বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মুহিত ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তিনি রাজি হলেন। আমি ও সহকর্মী ফখরুল ইসলাম হেয়ার রোডে তাঁর তখনকার সরকারি বাসায় গিয়ে হাজির হই। মুহিত ভাই আগেই তাঁর সহকারীকে বলে রেখেছিলেন। সেদিন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের বাইরেও অনেক বিষয়ে আলাপ হয়। পরদিন অর্থমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার ছাপা হওয়ার পর সরকারি মহলে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। তিনি কোনো রাখঢাক না করেই বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জড়িত। তাঁদের যোগসাজশ ছাড়া এ কাণ্ড ঘটতে পারে না।’ রিজার্ভ চুরির জন্য অর্থমন্ত্রী সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ও কর্মকর্তাদের অভিযুক্ত করেছেন, দুদক ও এনবিআরের পদাধিকারীদের ব্যর্থতা ও দায়িত্বহীনতা তুলে ধরেছেন। এসব সরকারের অনেকেই সহজভাবে নিতে পারেননি। নানা গুঞ্জন শোনা যায়। পরিস্থিতি অর্থমন্ত্রীর এতটাই প্রতিকূল ছিল যে তিনি সাক্ষাৎকার সম্পর্কে একটি কৈফিয়তমূলক বিবৃতি দেন। যদিও তাতে সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত কোনো বক্তব্য অস্বীকার করেননি তিনি।

এরপরও মুহিত ভাইয়ের সঙ্গে দু-একটি অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছে। তিনি হাসি মুখে কুশল জানতে চেয়েছেন। কখনো সাক্ষাৎকারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেননি। আমিও তাঁর শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নিতাম। কয়েকবার তাঁর বাসায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেও শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়নি। এরই মধ্যে শুক্রবার মধ্যরাতে তাঁর মৃত্যুর খবর এল।

গুলশানের কামাল আতাতুর্ক সড়কে তাঁর লাল ইটের দোতলা বাসায় (এখন বহুতল ভবন) কতবার গিয়েছি তার হিসাব নেই। একাধিকবার তাঁর জন্মদিনের ঘরোয়া অনুষ্ঠানেও যোগ দিয়েছি। মুহিত ভাই ইংরেজি সাহিত্যের সেরা ছাত্র ছিলেন।

পরবর্তীকালে অর্থনীতি পড়েছেন। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি দিন অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু এসবের বাইরে সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ টের পেতাম বাসায় গেলে। তাঁর টেবিলে অর্থনীতি-গবেষণার চেয়ে সাহিত্যের বই–ই বেশি থাকত। তাঁর দেওয়া সিলেক্টেড পোয়েমস অব অক্তাভিও পাজ বইটি এখনো আমার বুকশেলফে তাঁর স্নেহ ও স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়।

মুহিত ভাইকে নিয়ে অনেক স্মৃতি, অনেক ঘটনা। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি আমি সংবাদ-এ সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করি। সংবাদ-এর সম্পাদক বজলুর রহমানই মুহিত ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তাঁর সঙ্গে মুহিত ভাইয়ের বাসায় যেতাম। রাজনীতি, অর্থনীতি, পরিবেশ ইত্যাদি নিয়ে কথা হতো। লেখক হিসেবে মুহিত ভাই ছিলেন স্বতঃস্ফূর্ত। যে বিষয়ে তিনি মনে করেন, কিছু বলা প্রয়োজন লিখতেন। কখনো আমরা তাঁর সাক্ষাৎকার নিতাম। আমি প্রথম আলোয় আসার পরও মুহিত ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগটা অক্ষুণ্ন ছিল। ২০১০ সালের ২৫ জানুয়ারি তঁার জন্মদিনে প্রথম আলোয় লিখেছিলাম ‘দর্শকসারির মানুষ’। মন্ত্রী হওয়ার আগে ঢাকার যেকোনো অনুষ্ঠান আয়োজনে তাঁকে পেতাম বক্তা হিসেবে নয়, দর্শক হিসেবে। একুশের বইমেলায় নিয়মিত যেতেন। বই কিনতেন।

যেকোনো নতুন উদ্যোগের প্রতি মুহিত ভাইয়ের উৎসাহ ছিল অপরিসীম। এই উৎসাহ থেকেই তাঁর গণফোরামে যোগদান। এই উৎসাহ থেকেই পরিবেশ আন্দোলনে নিজেকে যুক্ত করা। দেশ ও সমাজ সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব ভাবনা ছিল। অর্থমন্ত্রী হয়ে তিনি সেই ভাবনা পুরোপুরি বাস্তবে রূপ নিতে পেরেছেন মনে হয় না। মুহিত ভাই প্রবলভাবে চাইতেন প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ হোক। স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হোক। এই উদ্দেশ্যে একবার বাজেটে জেলা বাজেটও যুক্ত করেছিলেন। তিনি নতুন কিছু করতে চাইতেন, কিন্তু আমাদের রাজনীতি ও প্রশাসন গতানুগতিকতার বাইরে যেতে পারেনি।

আবুল মাল আবদুল মুহিত তিন মেয়াদে ১২ বছর বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। প্রথম দুই বছর সামরিক শাসক এরশাদের আমলে এবং শেষ ১০ বছর শেখ হাসিনার আমলে। এরশাদের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়া নিয়েও তাঁর একটি ব্যাখ্যা ছিল। দুই বছরের মধ্যে এরশাদ নির্বাচন দেবেন, এই শর্তে তিনি মন্ত্রী হন। এরশাদ ওয়াদা রাখেননি বলে মুহিত ভাইও পদত্যাগ করেন। আশির দশকের শেষ দিকে এরশাদের বিরুদ্ধে যে গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠে, তার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে জনমত তৈরি করতেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি।

আবুল মাল আবদুল মুহিত ছাত্রজীবনে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিয়েছেন, জেল খেটেছেন। তারও আগে এমসি (মুরারি চাঁদ) কলেজের নাম পরিবর্তনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, সেই আন্দোলনেও নিজেকে যুক্ত করেন। পাকিস্তান আমলে অধিকাংশ মেধাবী শিক্ষার্থী সিএসপি কর্মকর্তা হতেন, আবুল মাল আবদুল মুহিতও হয়েছেন। তবে তিনি পাকিস্তানি প্রশাসনে থেকেও বাঙালির স্বার্থ রক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন। ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন, যা সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে ছিল সাহসী কাজ। ১৯৭১ সালে ওয়াশিংটনে পাকিস্তান দূতাবাসে যেসব বাঙালি কূটনীতিক ছিলেন, তাঁদের মধ্যে মুহিতই প্রথম পক্ষ ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। পাকিস্তানি দূতাবাসে থাকতেই আগেই তিনি গোপনে মার্কিন কংগ্রেস সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সহায়তা চান।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ১৯৮১ সালে সচিব পদ থেকে অকাল অবসর নেন মুহিত। এর পেছনে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে তাঁর মতভেদের কথা জানা যায়। অর্থমন্ত্রী হিসেবে আবুল মাল আবুল মুহিতের অনেক সমালোচনা আছে। তিনি দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারেননি। তাঁর সময়ে ব্যাংকিং খাত নড়বড়ে হয়েছে। শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে। এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের মন্ত্রসভায় এমন একজন অর্থমন্ত্রী ছিলেন, যাঁকে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ কিংবা এডিবির কর্মকর্তারা সমীহ করতেন। নামে চিনতেন। তিনি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেছিলেন বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নেই যাতে পদ্মা সেতু হয়। নিজস্ব অর্থায়নের ‘ক্ষতিটা’ বুঝতে পেরেছিলেন বাস্তববাদী মানুষটি।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার আগে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারে নির্বাচিত প্রতিনিধি তথা মন্ত্রী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করার ওয়াদা করেছিল। কিন্তু নির্বাচনে জয়লাভের পর সরকারের নীতিনির্ধারকেদের কথার সুর বদলে যায়। তাঁরা বলতে থাকেন, নির্বাচনের সময়ই তো সম্পদের হিসাব দেওয়া হয়েছে। আবার কেউ বলেন, মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে হিসাব আছে, যে কেউ দেখে নিতে পারেন। কিন্তু অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ছিলেন ব্যতিক্রম। মন্ত্রী হওয়ার পর প্রতিবছর তিনি নিজের ওয়েবসাইটে বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করতেন। কত টাকা আয় হয়েছে, কত টাকা কর দিয়েছেন। তিনি মনে করতেন, জনগণের কাছে দেওয়া ওয়াদা রক্ষা করা উচিত।

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন