে নিজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার এবং ইউক্রেনের পূর্ব দনবাস অঞ্চলের কিছু অংশ দখল করার পর পুতিন ম্যার্কেলের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসেছিলেন। ম্যার্কেলের দীর্ঘ চাপাচাপিতে অবশেষে পুতিন তাঁর আগ্রাসন থামাতে সম্মত হয়েছিলেন। ম্যার্কেল মনে করেন, রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের চেয়ে শীতল ও জমাটবাঁধা সংঘাত সব সময়ই ভালো। পুতিনের সঙ্গে ম্যার্কেল একটু আলাদা পদ্ধতিতে আলোচনা করতেন। তাঁদের বহু ঘণ্টা আলোচনার সময় ম্যার্কেলের পদ্ধতি ছিল তিনি পুতিনকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বলতে দিতেন। পুতিন তাঁর কথা শেষ করার পর ম্যার্কেল প্রায় শিশুসুলভ ভাষায় পুতিনের কথার পুনরাবৃত্তি করতেন। এতে পুতিনের ক্ষোভ প্রশমিত হতো। তারপর তিনি নমনীয় গলায় বলতেন, ‘ভ্লাদিমির, বিশ্ব তো তোমার মতো করে দেখে না।’

ম্যার্কেলের বরফশীতল ব্যক্তিত্বের নেপথ্যে তাঁর যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা কাজ করেছে। একবার যুদ্ধ এলাকা সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি, দনবাসের প্রতিটি গাছকেও চিনি।’ ২০১৪ সালের সমালোচনায় তিনি পুতিনকে তাঁর লক্ষ্য সুনির্দিষ্টভাবে বলার জন্য চাপ দেন এবং তারপর তাঁকে সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব দেন। তাঁর বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণলব্ধ অভিজ্ঞতা এবং অহং, ব্যক্তি-মতাদর্শ ও আবেগমুক্ত মানসিকতার জোরে তিনি তাঁর বিশাল সব পরিকল্পনাকে সবচেয়ে পরিচালনাযোগ্য ক্ষুদ্র অংশে ভেঙে ফেলেছিলেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘সমাধান খুঁজে বের করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

পুতিনের কাছে ম্যার্কেল যতখানি আস্থাযোগ্য, অন্যরা ততখানি নন। এর কারণ প্রথমত, ম্যার্কেলের কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাই অবশিষ্ট নেই। এ ছাড়া এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ম্যার্কেল কখনোই পুতিনকে অপমানসূচক কোনো কথা বলেননি এবং তাঁদের অনেক ব্যক্তিগত বাগ্‌বিনিময়ের বিষয়বস্তু কখনো প্রকাশ করেননি। রাশিয়ান সংস্কৃতির প্রশংসাকারী হিসেবে পরিচিত ম্যার্কেল রাশিয়াকে কখনোই ‘আঞ্চলিক শক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেননি, যেমনটি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা একবার করেছিলেন।

ম্যার্কেল ২০১৪ সালে যে যুদ্ধ ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি চ্যান্সেলরের পদ ছাড়ার দুই মাস পর পুতিন সর্বাত্মকভাবে সেই যুদ্ধ শুরু করেছেন। ম্যার্কেল চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর উত্তরসূরি ও অপরীক্ষিত ওলাফ শলৎজকে পুতিন প্রতিপক্ষের জায়গায় দাঁড় করিয়েছেন। পুতিন হয়তো ভেবেছিলেন, তিনি শেষ পর্যন্ত ১৯৮৯ সালে শুরু হওয়া ‘বিপর্যয়’ উল্টে দিতে পারবেন। কিন্তু ম্যার্কেলও ভুল হিসাব করেছিলেন। একজন সতর্ক রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি জার্মান ব্যবসায়িক স্বার্থকে নিয়ন্ত্রণে রাখার অনুমতি দিয়েছিলেন এবং বাল্টিক সাগর হয়ে রাশিয়া থেকে সরাসরি জার্মানিতে গ্যাস পরিবহনে সক্ষম নর্ড স্ট্রিম ২ পাইপলাইন (এখন স্থগিত) থামাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় তিনি জার্মানির প্রতিরক্ষা বাজেট যথেষ্ট পরিমাণে বাড়াননি। ম্যার্কেল যুদ্ধকে ঘৃণা করেন এবং যুদ্ধ এড়াতে সমর্থ না হওয়াকে তিনি একজন রাষ্ট্রনায়কের সম্পূর্ণ ব্যর্থতা বলে মনে করেন। তবু ইউক্রেনে এখন যুদ্ধ চলছে। ইউরোপ ও পশ্চিম ম্যার্কেল-পরবর্তী এমন একটি যুগে ডুবে আছে, যার কোনো স্পষ্ট শেষ দেখা যাচ্ছে না।

ম্যার্কেল সম্ভবত এই গ্রহের একমাত্র ব্যক্তি, যিনি পুতিনকে না ভয় পান, না প্রকাশ্যে অবজ্ঞা করেন এবং একই সঙ্গে পুতিনকে যিনি সম্মান করেন বলেও মনে হয়। তাঁদের দীর্ঘ পারস্পরিক বোঝাপড়ার ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে ম্যার্কেলকেই পুতিনের সঙ্গে আলোচনায় বসানো দরকার। ক্রেমলিনে দীর্ঘ টেবিলের এক প্রান্তে পুতিন বসে আছেন, অন্য প্রান্তে অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধান বসে আছেন—এভাবে এমন গুরুতর আলোচনা হয় না। এর জন্য আন্তরিক আলোচনা দরকার। তার জন্য ম্যার্কেলকেই দরকার।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ক্যাটি মার্টন অ্যাকশন ফর ডেমোক্রেসির প্রতিষ্ঠাতা উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং দ্য চ্যান্সেলর: দ্য রিমার্কেবল ওডিসি অব আঙ্গেলা ম্যার্কেল (উইলিয়াম কলিন্স, ২০২১) বইয়ের লেখক।

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন