
বিএনপি ও ২০-দলীয় জোট এখন ‘আন্দোলনে’ আছে। এই আন্দোলনের কৌশলটা কী? সহিংসতা? রাজনৈতিক আন্দোলনে সহিংসতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সহিংস আন্দোলন বলতে যা বোঝায়, বিএনপি বা তাদের জোট কি সেই পথ ধরছে? সহিংস আন্দোলনের সীমা কতটুকু? কখন বা কোন পর্যায়ে এ ধরনের আন্দোলন জায়েজ? নাকি এটা শুধুই সন্ত্রাস? সবচেয়ে বড় কথা, ‘আন্দোলনের’ এ ধরনের কৌশলে সাফল্যের সম্ভাবনাই বা কতটুকু, এর মধ্য দিয়ে কী পাওয়ার আশা করছে বিএনপি?
অবরোধের ২৩ দিন পার হয়েছে, এই সময়ে মারা গেছে ৩৮ জন। এঁদের মধ্যে ১৯ জনই মরেছেন পেট্রলবোমা ও আগুনে পুড়ে। নারী-শিশুসহ অসংখ্য মানুষ এখনো পোড়া শরীর নিয়ে কাতরাচ্ছেন হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। এঁরা সবাই নিরীহ নাগরিক, কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়। বাংলাদেশে গণ-আন্দোলনে বা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এর আগেও নানা মাত্রায় সহিংসতা হয়েছে। গাড়ি ভাঙা, তাতে আগুন লাগানো—সবই হয়েছে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় সাধারণত সরকারি বাস বা সরকারি গাড়িগুলোকে (সরকারি গাড়ির তখন ভিন্ন রঙের নম্বর প্লেট ছিল) টার্গেট করা হতো হামলার জন্য। এরশাদবিরোধী আন্দোলন বছরের পর বছর ধরে চলেছে, কিন্তু কোনো যাত্রী আগুনে পুড়ে মারা গেছে এমন নজির নেই। এসব আন্দোলনে অনেক প্রাণহানিও ঘটেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষে এসব মৃত্যু ঘটেছে। রাজনৈতিক কর্মীদের বাইরে সাধারণ নাগরিকও যে এর শিকার হয়নি তা–ও নয়। কিন্তু তখন আন্দোলনে রাস্তায় রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা থাকতেন, সাধারণ মানুষও তাঁদের সঙ্গে যোগ দিতেন।
এখন যে আন্দোলন হচ্ছে, তাতে রাস্তায় রাজনৈতিক দলের কোনো কর্মী নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনাও তেমন নেই। মানে রাজনৈতিক বা গণ-আন্দোলনে সহিংসতা বলতে আমরা সাধারণভাবে যা বুঝি, তা নেই। এখন যা হচ্ছে তা চোরাগোপ্তা হামলা, সহিংস রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে কখনো কখনো এটাও কাজে লাগানো হয়। কিন্তু নিরীহ সাধারণ নাগরিককে টার্গেট করে শিকারে পরিণত করার নজির নেই। এ ধরনের ঘটনাকে রাজনৈতিক সহিংসতা হিসেবে ধরা হয় না। টার্গেট করে সাধারণ মানুষ মারাকে দুনিয়াজুড়ে এখন সন্ত্রাসী কাজ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।
গণ-আন্দোলন বা রাজনৈতিক আন্দোলনে সহিংসতা ও বিশুদ্ধ সন্ত্রাসের মধ্যে পার্থক্যের বিষয়টি খুবই স্পষ্ট। গত বছরের ১৪ আগস্ট থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানে ‘আজাদি মার্চ’ করেছে ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফ পার্টি। ২০১৩ সালের নির্বাচনে কারচুপি এবং প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পদত্যাগের দাবিতে দীর্ঘদিনের এই ‘আজাদি মার্চে’ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। লাহোর থেকে এই মার্চ ইসলামাবাদে পার্লামেন্ট ভবন ঘেরাওয়ের দিকে গেলে খুব স্বাভাবিকভাবেই সংঘাতের ঘটনা ঘটে এবং তা অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন জায়গায় পুলিশের হাতে অন্তত ১৩ জন বিক্ষোভকারী মারা যান। পেশোয়ারে আর্মি পাবলিক স্কুলে পাকিস্তানি তালেবান গোষ্ঠীর (তেহরিক-ই-তালেবান বা টিটিপি) হামলায় ১৩২ জন স্কুলশিশুসহ ১৪৫ জন মারা যাওয়ার ঘটনার পর ইমরান খান তাঁর আজাদি মার্চের কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করেন। ইমরান খানের আজাদি মার্চের সহিংসতা হচ্ছে রাজনৈতিক আন্দোলনে ‘সহিংসতা’। আর স্কুলে হামলা চালিয়ে টিটিপি যে বর্বরতা দেখিয়েছে, তা শুধুই সন্ত্রাস।
মিসরে তাহরির স্কয়ার আন্দোলনের চার বছর পূর্তি হলো ২৬ জানুয়ারি। এ নিয়ে দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, ২৪ জানুয়ারি থেকে সেই সংঘাত ও সহিংসতায় পুলিশের দুই সদস্যসহ মারা গেছেন ২০ জনেরও বেশি। একধরনের সামরিক শাসনই চলছে সেখানে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আগে থেকেই তাহরির স্কয়ার অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন। বিরোধী নেতা-কর্মীদের ধরপাকড়ও করা হয়েছে ব্যাপক হারে। এসব তৎপরতা বিক্ষোভকারীদের দমাতে পারেনি। তারা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে, গাড়িতে আগুন দিয়েছে, পেট্রলবোমাও ছুড়েছে। কিন্তু কোনো সাধারণ মানুষকে আন্দোলনকারীরা পুড়িয়ে মারেনি বা মারার চেষ্টাও করেনি। সহিংস হলেও এটা রাজনৈতিক ও গণ-আন্দোলন।
বিএনপি ও ২০-দলীয় জোটের ডাকা অবরোধ কর্মসূচির সময় যাত্রীবাহী বাস টার্গেট করে পেট্রলবোমা হামলা করা বা আগুন ধরিয়ে নারী, শিশুসহ সাধারণ মানুষকে পুড়িয়ে মারা, চালক বা হেলপারসহ বাস বা ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনাগুলোকে তাই ‘রাজনৈতিক সহিংসতা’ হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই। এসব ঘটনার দায় অবশ্য বিএনপি অস্বীকার করছে এবং সরকারই এসব ঘটাচ্ছে বলে দাবি করছে। তবে যারাই ঘটাক, দেশে যা ঘটছে তা কোনোভাবেই রাজনৈতিক সহিংসতা নয়, বিশুদ্ধ সন্ত্রাস।
বিরোধী দলের অবরোধ কর্মসূচির কারণে যেহেতু সাধারণ মানুষের ওপর এই বর্বরতা ঘটছে, তাই এর দায় প্রধানত তাদের ওপরই এসে পড়ছে। এ ধরনের হামলার ঘটনার খবর, প্রতিবেদন বা ছবি দেখে সাধারণ মানুষের যে প্রতিক্রিয়া, তাতে এটা পরিষ্কার। তবে এই পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য অনেকেই চূড়ান্ত বিচারে সরকারকেই দায়ী মনে করেন। অনেকেরই বিশ্বাস, ৫ জানুয়ারির মতো একটি নির্বাচন না করলে এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। বিএনপিকে সভা-সমাবেশ করতে না দিয়ে এবং দলের চেয়াপারসনকে তাঁর কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে সরকার এই পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করেছে। আগুনে মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো বর্বরতা নিয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার লেখা ও প্রতিবেদনের নিচে (অনলাইন সংস্করণে) অনেক পাঠক দুঃখ ও সহানুভূতি প্রকাশ করে এমন আক্ষেপও করেছেন যে বিএনপির এখন কী-ই বা করার আছে।
৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিশ্চিতভাবেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নয়। অনেকেই আশা করেছিলেন ‘নিয়ম রক্ষার’ এই নির্বাচনের পর সমঝোতার মাধ্যমে সবার অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ খোঁজা হবে। নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সেই পথে হঁাটেনি। বরং দিনে দিনে কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছে। একসময় বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ করার অধিকারই কেড়ে নিয়েছে। বিএনপির বড় নেতাদের অনেকেই এখন জেলে, দলটির প্রধান কার্যালয় তালাবদ্ধ। খালেদা জিয়াকে তাঁর কার্যালয়ে আটকে রেখে সরকার যেমন চরম অগণতান্ত্রিক আচরণ করল, তেমনি নিজের কর্তৃত্ববাদী চেহারাকেও জাতির সামনে তুলে ধরল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এমন একটি দেয়ালে পিঠ ঠেকা পরিস্থিতিতে বিএনপির রাজনৈতিক বা আন্দোলনের কৌশল কী হবে? সেটা কি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দিয়ে সাধারণ মানুষ পুড়িয়ে মারার কৌশল?
রাজনীতিতে সহিংসতা বা রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে দুনিয়াজুড়ে তাত্ত্বিক আলোচনা কম হয়নি। রাজনৈতিক সহিংসতার পক্ষে যুক্তিও রয়েছে। জার্মান রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হানাহ আরেন্ড তাঁর অন ভায়োলেন্স (১৯৭০) বইয়ে রাজনৈতিক সহিংসতার পক্ষে যুক্তি হিসেবে দুটি পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, চরম অন্যায্য আচরণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এবং দ্বিতীয়ত, এটা সেই মাত্রা পর্যন্ত যৌক্তিক, যা একটি রাজনীতির পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। সহিংসতা কাজে দেয়—এই ধারণা যদি কেউ মেনে নেয়, তবে তার সঙ্গে এই পরিস্থিতি দুটিকেও বিবেচনায় নিতে হবে।
আগেই বলেছি যে বিএনপির অবরোধ কর্মসূচির সময়ে সাধারণ মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো যে ঘটনাগুলো ঘটছে, তা কোনোভাবেই রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যে পড়ে না। আরেন্ডের কথা অনুযায়ী যদি আমরা ধরে নিই যে ‘চরম অন্যায্য আচরণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে’ বিএনপি এই সহিংস পথ ধরেছে, তাহলে এটা কোন মাত্রা পর্যন্ত যৌক্তিক, সেটা সম্ভবত তাদের বিবেচনার বাইরে রয়েছে। আর এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের বর্বর সহিংসতা কি ভবিষ্যতে কোনো ‘রাজনৈতিক পরিস্থিতি’ সৃষ্টিতে সহায়ক হবে?
রাজনীতিতে সহিংসতার পথ নেওয়া হয় মূলত দ্রুত ফল পাওয়ার জন্য। আরেন্ডের মত হচ্ছে, সহিংসতা সর্বোচ্চ যা দিতে পারে, তা হচ্ছে একটা স্বল্পস্থায়ী সমাধান এবং তা বিশেষ প্রকৃতির। আর সহিংসতার পরিণতি নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা আমাদের নেই, শুধু এর তাৎক্ষণিক প্রভাব ছাড়া। বাংলাদেশে এখন মানুষ পুড়িয়ে মারার যে সহিংসতা হচ্ছে, তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী, সেটা আসলেই বলা কঠিন। আর ‘দ্রুত ফলাফলের’ জন্য যদি তা বেছে নেওয়া হয়, সেটাও কার্যকর ফল দেবে বলে মনে হয় না। কারণ, নব্বইয়ের পরের বাংলাদেশে দেখা গেছে যে অবরোধ বা হরতাল দিয়ে কোনো সরকারকে তার মেয়াদের আগে হটানো যায়নি।
আবার যেসব দেশে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সাধারণ মানুষকে নিয়মিত তাদের শিকারে পরিণত করছে, সেখানেও এর মাধ্যমে আর যা-ই হোক সরকারের পতন হয়নি। আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া বা নাইজেরিয়ায় কত লোক মরছে, সরকারের পতন ঘটছে কই? তাহলে বাংলাদেশে নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে মারার এই কৌশল কেন নেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্ন খুবই স্বাভাবিক। এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর পেছনে একটাই বিবেচনা কাজ করে থাকতে পারে এবং তা হচ্ছে অসহনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি এবং তা রাজনীতির বাইরের অভ্যন্তরীণ শক্তি ও আন্তর্জাতিক মহলের নজরে আনা। বর্তমান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এ ধরনের কোনো কৌশল সফল হওয়ার জন্য সহায়ক বলে মনে হয় না।
বিএনপি তাহলে কী করতে পারে? যত সময়ই লাগুক, নেতা-কর্মীরা যতই ‘জেল-জুলুমের শিকার’ হোন, সভা-সমাবেশ করতে সরকার যতই বাধা দিক—সব উপেক্ষা করে জনগণকে মাঠে নামানোর কৌশলই নিতে হবে। সন্ত্রাস বা নাশকতার কৌশলে শক্তিক্ষয় ছাড়া বিএনপির কোনো প্রাপ্তি ঘটবে না।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
[email protected]