default-image

কোভিড-১৯ মহামারির সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে তা বলার সময় হয়তো এখনো আসেনি। কারণ, আগামী দিনগুলোতে মহামারি আরও অনেক দিকে মোড় নিতে পারে। আমরা যখন করোনাভাইরাসকে সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত করব, তখন দেখা যাবে এই ভাইরাসের কারণে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ঘটে যাওয়া অনেক পরিবর্তন ছিল সাময়িক। কিন্তু কিছু পরিবর্তন হবে দীর্ঘমেয়াদি। তবে কিছু সম্ভাব্য পরিবর্তনকে মাথায় রেখে আমরা আগাম ভিত্তিতে কিছু প্রস্তুতি নিতে পারি।

মহামারি শেষ হওয়ার পর আমরা অনেক অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষা অর্জন করতে পারব। মহামারি-উত্তরকালে যেসব বিষয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসতে পারে, তার ব্যাপারে কিছুটা আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সে ধরনের কয়েকটি পয়েন্ট উল্লেখ করতে চাই।

বিজ্ঞাপন

এক. যখন দ্রুত সংক্রমণশীল কোনো প্রাণঘাতী ভাইরাসের উদ্ভব ঘটে, তখন আমরা স্বাভাবিকভাবেই সেই ভাইরাস সম্পর্কে আরও বিশদভাবে জানার জন্য অপেক্ষা না করে সেটিকে যত দ্রুত সম্ভব পরাস্ত করার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে থাকি। এক বছরের বেশি সময় আগে চীনে প্রথম করোনাভাইরাস ছড়ানোর পর বহু দেশ (বিশেষ করে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশসমূহ) পশ্চিমাদের তুলনায় অনেক বেশি সতর্কতার সঙ্গে এটিকে প্রতিহত করতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করেছে। এ কারণে এখনো পশ্চিমা দেশগুলো তার মাশুল দিচ্ছে। যেমন যুক্তরাজ্যে এখনো করোনাজনিত মৃত্যুহার অনেক বেশি রয়েছে এবং প্রতিদিন সেখানে দেড় হাজারের বেশি লোক সংক্রমিত হচ্ছে। এটি পশ্চিমা দেশগুলোসহ সবার জন্য বড় ধরনের শিক্ষা রেখে যাচ্ছে।

দুই. অনেক দেশ অন্য দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি গতিতে তাদের জনগণকে ভ্যাকসিন দিচ্ছে। বর্তমানে ভ্যাকসিন নেওয়ার যে গতি দেখা যাচ্ছে, তাতে আন্দাজ করা যায় অতি শিগগিরই সংক্রমণের মাত্রা নাটকীয়ভাবে কমে যাবে। তবে এখনই যদি সরকারগুলো সবখানে লকডাউন খুলে দেয়, তাহলে এ ভাইরাস এমনভাবে তার চরিত্র ও গঠন পরিবর্তিত করে ফেলতে পারে, যা বিদ্যমান ভ্যাকসিনের কার্যকারিতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

তিন. কোভিড-১৯–এর অনুমোদিত প্রথম ভ্যাকসিন তৈরিতে যে গবেষণা অনুসরণ করা হয়েছে, সেই গবেষণা আগে থেকেই অন্য উদ্দেশে পরিচালিত হচ্ছিল। এ কারণে আন্দাজ করা যায়, করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন উৎপাদন অন্য সব ধরনের ভাইরাসের ভ্যাকসিন ডেভেলপমেন্ট প্রক্রিয়াকেও (গবেষণা থেকে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া পর্যন্ত) হয়তো উন্নত জায়গায় নেবে। এটি হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের মহামারি মোকাবিলায় এ গবেষণা অনেক সাহায্য করবে। এ মহামারির কারণে ওষুধ প্রস্তুতকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক সক্ষমতা ও উৎপাদনক্ষমতা বাড়বে বলেও ধারণা করা যায়।

চার. মহামারির অভিজ্ঞতার কারণে ভবিষ্যতে সরকারগুলো জনস্বাস্থ্য খাতে আগের চেয়ে বেশি বরাদ্দ দিতে অকুণ্ঠ হবে বলে আশা করা যায়। সরকারগুলো বরাবরই আর্থিক অসংগতির বিষয়টি সামনে এনে স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিতে অভ্যস্ত ছিল। এ মহামারির পর সরকারগুলো এ বিষয়ে উদার হয়েছে। এটি ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বরাদ্দে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা যেতে পারে। সরকারগুলো ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে সব নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি আগ্রহী হবে।

বিজ্ঞাপন

পাঁচ. মহামারি শেষ হওয়ার পর দূরে বসে প্রযুক্তির সহায়তায় অফিসের কাজ করার প্রবণতা বাড়তে পারে। এতে কর্মীর কর্মপরিবেশ আগের চেয়ে সহজ হবে। ঘরে বসে অফিসের কাজ সারার বিষয়টি বৃহৎ পরিসরে স্বীকৃত হলে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। এতে কর্মীর আসা-যাওয়ার ঝক্কি পোহাতে হবে না, তঁাদের সময় বাঁচবে এবং পরিবহন খাতে চাপ কমবে। এতে শ্রমবাজারের ‘তারল্য’ বাড়বে এবং সম্ভবত এতে উৎপাদনও বাড়বে।

ছয়. সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখায় অভ্যস্ত হওয়ার কারণে অনলাইনভিত্তিক লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের যে বৈপ্লবিক প্রসার ঘটেছে, তার একটি সুফল পাওয়া যাবে। এর ফলে সরকারের নীতিনির্ধারকেরা রাজস্ব আহরণ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে পারবেন এবং অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্য খাত সরকারের রাজস্ব আহরণের অন্যতম উৎস হয়ে উঠতে পারে। এতে অনলাইনভিত্তিক ব্যবসায় নামা খুচরা বিক্রেতারাও পেশাদারি আচরণে অভ্যস্ত হবে।

এ ধরনের অসংখ্য সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। এগুলোকে মাথায় রেখেই সরকারগুলোকে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ঠিক করতে হবে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

জিম ও’নিল: যুক্তরাজ্য সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন