বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি কখনো অর্জন করতে পারেনি। করতে দেওয়া হয়নি আসলে। নির্বাচন কমিশন নামে স্বাধীন হলেও কাজ করেছে মোসাহেবের মতো। রাষ্ট্র, সরকার ও প্রশাসন শুধু নয়, নাগরিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ক্ষমতার চাপে-তাপে বাঁকিয়ে ফেলা হয়েছে। যখন কিছু করার নেই, তখন উপভোগ করার করুণ নীতি নিয়েছি আমরা। প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ চালানোর যোগ্য করে গড়ে তুলতে হলে নির্বাচন দরকার। সুষ্ঠু নির্বাচনের পর রাতারাতি শান্তির সুবাতাস আর সমৃদ্ধির নহর বইবে না। তবে দমবন্ধ অবস্থা থেকে বেরোনোর পথটা খুলবে।

নির্বাচন দরকার রাজনীতির মাঠ থেকে অপরাধীদের সরানোর জন্য। রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে দুর্বৃত্ত ও তাদের ক্রিমিনাল আচরণকে চাপে ফেলার জন্যও। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যিনি নির্বাচিত হন, ভোটারের দুর্ভিক্ষে যিনি ফাঁকতালে জিতে যান, ভোটের আগের রাতে যাঁরা দাঁও মারেন, তাঁদের চেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়া মানুষ তুলনামূলক বেশি জবাবদিহি করেন, বেশি গণতান্ত্রিক হন। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতির গণতান্ত্রিক ধমনিটা সংকুচিত হয়ে আছে। তাতে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করার জন্য সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

পথ আরেকটা ছিল, সেটা হলো গণ-আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থান। উনসত্তরের মতো ব্যাপক গণ-অভ্যুত্থান ছাড়া সত্তরের নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটতে পারত না। নব্বইয়ের নগরকেন্দ্রিক গণ-অভ্যুত্থান ছাড়া একানব্বইয়ের নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারত না। গণ-অভ্যুত্থান হলো রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দাপট দিয়ে দেশ চালানোর বিরুদ্ধে জনগণের পাল্টা দাপট প্রতিষ্ঠা করা। সেই রক্তক্ষয়ী পথ এড়ানোর জন্যই নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনাকারী সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

বাস্তবতা হলো রাজনীতির ময়দানে এখন জনগণ নেই। গণ-আন্দোলন সৃষ্টি করার তাকত বিএনপির পক্ষে শিগগির অর্জন করার অবস্থা নেই। কেবল জোরজুলুমেই তারা কমজোরি হয়নি, নিজেদের ভুলও রয়েছে। গত ১০ থেকে ১২ বছরে জনগণের দাবি নিয়ে মাঠে থাকার কোনো পথই তারা বের করতে পারেনি। দেশি-বিদেশি পরিস্থিতিও তাদের অনুকূলে নয়।

তাহলে রইল তৃতীয় একটা পথ। সেটা হলো এলিট সেটেলমেন্ট বা অভিজাত বন্দোবস্ত। সেটা কী রকম? আমরা মাৎস্যন্যায়ের কথা জানি। অষ্টম শতকে বাংলার অভিজাত সমাজ বিরাট এক কাজ করেছিল। তার আগের শতবর্ষজুড়ে এই দেশে চলছিল চরম অরাজকতা। মানীর মান থাকত না, গরিবের আহার জুটত না, বড় মাছ যেমন ছোট মাছকে গ্রাস করে, তেমন মাৎস্যন্যায়ে মানুষ হাঁসফাঁস করছিল। সে রকম অবস্থায় অভিজাত সমাজের নেতারা একসঙ্গে বসে তাঁদের একজনকে নেতা নির্বাচিত করেন। সেকালের পদবি অনুযায়ী গোপাল হলেন রাজা। তিনি ৭৫০ থেকে ৭৭০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। গোপাল বাংলার শতবর্ষব্যাপী চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করেন। তাঁর নামের অংশ ‘পাল’, অর্থ যিনি পালন করেন, রক্ষা করেন। বাংলার গণতান্ত্রিক রেওয়াজের সেটাই আরম্ভ। সে সময়ের অভিজাত মানুষেরা এই বন্দোবস্তের পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের এলিট অংশ থেকে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের উপায় বের করার যে চেষ্টা হচ্ছে, সেটাও একধরনের এলিট সেটেলমেন্ট। আরেক অর্থে এটা রাজনৈতিক বন্দোবস্ত। আমাদের নব্বইয়ের তিন জোটের রূপরেখাও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দাবি নিয়ে হাজির হয়েছিল। তাতে শুধু অবাধ নির্বাচনের কথা ছিল না, নাগরিকদের জান-জবান ও অর্থনৈতিক অধিকারের দাবিও ছিল। এই রাজনৈতিক বা নাগরিক বা এলিট বন্দোবস্ত সহিংসতার সম্ভাবনাকে কমিয়ে আনবে, রাজনীতি ও সমাজের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে যে কারও একচেটিয়া ক্ষমতাকে প্রশমিত করবে। চোখের বদলে চোখ নিতে নিতে একসময় সবাই অন্ধ হয়ে যাওয়ার সর্বনাশা ঝোঁকের লাগাম টেনে ধরবে।

এই রাজনৈতিক বন্দোবস্তে মুখ্য ভূমিকা নিতে হবে রাজনীতিকদেরই। প্রতিহিংসার শিকার তো তাঁরাই হন বেশি। ক্ষমতার পালাবদলের সময় যে হানাহানি হয়, তা ঠেকাতে আগেভাগেই এই বন্দোবস্তে সবার একমত হওয়া জরুরি। একটি কর্তৃত্ববাদী সরকার এ রকম বন্দোবস্তের মাধ্যমেই সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে স্বাভাবিক সরকারে পরিণত হতে পারে। যেকোনো দলই দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকলে অহংকারী হয়ে পড়ে, তার ভেতরে সমাজের অপশক্তিগুলো বাসা বাঁধে। নিজেকে নবায়িত করার জন্যও নাগরিক মহল ও রাষ্ট্রের বিবিধ প্রাতিষ্ঠানিক খুঁটির সঙ্গে মিলে এ রকম এক বন্দোবস্তে আসা তার প্রয়োজন। না হলে ‘হয় আমি থাকব, না হয় তুমি থাকবে’ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। সেটা কারও জন্যই ভালো হওয়ার কথা নয়।

মোদ্দাকথা, রাজনীতিকে শান্তিপূর্ণ এবং উদ্ধত ক্ষমতাকে সভ্য করতে হলে নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ছাড়া আর কোনো শান্তিপূর্ণ পথ নেই। এই বন্দোবস্ত মানলেই যে রাজনৈতিক বিরোধের অবসান হবে, দলমত সব গুলিয়ে ছাতুর মণ্ড হবে, তা নয়। কিন্তু তাঁরা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংবিধানের মূলনীতির অধীনে চলতে দিতে এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সাধারণ নিয়ম বিষয়ে একমত হবেন। আজ হোক কাল হোক, এটাই ভবিতব্য।

ফারুক ওয়াসিফ লেখক ও সাংবাদিক। [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন