দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের রাখাইনদের বঞ্চনা ও সংকটের ধরন বুঝতে নাগরিক প্রতিনিধিদলের সদস্য হয়ে আমরা সম্প্রতি বরগুনার তালতলী উপজেলা এবং পটুয়াখালীর রাখাইন জনপদ সরেজমিনে পরিদর্শন করি। বাংলাদেশ বহু সংস্কৃতি ও বহু জীবনের এক বৈচিত্র্যময় দেশ। বৃহত্তর বাঙালি ছাড়াও এখানে ৪৫ বা তারও বেশি জাতির মানুষের বসবাস। দেশের মোট ৩০ লাখ জনজাতির ভেতর রাখাইনদের সংখ্যা বর্তমানে মাত্র কয়েক হাজার। লেখক ও পুলিশ কর্মকর্তা ধীরাজ ভট্টাচার্যের যখন পুলিশ ছিলাম বইয়ে রাখাইন নারী মাথিনের প্রেমকাহিনি বেশ পরিচিত গল্প কিংবা হারুনুর রশিদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র মেঘের অনেক রঙেও আমরা রাখাইন চরিত্র পাই। বাংলাদেশে দুই শ বছরেরও প্রাচীন রাখাইন সভ্যতার নিদর্শন থাকা সত্ত্বেও রাখাইন জনগণ মূলধারায় এখন উপেক্ষিত।
বাংলাদেশের রাখাইনদের বসতি মূলত নদী ও সমুদ্র উপকূল। পটুয়াখালী, বরগুনা থেকে শুরু করে কক্সবাজার। এ অঞ্চলের আদি নামগুলো রাখাইনদের ভাষায়। যেমন ক্যানছাই চোয়ান। এই নামটি বদলে হয়েছে কুয়াকাটা—দেশের অন্যতম পর্যটনস্থল। ১৭৮৪-১৯০০ সালের দিকে বরিশাল উপকূলীয় অঞ্চলে ৫০ হাজারের বেশি রাখাইন বসবাস করত। ১৯০০-১৯৪৮ সালে এই সংখ্যা হয় ৩৫ হাজার। ২০১৪ কারিতাসের জরিপে রাখাইন জনসংখ্যা ২ হাজার ৫৬১। প্রবীণ রাখাইনদের সঙ্গে আলাপ করে মোট ২৩৭টি রাখাইন গ্রামের নাম পাওয়া যায়। বর্তমানে ১৯২টি রাখাইন গ্রামের কোনো হদিস নেই। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় ২৮টি এবং গলাচিপা উপজেলায় ৪টি রাখাইন গ্রাম আছে। বরগুনার তালতলী উপজেলায় ১৩টি রাখাইন গ্রাম আছে। বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে প্রায় ৮০ ভাগ রাখাইন গ্রাম বেদখল হয়ে গেছে এবং জনসংখ্যা কমেছে প্রায় ৯৫ ভাগ। রাখাইন জনগোষ্ঠীর ভূমি দখলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোনো উদ্যোগ নেই। এমনকি স্থানীয় সরকার সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনও নির্বিকার।
পালতোলা নৌকায় সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার বিজ্ঞান কৌশল থেকে শুরু করে সমুদ্র উপকূলে বসতি নির্মাণের কারিগরির জন্ম দিয়েছে রাখাইনরা। আজকের ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নকশার মূল ধারণা এসেছে রাখাইনদের টংঘর থেকে। সামুদ্রিক মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ, তাঁতশিল্প রাখাইন সংস্কৃতির অন্যতম নিদান। উপকূল অঞ্চলে লবণাক্ততা ও পানীয় জলের অভাবকে মোকাবিলা করে রাখাইনরা পুকুর ও কূপ খনন করে পানীয় জল সংরক্ষণে এক ঐতিহ্যবাহী চর্চায় পরিণত করেছেন। প্রতিটি রাখাইন পাড়ায় পানীয় জলের পুকুরটি পবিত্র ও পাবলিক বা রিজার্ভ পুকুর হিসেবে সংরক্ষিত হচ্ছে। এসব পুকুরের জল শুধু মানুষ ও প্রাণীর পানীয় জলের জন্য। যেমন বেতুলিয়া রেকা নামের পুকুরটি এক ঐতিহ্যবাহী পুকুর। বরগুনার তালতলী উপজেলার সোনাকাটা ইউনিয়নের বেতুলিয়া (কবিরাজপাড়া) পাড়ায় এর অবস্থান। ৭০ শতক আয়তনের এই পুকুরটি দখল হয়ে গেছে। ১৯৫৯ সাল থেকে দরবার চলছে। কলাপাড়া উপজেলার দিয়াড় আমখোলা গ্রামের পুকুরটিও দখল হয়ে গেছে। কালাচান পাড়া, থঞ্জুপাড়া, লক্ষ্মীপাড়া, নায়রী পাড়ার রাখাইনদের পুকুরগুলো জবরদখল করে মাছ চাষ করা হচ্ছে এবং ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। উপকূল অঞ্চলে পানীয় জলের সংকট তীব্র, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুকুর দখল। রাখাইনদের পানি ব্যবস্থাপনার লোকায়ত সংস্কৃতিকে গুরুত্ব না দিয়ে দিন দিন তাদের কাছ থেকে নিজেদের পুকুর, কূপ ও ধারেকাছের খালগুলোও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
কেবল পুকুর বা কৃষিজমি নয়, মন্দির বা ধর্মস্থল নয়। মৃত্যুর পর শেষ ঠিকানা রাখাইনদের চানসাইগুলোও জবরদখল হয়ে যাচ্ছে। রাখাইন ভাষায় চানসাই মানে শ্মশানভূমি। কলাপাড়ার ছয়ানীপাড়ার দেড় শ বছরের প্রাচীন শ্মশান থেকে শুরু করে তালতলী উপজেলার অংকুজানপাড়ার খাদ্যা সং চানসাই শ্মশান দখল হয়ে গেছে। একই অবস্থা কলাপাড়ার থঞ্জুপাড়া, মিশ্রীপাড়া, দিয়াড় আমখোলা পাড়া, কালাচান পাড়া, তুলাতলী, নয়াপাড়া-বাবলাতলা, সোনাপাড়া, চৈয়পাড়া, হাড়িপাড়ার শ্মশানগুলোর ক্ষেত্রেও। অংকুজানপাড়া পরিদর্শনে দেখা যায় যে ভূমিদস্যুদের অব্যাহত ভূমি আগ্রাসনের ফলে সংকুচিত হয়ে পড়েছে এই রাখাইন গ্রামের পরিধি। একসময় যেখানে অর্ধশতাধিক রাখাইন পরিবার বসবাস করত, সেখানে বর্তমানে মাত্র ১১ পরিবারের বসতি রয়েছে। অংকুজানপাড়ার শ্মশানভূমির একাংশ জনৈক প্রতিবেশী দখল করে বাড়ি নির্মাণ করেছে। সাতাশ হাজার টাকার বিনিময়ে কিনে নিয়েছে বলে তিনি দাবি করলেও রাখাইন গ্রামবাসী বলেছেন, শ্মশান একটি দেবোত্তর সম্পত্তি, এটা বিক্রি করা যায় না। গ্রাম থেকে শ্মশানে শবদেহ নেওয়ার রাস্তাও ঘেরা দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে ভূমি দখলদারেরা।
পায়রা বন্দরের জন্য ছয়ানী রাখাইন পাড়ার মন্দির পর্যন্ত সরিয়ে ঘরের কাছে নিতে হয়েছে। ছয়ানীপাড়ার তথাকথিত উন্নয়ন ও দখলের যেসব তাণ্ডব চলছে, তার ভেতর আত্মপরিচয় ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে কোনো রাখাইন গ্রামের টিকে থাকা বিপজ্জনক। বেড়িবাঁধ-সংলগ্ন রাখাইনদের জমি দখল করে পার্শ্ববর্তী গ্রামের প্রভাবশালী তিন ব্যক্তি, যাদের একজন আওয়ামী লীগ ও দুজন বিএনপি করেন। পাড়াপ্রধান চিংদামো এই জবরদখলের বিরুদ্ধে কলাপাড়া থানায় মামলা করলেও প্রতিকার পাওয়া যায়নি। প্রতিনিধিদল সফরকালেও ঘর নির্মাণের কাজ চলছিল। পায়রা বন্দরের সংযোগ সড়কের জন্য রাখাইনদের ১০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তার মধ্যে ৭ দশমিক ৬৯ একর জমি ভূমিদস্যু বাঙালিরা তাদের মালিকানাধীন বলে আদালতে মামলা করেছে। তাই রাখাইনরা অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিপূরণ পাবে কি না, সেটা নিয়েও সংশয় আছে। পরিদর্শনকালে নানাগ্রামের রাখাইন নারী-পুরুষেরা জানিয়েছেন, মামলা, হামলা ও সারাক্ষণ একটা হুমকির ভেতরও থাকতে হচ্ছে তাদের।
সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে আমরা সরকারের কাছে রাখাইনদের অধিকার রক্ষায় নিচের দাবিগুলো রাখছি:
১. রাখাইনসহ দেশের সমতল অঞ্চলের সব জনজাতির বেহাত হওয়া ভূমি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে একটি পৃথক ভূমি কমিশন করা এবং সেই সঙ্গে রাখাইনদের ভূমি বেদখল রোধকল্পে জেলা পর্যায়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা।
২. রাখাইনদের ভূমি বেদখল রোধকল্পে ১৯৫০ সালের জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারা যথাযথভাবে কার্যকর করা।
৩. বেদখলকৃত বৌদ্ধবিহার, শ্মশান ও রিজার্ভ পুকুর ও অর্পিত শত্রু সম্পত্তির নামে দখলকৃত জমি মুক্ত করে রাখাইন কর্তৃপক্ষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া ।
৪. সরকার কর্তৃক অনুস্বাক্ষরিত ‘আদিবাসী ও ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীবিষয়ক আইএলওর ১০৭ নম্বর কনভেনশন অনুসারে রাখাইন ঐতিহ্যগতভাবে অধিকৃত ভূমির ওপর ব্যক্তিগত ও প্রথাগত ভূমি অধিকার সুনিশ্চিত করা।
৫. বিকৃত করা রাখাইন পাড়ার নাম রাখাইনদের নিজ নিজ ঐতিহ্যগত নামে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা এবং রাখাইনদের ঐতিহাসিক স্থানগুলোসহ নিজস্ব সংরক্ষিত এলাকা অধিগ্রহণ না করা।
৬. রাখাইন জনগোষ্ঠীর ভূমি সমস্যা নিরসনকল্পে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে রাখাইন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় সভার উদ্যোগ গ্রহণ করা।
৭. বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো হল, সড়ক, সেতু বা বৃহৎ স্থাপনা বা কুয়াকাটায় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নাম ভাষাসৈনিক উস্যুয়ে রাখাইনের নামে করা।
লেখকেরা: মানবাধিকারকর্মী, নারীনেত্রী, সাংবাদিক, গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।