রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতায় সীমার মধ্য থেকে অসীমের দিকে যাত্রা করতে চেয়েছিলেন। তাঁর কবিতার অন্যতম প্রধান উপজীব্য বেদনা, যেন বেদনাই জীবনের অন্তঃপ্রবাহ। কিন্তু এই বেদনা সব সময় ‘খালি চোখে দেখা যায় না’, বোঝা যায় না, কিন্তু বেদনা ঠিকই আছে সেখানে। তিনি প্রথমে কবিতার অক্ষরে বেদনা প্রকাশ করার চেষ্টা করলেন। তারপর একসময় তাতে সুর আরোপ করলেন। কিন্তু এই বেদনার পরিমাণ এতই গভীর আর তীক্ষ্ণ যে এত কিছুর পরও, তা পুরোপুরি প্রকাশে সফল হলেন না কবি। অন্তত তাঁর মন ভরল না। বেদনা প্রকাশের অপারগতার বেদনা থেকেই তিনি সব শেষে আশ্রয় নিলেন চিত্রে, বিশেষ করে নৈর্ব্যক্তিকে। রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা বিষয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, তাঁর নারী প্রতিকৃতিগুলো এত বিষণ্ন কেন? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে অন্য একটি বিষয়ের অবতারণা করতে হবে।

মানবের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল রবীন্দ্রনাথের। এক কবিতায় তিনি লিখেছেন:
‘হে রাজন, তুমি আমারে
বাঁশি বাজাবার দিয়েছ যে ভার
তোমার সিংহদুয়ারে’

কেন লিখি? রবীন্দ্রনাথ এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন অনেকটা এভাবে: আমরা কেউ কবি— কবিতা লিখছি, কেউ গীতিকার— সংগীত রচনা করছি, কেউ গায়ক— গান গাইছি, কেউ চিত্রকর—ছবি আঁকছি—আসলে এভাবে আমরা সবাই আমাদের কাজের মধ্য দিয়ে অমরত্ব প্রার্থনা করছি—মহাকালের বালুচরে আমরা সবাই আসলে একটা পদচিহ্ন রেখে যেতে চাইছি। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের মধ্যে অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা ছিল। অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও তাঁর সৃষ্টির প্রেষণা ছিল মহৎ।

অর্থাৎ বন্ধ দরজার বাইরে বসে বাঁশি বাজাবার অনুমতিটুকু পাওয়া গেছে, কিন্তু ভেতরে প্রবেশের অনুমতি মেলেনি। এক প্রবন্ধেও তিনি প্রায় একই কথা লিখেছেন: ‘আমরা যেন অশ্রু লবণাক্ত জলে ঘেরা একেকটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। একে অপরের পাড়ে ওঠার চেষ্টা করিতেছি, কিন্তু পারিতেছি না।’ মানবের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার বা পাড়ে ওঠার চেষ্টা বলতে মানুষের মনকে বোঝার চেষ্টা করার কথা বলা হয়েছে এখানে। আধুনিক যুগের সাড়া জাগানো দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট মানবের স্বরূপ অন্বেষণে সারা জীবন ব্যয় করেছেন। তাঁর ‘মানবপ্রকৃতির স্বরূপ অন্বেষা’ গ্রন্থে তার সাক্ষ্য মেলে।

এই যে পাড়ে ওঠার চেষ্টা, তথা মানবের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার প্রয়াস রবীন্দ্রনাথের সফল হয়নি। সে জন্য, অব্যক্ত বেদনায় নীল নারীর প্রতিকৃতি অঙ্কন আসলে সেই ভেতর যাত্রারই প্রয়াস। বেদনা থেকে মুক্তি পেতে, বস্তুত, এটাই তাঁর শেষ চেষ্টা। কিন্তু মুক্তি তিনি পেয়েছিলেন কি না, আমরা তা জানি না। সাহিত্য সমালোচনায় আমার জ্ঞান সীমিত, আর সে জন্যই রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য বিচারের জন্য আমাকে নির্ভর করতে হয়েছে অন্যের সমালোচনা গ্রন্থের ওপর। এখানে কয়েকজনের নাম করতে পারি, যেমন প্রমথ চৌধুরী, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, নীহার রঞ্জন রায়, অম্লান দত্ত, অন্নদাশঙ্কর রায়, আবু সায়ীদ আইয়ুব, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রমুখ। সাক্ষাতে বা টেলিফোনে যাঁদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে আছেন আহমদ শরীফ, শামসুর রাহমান, কবীর চৌধুরী, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, মুহম্মদ হাবিবুর রহমান, আবুল কাসেম ফজলুল হক, শুভ বসু প্রমুখ। ওপরের কবিতাটির উদ্ধৃতি ও ব্যাখ্যাটি চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমালোচনা গ্রন্থ, রবিরশ্মি থেকে ধার করা।

স্বদেশ, সংস্কৃতি, প্রেম, প্রকৃতি ও ঈশ্বর— রবীন্দ্রকাব্যের পঞ্চেন্দ্রিয়। আর এই পঞ্চেন্দ্রিয় থেকে কবি যেন পঞ্চ প্রদীপ জ্বেলে রেখে গেছেন আমাদের জন্য, রেখে গেছেন আবহমান কাল ধরে আলো ছড়ানোর জন্য বাঙালির জীবনে (পি আচার্য)। রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বরচেতনা প্রচলিত ঈশ্বরের ধারণা থেকে আলাদা। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাস ছিল এক জীবনদেবতায় যিনি ‘ভেতর থেকে রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে লিখিয়ে নিচ্ছেন’, ‘কথাগুলো তাঁকে দিয়ে বলিয়ে নিচ্ছেন’, এই জীবনদেবতাকে তিনি ‘মানসসুন্দরী’ রূপে কল্পনা করতে পছন্দ করতেন। রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যচেতনাও অভিনব। কবিতার মধ্যে তিনি ভাব ও সৌন্দর্যের ছবি এঁকেছেন। সৌন্দর্যের ভেতর দিয়ে সত্যের ও প্রেমের সাধনা রবীন্দ্রকাব্যের মূল উপজীব্য। কবির নিজের ভাষায়: নিজের মধ্যে অনন্তকে অনুভব করারই নাম ভালোবাসা, প্রকৃতির মধ্যে নিজেকে অনুভব করার নাম সৌন্দর্যসম্ভোগ। রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যচেতনা দেহনিরপেক্ষ ও অনির্বচনীয়।

গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদের জন্য রবীন্দ্রনাথকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। অন্নদাশঙ্কর রায় এই কাব্যকে বলছেন, ভগবৎ ভক্তির কাব্য। ইংরেজ কবিবন্ধু ডব্লিউ বি ইয়েটস রবীন্দ্রনাথকে উৎসাহিত করেন গীতাঞ্জলির সবগুলো কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করতে। কারণ, ঈশ্বরকে উদ্দেশ্য করে লেখা কথামালা এমন মধুর, সুরেলা ও ঝঙ্কারময়, সুললিত, সমর্পণের ও বেদনাবিধুর হতে পারে কবি ইয়েটসের তা জানা ছিল না। জানা ছিল না নোবেল কমিটির কোনো নির্বাচকের। তাই তো এই নোবেলপ্রাপ্তি।

রবীন্দ্রনাথ কি আধুনিক কবি? সাহিত্য সমালোচক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সোজাসাপটা জবাব: অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ আধুনিক কবি। আর অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, ‘যে কবির এমন মর্ত্যপ্রীতি, তিনি কি আধুনিক না হয়ে পারেন!’ রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানকে একটি বিশেষ ধারা হিসেবে দাবি করেছিলেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ছেলে সংগীতবিশেষজ্ঞ দিলীপ রায়ের সঙ্গে অনেক পত্র আদান-প্রদান হয়েছে এ বিষয়ে। দিলীপ রায় রবীন্দ্রনাথের এ দাবিকে নাকচ করে দিয়েছেন। বলেছেন, রবীন্দ্রসংগীত আধুনিক সংগীতেরই গোত্রভুক্ত।

কেন লিখি? রবীন্দ্রনাথ এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন অনেকটা এভাবে: আমরা কেউ কবি— কবিতা লিখছি, কেউ গীতিকার— সংগীত রচনা করছি, কেউ গায়ক— গান গাইছি, কেউ চিত্রকর—ছবি আঁকছি—আসলে এভাবে আমরা সবাই আমাদের কাজের মধ্য দিয়ে অমরত্ব প্রার্থনা করছি—মহাকালের বালুচরে আমরা সবাই আসলে একটা পদচিহ্ন রেখে যেতে চাইছি। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের মধ্যে অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা ছিল। অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও তাঁর সৃষ্টির প্রেষণা ছিল মহৎ। তিনি লিখেছেন:
ধরনীর তলে গগনের গায়
সাগরের জলে অরণ্যছায়
আরেকটুখানি নবীন আভায়
রঙিন করিয়া দিব।
সংসার-মাঝে কয়েকটি সুর
রেখে দিয়ে যাব করিয়া মধুর,
দু-একটি কাঁটা করি দিব দূর—
তার পরে ছুটি নিব।
অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে আরও একটি কবিতায়:
কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি
কৌতূহলভরে,
আজি হতে শতবর্ষ পরে!

অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের আশঙ্কা হয়েছিল এক শ বছর পর বাঙালির কি তাঁর কথা মনে থাকবে? তাঁর কবিতা কি কেউ পড়বে? এই আশঙ্কা থেকেই আবেগপ্রবণ কবি ওপরের কবিতাটি রচনা করেছিলেন। না। কবির সে আশঙ্কা সত্যি হয়নি। বাঙালি রবীন্দ্রনাথকে ভোলেনি। বরং আজও এ কবি প্রাতঃস্মরণীয়, আজও তিনি প্রাসঙ্গিক। অধ্যাপক পি আচার্যের ভাষায়: আমরা দুঃখ বেদনায় আজও তাঁর কাছে হাত পাতি। আজও আমরা রবীন্দ্রনাথে মরি ও বাঁচি...প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশ ও ঈশ্বর—এসব অনুষঙ্গ দিয়ে সাহিত্যের যে তীর্থক্ষেত্র রবীন্দ্রনাথ নির্মাণ করে গেছেন, রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে হলে আমাদের সেই রবীন্দ্রতীর্থে যাত্রা করতে হবে; রবীন্দ্রনাথ সব দেশের, সব মানুষের।

এন এন তরুণ রাশিয়ার সাইবেরিয়ান ফেডারেল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির ভিজিটিং প্রফেসর ও সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ।
[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন