বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ঢাকা থেকে বরগুনাগামী লঞ্চে আটশ থেকে এক হাজার লোক ছিল। শীতের রাতে লঞ্চের বেশির ভাগ যাত্রী তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। কত মানুষ মরছে, সে হিসাব কি আদৌ জানা যাবে? কেবিনে কেবিনে হাড়গোড় আর খুলি পড়ে আছে, একটা শরীর কতটুকু জ্বললে তার হাড়গোড় সাদা হয়ে যায় জানি না। ঝালকাঠির মিনিপার্কে গাছের নিচে সারি সারি করে রাখা লাশের সাদা ব্যাগ। সেসবের ভেতরে আদৌ কি কোনো লাশ আছে! এক ভিডিওতে উদ্ধারকর্মীদের দেখলাম স্রেফ কয়লার স্তূপ ঢোকাতে ব্যাগের ভেতরে। সংবাদমাধ্যমে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব দৃশ্যই আপনার–আমার পরিচিত হয়ে গেছে এতক্ষণে।

স্বজনের আহাজারি ও লাশ নিয়ে ঘরে ফেরার দৃশ্য, তদন্ত কমিটি গঠন ও কিছু টাকা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা, জাহাজের কী ত্রুটি ছিল, জাহাজের নকশা নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধান—এসব নিয়েই কিছুদিন খবর, প্রতিবেদন, টক শো, কলাম চলবে। অন্যদিকে, কিছু লাশ বেওয়ারিশ দাফন হয়ে যাবে, কিছু লাশ পড়ে থাকবে ডিএনএ টেস্টের জন্য পড়ে থাকবে মর্গে, কোনো লাশ খুঁজেও পাওয়া যাবে না কখনো, কেউ নদীতে ঝাঁপ দিয়ে ঠান্ডায় মারা গিয়ে নদীতেই ভেসে গেছে। ট্রলার নিয়ে ছুটে যাওয়া পাড়ের মানুষেরাই বলছেন, অনেক শিশু লাফ দিয়ে পানিতে পড়তে না পড়তেই হারিয়ে গেছে। আগে স্ত্রী–সন্তান নাকি মা বা বাবাকে বাঁচাবেন এই দ্বন্দ্বে পড়ে কাউকে বাঁচাতে পারেন, কাউকে পারেন না ব্যক্তির যন্ত্রণা কি আমরা কখনো দেখব?

স্বাধীনতার ৫০ বছর হয়ে গেল একটা দেশের। শত শত কোটি টাকার উৎসবও হয় একের পর এক। অথচ এই দেশে সড়ক, রেল, নৌ—কোনো পথেই নিরাপদ যোগাযোগ বা পরিবহনব্যবস্থা গড়ে উঠল না। হয় রাস্তায় পিষে মরো, নয় পানিতে মরো, নয় পুড়ে মরো। দিন দিন দেশটা মৃত্যুর এমন কারাগার হয়ে উঠছে। পালিয়ে গিয়েও কি মেলে মুক্তি? অনেকে তো আবার ভূমধ্যসাগরেই ডুবে মরছে, নয়তো বিদেশের জেলখানা বা যৌনপল্লিতে পচে মরছে।

যান্ত্রিক ত্রুটি নিয়েই ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছিল এমভি অভিযাত্রী–১০। যাত্রীরাই বলছেন, শুরু থেকেই ছিল বেপরোয়া গতি। ত্রুটি থাকায় টেকনিশিয়ানরা ইঞ্জিন মেরামতের কাজ করছিলেন। এ জন্য পুরো গতিতে দুটি ইঞ্জিন চালিয়ে ট্রায়াল দেওয়া হচ্ছিল। আর এতেই মূলত ইঞ্জিনের অতিরিক্ত তাপে আগুন ধরে যায়। আগুন লেগে যাওয়ার পর নেভানোর কোনো চেষ্টা না করে লঞ্চটির শ্রমিক-কর্মচারী ও মালিক লঞ্চ থেকে সটকে পড়েন। অথচ যাত্রী ছাড়াই সেই ট্রায়াল হওয়ার কথা ছিল যাত্রার আগে। আগুন লাগার পর লঞ্চটিকে তীরে ভেড়াতেও ৪৫ মিনিটের বেশি সময় লাগে। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গেই লঞ্চটিকে তীরে ভেড়ানো সম্ভব হলে প্রাণহানি এড়ানো যেত। একটা অব্যবস্থাপনা যে আরও কত অব্যবস্থাপনাকে উলঙ্গ করে দেয়! বরিশাল বিভাগে এত বড় হাসপাতাল এত বড় মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিট বন্ধ হয়ে আছে দুই বছর ধরে। দগ্ধ মানুষকে চিকিৎসার জন্য বরগুনা থেকে এত দূর ঢাকায় বার্ন ইনস্টিটিউটে আনতে হচ্ছে। সেখানেও মৃত্যু হয়েছে কারও। ঢাকা আনতে আনতে পথেই শেষ হয়ে যায় এক শিশুর বাকিটুকু প্রাণ।

২.
এটা কি স্রেফ দুর্ঘটনা? এটা যে কাঠামোগত হত্যা, সেটি কি নিশ্চয়ই কাউকে বলে দিতে হবে না। কিন্তু লঞ্চ পরিদর্শনে এসে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলছেন, এর পেছনে কোনো রহস্য থাকতে পারে। কারণ, এ ধরনের ঘটনা আগে ঘটেনি। কিন্তু সেটিই কি হওয়ার কথা ছিল না! ‘সব অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার’ এই ব্যবস্থাপনা কি তিলে তিলে তাঁরাই তৈরি করেননি? লঞ্চের মালিক বলছেন, গত অক্টোবর মাসে ইঞ্জিন বদলানো হয়েছিল। তবে সে জন্য নৌপরিবহন অধিদপ্তর থেকে অনুমতি নেওয়া হয়নি। এই অনুমতির না নেওয়ার সংস্কৃতি কেন গড়ে উঠল, কারা তৈরি করল? আমরাও এও জানতে পারছি, বেশির ভাগ লঞ্চে রিকন্ডিশন্ড বা পুরোনো ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়, যেগুলো মূলত সমুদ্রগামী জাহাজের জেনারেটর ইঞ্জিন।

ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী ছিল লঞ্চটিতে। এ কারণে লাইফ জ্যাকেটও সবার পাওয়ার কথা নয়। এটা তো ঈদের মৌসুম না যে অতিরিক্ত যাত্রী নিতে হবে। কিন্তু মুনাফার লোভে অন্ধ লঞ্চমালিকেরা প্রতিদিন সেটিই করে আসছেন। ঢাকা-বরগুনা পথে ছয়টি লঞ্চের রুট পারমিট থাকলেও মালিকেরা রোটেশন পদ্ধতিতে লঞ্চ পরিচালনা করেন। এ পদ্ধতির কারণে যাত্রীর চাপ থাকলেও প্রতিদিন উভয় প্রান্ত থেকে মাত্র দুটি লঞ্চ চালানো হয়।

লঞ্চে অগ্নিনির্বাপণযন্ত্র, বালুর বাক্স, ফায়ার বাকেট ও পানির পাম্প ছিল। আবার লঞ্চমালিকই বলছেন, লঞ্চকর্মীদের অগ্নিনির্বাপণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ ছিল কি না, তিনি জানেন না। মূলত, প্রশিক্ষণের বিষয়টি তো থাকে কাগজে–কলমে বা হলেও দশ-বারো বছরে একবার। অগ্নিনির্বাপণযন্ত্রগুলো ঠিক ছিল কি? আগেও একাধিক ঘটনায় দেখা গেছে, সেগুলো প্রায়ই মেয়াদোত্তীর্ণ থাকে। অথচ প্রশিক্ষণ, নিয়মিত তদারকির দায়িত্বে থাকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগ, যাদের সবার ওপরে আছে নৌ মন্ত্রণালয়, সংসদীয় কমিটি তো আছেই।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রভাষক মো. ইমরান উদ্দিন প্রথম আলোকে বলছেন, অনেকবার সুপারিশে অগ্নিনির্বাপণের বিষয়টি নিয়ে কথা বলা হলেও কখনো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সুপারিশগুলোও কখনো বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যান্য দেশে তিন বা ছয় মাস পর প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক থাকে। তা না হলে লঞ্চের নিবন্ধন নবায়ন হবে না। আসলে পুরো ব্যবস্থাই তো ত্রুটিপূর্ণ। ব্যবস্থায় ত্রুটি থাকলে সেটা একেক সময় একেকভাবে প্রকাশ পাবে। একসময় লঞ্চ ডুবছে, কখনো দূষণ ছড়াচ্ছে, কখনো অগ্নিকাণ্ড ঘটছে। এগুলো আসলে লক্ষণ। শুধু মাস্টার আর ড্রাইভারদের ধরে জরিমানা করে বা শাস্তি দিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পড়ে থাকে পাশে। নৌযানের ফিটনেস ঠিক নেই। চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। আট থেকে দশজন সার্ভেয়ার দিয়ে কি সাত-আট হাজার নৌযান দেখভাল করা সম্ভব? কেউ মূল জায়গায় হাত দিচ্ছি না। ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি থাকলে এমন দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

এই ব্যবস্থাপনা কি ইচ্ছা করেই তৈরি করা হয়নি। কারা এই ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত, কারা লঞ্চের মালিক, কেন তাঁদের কিছু করা যায় না, এত মৃত্যুর পরও নিশ্চিন্তে ঘুমাতে অসুবিধা হয় না তাঁদের। সেসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজতেই কি মন্ত্রী মহোদয় আমাদের ভেতরে ‘রহস্য’ ঢুকিয়ে দেন আর লঞ্চমালিক ডেকে আনেন ‘ষড়যন্ত্র’কে। পোশাক কারখানার শ্রমিকদের আগুনে পুড়তে দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায় আমাদের সামনে এ যেন নতুন ‘চমক’ হাজির করলেন তাঁরা।

৩.
সাদা কুয়াশা আর নিকষ অন্ধকার নদী চিরে জ্বলছে বিশাল লঞ্চ। কোনো সিনেমার দৃশ্যই মনে হবে। আদতে বাস্তবিক জীবনের অস্তিত্ব আমরা হারিয়ে ফেলেছি। আর একের পর এক সিনেমার স্ক্রিনে নিজেদেরই দেখে চলেছি আমরা। কোনো দৃশ্যে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছে অ্যাম্বুলেন্স, একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার বা আইসিইউ সিট পেতে আরেকজনের মৃত্যু কামনা। কোনো দৃশ্যে ময়লার ট্রাক আমাদের পিষে নিয়ে যাচ্ছে। কোনো দৃশ্যে বাসের দরজা–জানলা বন্ধ করে ভেতরে সাউন্ডবক্সে উচ্চ স্বরে গান বাজিয়ে বা সমুদ্রসৈকত থেকে তুলে নিয়ে চলছে ধর্ষণ। কোনে দৃশ্যে নিজের মোটরবাইকে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে তরুণ। কোনো দৃশ্যে ক্ষুধার জ্বালায় স্ত্রী–সন্তানকে মেরে নিজে আত্মহত্যা করছে কেউ। কোনো দৃশ্যে ঘরের সামনে মাইক্রোবাস এসে তুলে নিয়ে যাচ্ছে কাউকে। কোনো দৃশ্যে শুধু গুলির আওয়াজ আর ব্যাকগ্রাউন্ডে কান্না: আব্বু, তুমি কান্না করতেছ যে!

স্বাধীনতার ৫০ বছর হয়ে গেল একটা দেশের। শত শত কোটি টাকার উৎসবও হয় একের পর এক। অথচ এই দেশে সড়ক, রেল, নৌ—কোনো পথেই নিরাপদ যোগাযোগ বা পরিবহনব্যবস্থা গড়ে উঠল না। হয় রাস্তায় পিষে মরো, নয় পানিতে মরো, নয় পুড়ে মরো। এটাই কি উন্নয়নের রোডম্যাপ! দিন দিন দেশটা মৃত্যুর এমন কারাগার হয়ে উঠছে। পালিয়ে গিয়েও কি মেলে মুক্তি? অনেকে তো আবার ভূমধ্যসাগরেই ডুবে মরছে, নয়তো বিদেশের জেলখানা বা যৌনপল্লিতে পচে মরছে। আহ্‌, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি...’

রাফসান গালিব প্রথম আলোর সহসম্পাদক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন