বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

একটি উচ্চমাত্রার দুর্নীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের দুর্নীতির প্রকৃতি বোঝা দরকার। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অনেক দেশেই ব্যাপক দুর্নীতি সত্ত্বেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে (যা কথিত স্পিড মানি থিওরির মূল প্রতিপাদ্য), উন্নয়ন ঘটছে এবং তারপর সেই উন্নয়ন থেকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো গেছে এবং ধীরে ধীরে সেখানে সুশাসনও গড়ে উঠছে। বাংলাদেশে কি এটা ঘটেছে, ঘটছে বা ঘটতে যাচ্ছে? আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে দুর্নীতির সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থান সবচেয়ে দুর্বল। প্রকৃতপক্ষে এ অঞ্চলের মুষ্টিমেয় কয়েকটি দেশ দুর্নীতির বিরুদ্ধে বড় ধরনের কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করেই দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশও একটি দৃষ্টান্ত বটে। দুই দশক আগে পাওলো মাউরো তাঁর ‘করাপশন অ্যান্ড গ্রোথ’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক দক্ষতার সূচক যদি উরুগুয়ের সমান হতো, তাহলে বিনিয়োগ বেড়ে যেত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ, আর প্রবৃদ্ধি বেড়ে যেত অর্ধশতাংশের বেশি।’

অকার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থা সত্ত্বেও বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে উচ্চ প্রবৃদ্ধির হার ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। একইভাবে এমডিজি লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ক্ষেত্রেও দেশটি অপ্রত্যাশিত উন্নতি করেছে। বিশেষ করে, সামাজিক বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ পেছনে ফেলে দিয়েছে প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানকে। তাই এ পর্যায়ে দেশটির ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি আবারও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাসম্পর্কিত বিতর্ককে উসকে দেয়। সুশাসনের অভাব ও দুর্নীতি কি অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য মৌলিক বাধা?

সমাজবিজ্ঞানে প্রবৃদ্ধি ও দুর্নীতির মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে উত্তপ্ত ও প্রাণবন্ত বিতর্ক রয়েছে। কেউ কেউ যুক্তি দেখান, প্রবৃদ্ধির জন্য প্রথমে দুর্নীতির মূলোৎপাটন করাটা জরুরি নয়। পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে দুর্নীতির ব্যাপকতা থাকলেও দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি ঘটছে, যা পরবর্তী সময়ে তাদের সুশাসনে উন্নতি ঘটাতে সাহায্য করেছে। এখন প্রশ্ন হলো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণসহ সুশাসনসংক্রান্ত কিছু দিকের উন্নতি করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের উপাত্ত কী বলে? বাংলাদেশে কি এমনটা ঘটছে?

উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে প্রবৃদ্ধি ও সুশাসনের যোগসূত্রবিষয়ক গবেষণা অনেক কম। ২০১৯ সালে প্রকাশিত ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড কোয়ার্টারলি’ জার্নালে আমরা বাংলাদেশের কথিত ‘দ্বৈত প্যারাডক্স’ বিষয়টি পুনরায় নিরীক্ষা করি। অর্থাৎ উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতি এবং সুশাসনের অভাব সত্ত্বেও সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কীভাবে টেকসই হলো, তা পরীক্ষা করে দেখি। আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এটা খতিয়ে দেখা যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে সুশাসনের কোনো সূচকে উন্নতি হয়েছে কি না? আমরা সুনির্দিষ্টভাবে যেটি জানতে চেয়েছি তা হচ্ছে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক গঠিত সূচকে নিম্ন অবস্থান সত্ত্বেও বাংলাদেশে, বিশেষ করে পোশাকশিল্পের দুর্নীতিতে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না, যা দেশটির অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি ও বৈদেশিক মুদ্রার সবচেয়ে বড় উৎস।

আমরা বুঝতে চেয়েছি, পোশাকশিল্পে ঘুষ কি সঞ্চালক, নাকি একটা বাধা।

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা প্রথমে গত দুই দশকে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও রপ্তানি পরীক্ষা করে, সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগ পরিবেশ ও দুর্নীতির সূচক প্রবণতার সঙ্গে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সূচকের তুলনা করি। এ কাজে রাষ্ট্রভেদে বিস্তৃত পরিসরে বিষয়ভিত্তিক ও বস্তুনিষ্ঠ সূচক ব্যবহার করা হয়। এরপর বাংলাদেশের পোশাক কারখানার মালিকদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের পাশাপাশি গণমাধ্যমে দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের ওপর প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো যাচাই ও বিশ্লেষণ করেছি।

