রাষ্ট্রদ্রোহের সংজ্ঞা কী?

সম্প্রতি অভিনেত্রী রামাইয়া ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে যে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছে, তাতে এক বিতর্ক শুরু হয়েছে: বিধিসম্মত মতভেদ কী? আবার কখন মুক্তবাক ‘জাতিবিরোধী’ এমনকি ‘রাষ্ট্রদ্রোহমূলক’ হয়ে যায়? বিশেষ করে তিন ধরনের মতদ্বৈধতার বৈধতা নিয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রথমত, যখন সরকারের কোনো নীতি, কাজ বা সংস্থার সমালোচনা করা হয়, তখন ব্যাপারটা কেমন দাঁড়ায়। কথা হচ্ছে এ ধরনের মতদ্বৈধতা গণতন্ত্রের প্রাণ। বিরোধী দল ও সাংবাদিকদের কাজই হচ্ছে সরকারের নীতি, কাজ ও সংস্থার ভুল চিহ্নিত করা। এমন কোনো ভারতীয় নাগরিককে পাওয়া যাবে না, যিনি জীবনের কোনো না–কোনো সময় সরকারের সমালোচনা করেননি। এই সমালোচনার মাধ্যমে সরকারের ভুল কাজ মানুষের নজরে আসে। এই সমালোচনা না থাকলে রাষ্ট্র জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানতে পারবে না। ইন্দিরা গান্ধীর সরকার ১৯৭০-এর দশকে ভারতে যে জরুরি অবস্থা জারি করেছিল তাতে বোঝা যায়, সরকার জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে না জানলে তার রাজনৈতিক পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
কিন্তু পরিহাসের ব্যাপার হচ্ছে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪ নম্বর ধারা, যেটা সাধারণভাবে রাষ্ট্রদ্রোহ আইন হিসেবে পরিচিতি—এই ধরনের মতভিন্নতাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, যার দ্বারা জনমনে সরকারের প্রতি ঘৃণা ও অবজ্ঞার সৃষ্টি হয়, তার প্রতি মানুষের রাজনৈতিক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। কিন্তু এই ধরনের সেকেলে আইন এখনো ভারতে রয়ে গেছে, যে আইন দিয়ে ঔপনিবেশিক শাসকেরা ভিন্নমতের ওপর হামলে পড়ত।
১৯৬২ সালের কেদার নাথ সিং বনাম বিহার রাজ্যের এক মামলায় সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ রায়ে এই ১২৪-এ নম্বর ধারার প্রয়োগ সীমিত করে দিয়েছিলেন, ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বা সহিংসতা উসকে দেওয়ার’ মতো কাজের ক্ষেত্রে এই ধারা প্রয়োগ করা যাবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই ধারা হরেদরে ব্যবহার করে মানুষকে হেনস্তা করা হচ্ছে। যাঁরাই জাতিসত্তা ও সুনির্দিষ্ট নীতির প্রসঙ্গে সরকারের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করছেন, তাঁদেরই এই আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। এমনকি তাঁদের কথায় সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হলেও। এর সবচেয়ে সাম্প্রতিক নজির হচ্ছে, বেঙ্গালুরু পুলিশ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে এফআইআর দাখিল করেছে। জম্মু ও কাশ্মীরে মানবতা লঙ্ঘনের পরিপ্রেক্ষিতে ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবিতে তারা প্রচারণা চালাচ্ছিল, তার অংশ হিসেবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বেশ কজন কাশ্মীরি আজাদির স্লোগান তুললে পুলিশ এই এফআইআর দাখিল করে। অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপির) অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ এ কাজ করেছে।
১২৪-এ ধারায় কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে, যার মধ্যে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে। মুক্তবাকের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। ফলে ভিন্নমত দমনে এটা রাষ্ট্রের হাতে খুবই শক্তিশালী অস্ত্র।
দ্বিতীয় ধরনের ভিন্নমতের জায়গা হচ্ছে জাতির সমালোচনা। যেমন, ভারত নারীদের জন্য অনিরাপদ, সংখ্যালঘুদের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করা হচ্ছে অথবা শক্তিমানেরা দুর্বলদের শোষণ করছে—এমন কথা বলা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিজেপির নির্বাহী কমিটির সাম্প্রতিক বৈঠকে এ ধরনের মতভেদের সমালোচনা করেছেন। তিনি নাকি বলেছেন, ‘আমরা রাজনৈতিক সমালোচনা গ্রহণ করতে পারি, কিন্তু জাতির সমালোচনা নয়।’ তবে প্রধানমন্ত্রী ভুলে গেছেন, বহুকাল ধরেই ‘জাতীয়তাবাদী’ নাগরিকদের জাতির সমালোচনার মধ্য দিয়ে সমাজের সবচেয়ে গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন এসেছে। এ রকম মানুষেরা না থাকলে ভারত হয়তো এখনো উপনিবেশ হিসেবে থেকে যেত। নারীদের ভোটাধিকার থাকত না।
বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নির্বিঘ্ন থাকলে বোঝা যায়, রাষ্ট্র কোন কোন ক্ষেত্রে নাগরিকদের সেবা দিতে পারছে না। আর আমাদের যদি অন্ধ জাতীয়তাবাদ থাকত, যার বলে আমরা ভারতীয় সবকিছুকে সমর্থন করতাম, তাহলে সমাজে নৈরাশ্য সৃষ্টি হতো, ট্রাকের পেছনে যে স্লোগান লেখা থাকে ঠিক তার মতো: ১০০ জনের মধ্যে ৯৯ জনই প্রতারক, তারপরও আমার ভারত মহান। তবে সবচেয়ে বিতর্কিত ব্যাপার হচ্ছে মতভিন্নতার তৃতীয় ধারাটি, যেখানে ভারতের ধ্বংস কামনা করা হয়। এ ধরনের স্লোগান ব্যাপক সমালোচিত। এগুলোকে রাষ্ট্রদ্রোহী আখ্যা দেওয়া হয়।
কথা হচ্ছে ভারতে প্রতিবাদের ভাষার মধ্যে মৃত্যু ও ধ্বংসের কামনা রয়েছে। সেখানে ‘মুর্দাবাদ’ স্লোগানটি প্রায়ই দেওয়া হয়। আর রাজনৈতিক নেতাদের কুশপুত্তলিকাও প্রায়ই দাহ করা হয়, যেটা তাদের ধ্বংসের প্রতীক। কিন্তু তা সত্ত্বেও যাঁরা এসব করেন, তাঁদের অপরাধী সাব্যস্ত করা হয় না। নিজ দেশের ধ্বংস কি কারও কামনা করা উচিত? আবার এটা করতে গেলেও কেউ আরেকজনের চূড়ান্ত পরিণতি কামনা করে থাকে, এটা কি ঠিক? আদর্শিকভাবে এর উত্তর হবে, না। কিন্তু বাস্তব জগতে যাঁরা বারবার ভুক্তভোগী হন বা যাঁরা তাঁদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন, তাঁরা কখনো কখনো জ্বালাও-পোড়াও করার জায়গায় চলে যেতে পারেন। এমনকি সুপ্রিম কোর্টও বিভিন্ন সময় বলেছেন, মতভিন্নতার এ রকম বহিঃপ্রকাশ অবৈধ নয়।
গণতান্ত্রিক দেশে স্রেফ সরকার পছন্দ করে না বলেই মতভেদ বা বিকল্প চিন্তাকে অপরাধ হিসেবে আখ্যা দেওয়া যাবে না। রামাইয়া বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান ভালো দেশ, নরক নয়।’ তাঁর এ কথা প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকরের কথার বিপরীত। ফলে ব্যাপারটা এমন দাঁড়াল যে প্রতিবেশী দেশের প্রতি মমত্ব দেখানো রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। যে জাতি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ, তাদের দেশে বাক্স্বাধীনতা হরণ করতে পারে—এমন ঔপনিবেশিক আইন থাকা উচিত নয়। গণতান্ত্রিক সমাজের মাজেজা হচ্ছে, সেখানে মানুষের চিন্তা ও আবেগকে রুদ্ধ করা হয় না।
ভারতবাসী যদি জাতীয়তাবাদের নামে সংবেদনশীল বিষয়ের তালিকায় নতুন বিষয় যুক্ত করে, তাহলে গণতন্ত্র একসময় অর্থহীন হয়ে যাবে। কারণ, এই তালিকা লম্বা হতেই থাকবে। তার রাশ টানবে কে?
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, দ্য ওয়ার ইন থেকে নেওয়া।
অঞ্জলি ভরদ্বাজ, অমৃতা জোহরি ও শেখর সিং: ভারতীয় সমাজকর্মী।