১৯৯০ থেকে ২০১৭ সময়ে বাংলাদেশের জিডিপি ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২৭ শতাংশের তুলনায় সন্তোষজনক।

১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পোশাকশিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণ থেকে উপকৃত হয়েছিল, যা অগ্রাধিকারমূলক বাজারে প্রবেশাধিকার এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হয়। ২০০৯ সালের পর দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ভারতকে ছাড়িয়ে যায়। তৈরি পোশাকশিল্প এখন দেশের রপ্তানি আয়ের ৭৫ শতাংশের বেশি এবং জিডিপির ২৫ শতাংশ। যদিও তৈরি পোশাকশিল্পের সম্প্রসারণ সুশাসন ও বিনিয়োগ পরিবেশসংক্রান্ত সূচকগুলোতে লক্ষণীয় কোনো পরিবর্তন আনতে সমর্থ হয়নি।

গত দুই দশকে সুশাসন ও দুর্নীতির বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে খারাপ অবস্থানে রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের গুণগত মানও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নীত হয়নি। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে নতুন ব্যবসা শুরু করতে যে সময় লাগত, তা ছিল দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ‘ব্যবসা করা কতটা সহজ’—এ রকম একটি জরিপ বিশ্বব্যাংক সব দেশের ওপর পরিচালনার মাধ্যমে একটা সূচক গঠন করে। ২০২০ সালের এই সূচকে ৮ ধাপ এগিয়ে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৮তম। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত অবশ্য আগের তুলনায় ১৪ ধাপ এগিয়ে তালিকার ৬৩তম স্থানে উঠে এসেছে। আর ২৮ ধাপ এগিয়ে পাকিস্তানের অবস্থান ১০৮তম। বাংলাদেশ সম্পত্তি নিবন্ধন ও এনফোর্সিং কন্ট্রাক্ট বা চুক্তি বাস্তবায়ন সূচকে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে।

প্রতিবেদন অনুসারে, সম্পত্তি নিবন্ধন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮৪তম এবং চুক্তি বাস্তবায়ন সূচকে ১৮৯তম। প্রতিবেদনে আফগানিস্তানের অবস্থান ১৭৩তম। ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষ স্থানে আছে। ভারত সারা বিশ্বে ৬৩তম স্থানে আছে। দক্ষিণ এশিয়ায় অন্য প্রায় সব দেশে ব্যবসা করা বাংলাদেশের চেয়ে সহজ। তার মানে হলো, ‘ভার্চ্যুয়াস সার্কেল’ তথা ‘গুণ-উৎকর্ষ বৃত্ত’ বাংলাদেশে অনুপস্থিত। অর্থাৎ উচ্চ প্রবৃদ্ধি এ দেশে সুশাসনে কোনো অবদান রাখে না। এর একটি কারণ, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি রপ্তানিনির্ভর।

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো ও পরিচালনা করার দেশের বাইরে যে বৈশ্বিক রীতি, তার প্রভাব রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পে পড়ছে; কিন্তু পোশাকশিল্পের বাইরে তা এখনো পরিব্যাপ্ত হয়নি। সিস্টেম্যাটিক ব্রাইবের তথা নিয়মমাফিক ঘুষের রীতি সম্ভবত পোশাকশিল্প থেকে রপ্তানিতে উল্লম্ফন ঘটিয়েছে। বিশ্বব্যাংক পরিচালিত এন্টারপ্রাইজ সার্ভে থেকে কোনো ব্যবসা কার্যক্রম শুরু করার ব্যয়ের খাতওয়ারি হিসাব পাওয়া যায় না। সে জন্যই আমরা পোশাকশিল্প ও পোশাকশিল্পের বাইরের খাত থেকে কারখানার মালিকদের সাক্ষাৎকার নিয়ে উপাত্ত সংগ্রহ করেছি।

আমাদের এই জরিপ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। প্রথমত, উত্তরদাতাদের মধ্যে ২২ দশমিক ৮ শতাংশ উৎকোচকে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছে, তবে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ উল্লেখ করেছে চাঁদাবাজির কথা। দ্বিতীয়ত, ৪৯ শতাংশ উত্তরদাতা ঘুষ কিংবা চাঁদাবাজিকে প্রতিবন্ধক হিসেবে অভিহিত করেছেন। তৃতীয়ত, ব্যবসায়ীরা তাঁদের নিজস্ব লাভ বা কাজ হাসিলের জন্যই ঘুষ দিয়ে থাকেন। কর প্রদান এড়াতে অথবা আমদানি পণ্যের আন্ডার-ইনভয়েসিং করে কম শুল্ক দেওয়ার জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দাবির সুযোগ ব্যবসায়ীরাই করে দেন। চতুর্থত, আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে কী পরিমাণ ঘুষ প্রদান করতে হবে, তা প্রায়ই শুল্ক কর্মকর্তারা নির্ধারণ করে দেন। পঞ্চমত, বিদেশি প্রতিষ্ঠানও স্থানীয় কোম্পানিগুলোর মতো সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ প্রদান করে থাকে। এ ক্ষেত্রে তারা উৎকোচ প্রদানের দেশীয় রীতিই অনুসরণ করে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে আমাদের বিশ্লেষণ রাজস্ব ও শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তাদের ঘুষ প্রদান এবং কর ও শুল্ক ফাঁকির বিষয়গুলোকে নিশ্চিত করেছে। আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতির বিষয়সহ ঘুষসংক্রান্ত যেসব তথ্য-উপাত্ত উঠে এসেছে, তা ব্যাখ্যা করা মুশকিল। বিশেষ করে, রপ্তানি খাতের দুর্নীতির ব্যাখ্যা কীভাবে করা যেতে পারে? ১৯৯০-এর দশকে তৈরি পোশাকশিল্পের প্রসার ঘটে একটা ব্যতিক্রমী অবকাঠামো এবং প্রশাসন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। বেশ কয়েকটি রপ্তানি প্রক্রিয়াজাত অঞ্চল (ইপিজেড) গড়ে ওঠে, যা একধরনের বাণিজ্যিক ছিটমহলের ভূমিকা পালন করে, যেখানে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ সব ধরনের অর্থনৈতিক বাধা এড়িয়ে পুঁজিভিত্তিক রপ্তানিযোগ্য উৎপাদন নিশ্চিত হয়।

এটি এক অর্থে বিশ্বায়নের সুফল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, এই সুফল ছিল সীমিত। ইপিজেডের বাইরে সারা দেশের শিল্প খাতের বাস্তবতায় তেমন বিশেষ কোনো পরিবর্তন আসেনি। অর্থাৎ রপ্তানি অঞ্চলের বাইরে অবস্থিত কারখানাগুলোর সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষের শিকার হওয়া রোধ করা যায়নি। বস্তুত, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অনিয়ম ও দুর্নীতির ভোগান্তি ব্যবসা পরিচালনার খরচের খাতার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েই রয়ে গেছে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, কয়েক দশক ধরে ধারাবাহিক সামষ্টিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও দুর্নীতি বাংলাদেশের রীতি বা প্রথা হয়ে আছে।

সরকারের সব স্তরে আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অক্ষমতা, বিশেষ করে শিল্প খাতের সম্প্রসারণ অসম্ভব করে তুলবে যখন উৎপাদন শিল্প উচ্চতর মূল্য সংযোজনশীল কার্যক্রম এবং প্রযুক্তিগত উন্নতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। দুর্নীতির প্রকৃত প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ‘ইতিবাচক’ বা ‘নেতিবাচক’—যা-ই হোক না কেন, কোভিড মহামারি-উত্তর সময়ে সমাজের বৈষম্য ও অসংগতি মোকাবিলায় দুর্নীতি দমনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) উদ্দেশ্য পূরণের অন্যতম শর্ত হচ্ছে সুশাসনের উন্নতি ও দুর্নীতি দমন। তা ছাড়া একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গঠন এবং মানববান্ধব উন্নয়নের স্বার্থে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সরকারগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ২০৩০ সালের মধ্যে সব ধরনের ঘুষের পরিমাণ ও দুর্নীতির প্রভাব কমিয়ে আনা।

(লেখাটি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের সাউথ এশিয়ান ব্লগে প্রথম প্রকাশিত)

ড. এম নিয়াজ আসাদুলাহ মালয়েশিয়ার মালায়া ইউনিভার্সিটিতে উন্নয়ন অর্থনীতির অধ্যাপক

ড. এন এন তরুণ রাশিয়ার সাইবেরিয়ান ফেডারেল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির ভিজিটিং প্রফেসর।

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন