রাষ্ট্রপতির আয়োজিত বৈঠককে গণমাধ্যম সংলাপ বলে আখ্যায়িত করলেও এটিকে সংলাপ বলা যায় না। এমনকি রাষ্ট্রপতি নিজেও আমন্ত্রণপত্রে সংলাপের কথা বলেননি, বরং তিনি ‘রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত গ্রহণের’ লক্ষ্যে তাদের সঙ্গে ‘আলোচনা’ করার ‘আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন’। সংলাপ সাধারণত অনুষ্ঠিত হয় মতবিনিময় ও ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছার লক্ষ্যে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই কোনো তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতিতে স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে ঐকমত্য বা সমাধানে পৌঁছার উদ্দেশ্যেই সংলাপের আয়োজন করা হয়। মধ্যস্থতাকারী তৃতীয় পক্ষ পৃথকভাবে একাধিকবার বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে মতবিনিময় করে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও ধারাবাহিকভাবে সংলাপ হয়। সংলাপ সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে হয় এবং সমঝোতায় না পৌঁছানো পর্যন্ত চলতে থাকে। তবে সংলাপ সব সময় সফল হয় না।

উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯৪ সালে কমনওয়েলথের সেক্রেটারি জেনারেলের প্রতিনিধি হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গভর্নর জেনারেল স্যার নিনিয়ান স্টিফেনের সহায়তায় আমাদের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে দীর্ঘ সংলাপে প্রাথমিকভাবে একধরনের সমাধানে পৌঁছালেও শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থ হয়। তেমনিভাবে ব্যর্থ হয় জাতিসংঘের মহাসচিবের প্রতিনিধি অস্কার তারানকোর সহায়তায় পরিচালিত সংলাপ; যদিও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নিয়ম রক্ষার নির্বাচনের পর সবার অংশগ্রহণে একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকার করেছিলেন, দুর্ভাগ্যবশত সে অঙ্গীকার রক্ষা করা হয়নি। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগেও প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ‘সংলাপ’ হয়, যার মাধ্যমেও একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা যায়নি।

সংলাপ দ্বিপক্ষীয়ও হতে পারে। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার আমন্ত্রণ জানান, যা খালেদা জিয়ার অসম্মতির কারণে বাস্তবে ঘটেনি। এর আগে ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলের সঙ্গে বিএনপির মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার সংলাপ জাতীয় সংসদ ভবনে বেশ কয়েক দিন ধরে অনুষ্ঠিত হয়। মধ্যস্থতাকারীবিহীন দ্বিপক্ষীয় সংলাপ সাধারণত সফল হয় না।

রাষ্ট্রপতির বর্তমান আয়োজনের লক্ষ্য রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত শুধু শোনা, একটি ঐকমত্যে উপনীত হওয়া নয়। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ফটোসেশন, চা-চক্র ও সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য প্রদান নিঃসন্দেহে এ আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণীয় দিক। তাই এটিকে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে মতবিনিময় বলাই শ্রেয়, সংলাপ নয়।

প্রসঙ্গত, রাষ্ট্রপতির এ মতবিনিময় আমাদের সংবিধানের সঙ্গে কতটা সংগতিপূর্ণ, সে বিষয়েও সন্দেহ আছে। সংবিধানে ‘আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে’ নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দেওয়ার সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে। বস্তুত, রাষ্ট্রপতির মতবিনিময়ের মূল অ্যাজেন্ডা হতে পারত নির্বাচন কমিশনে নিয়োগসংক্রান্ত আইন।

রাষ্ট্রপতির বর্তমান আয়োজনের লক্ষ্য রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত শুধু শোনা, একটি ঐকমত্যে উপনীত হওয়া নয়। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ফটোসেশন, চা-চক্র ও সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য প্রদান নিঃসন্দেহে এ আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণীয় দিক। তাই এটিকে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে মতবিনিময় বলাই শ্রেয়, সংলাপ নয়।

আমাদের সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাঁহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন।’ তাই নির্বাচন কমিশনে নিয়োগদানের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী যে পরামর্শ দেবেন, তার বাইরে একচুল পরিমাণ ব্যত্যয় ঘটানোর ক্ষমতাও রাষ্ট্রপতির নেই। অর্থাৎ অতীতের মতো পরবর্তী নির্বাচন কমিশনও গঠিত হবে প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ীই। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রপতির এ মতবিনিময়ের আয়োজন নিষ্ফল হতে বাধ্য। বস্তুত, সংলাপের নামে যা হচ্ছে, তা নিতান্তই আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।

তবে এ নিষ্ফল প্রক্রিয়ার বিষফল পরিণতিও ঘটতে পারে, যেমনিভাবে ঘটেছিল ২০১২ ও ২০১৭ সালে, রকিবউদ্দীন কমিশন ও নূরুল হুদা কমিশনকে নিয়োগ প্রদানের মাধ্যমে। এমনই মতবিনিময়ের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত এই দুই নির্বাচন কমিশন তাদের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের মাধ্যমে আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে, আমাদের ভোটাধিকার হরণ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, নির্বাচন কমিশন থেকে তথ্য অধিকার আইনের অধীনে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে প্রাপ্ত ২০১৮ সালের কেন্দ্রভিত্তিক নির্বাচনের তথ্যের বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে, ১ হাজার ১৭৭টি কেন্দ্রে বিএনপির প্রার্থী শূন্য ভোট পেয়েছেন, আওয়ামী লীগ প্রার্থীও দুটি কেন্দ্রে শূন্য ভোট পেয়েছেন। এ ছাড়া ৫৮৬টি কেন্দ্রে পড়া শতভাগ ভোটই পেয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী। একাধিক নির্বাচনী আসনে শতভাগ ভোট পড়ার তথ্যও প্রাথমিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছিল, যদিও গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তা পাল্টে ফেলা হয়। এসব অসংগতি বাস্তবে ঘটা অসম্ভব। বস্তুত, এসব ফলাফল সম্পূর্ণ বানোয়াট এবং ‘মধ্যরাতে ব্যালট বাক্স ভরারই’ ফসল। এসব নির্বাচনী এলাকার ভোট পুনর্গণনা করলেই এ জালিয়াতির প্রমাণ বেরিয়ে আসবে। এ ছাড়া ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ৫০টি আসনে গবেষণা করে মধ্যরাতের ভোটসহ নানা অনিয়মের প্রমাণ প্রকাশ করেছে।

তাই আমাদের আশঙ্কা, সেই পুরোনো প্রক্রিয়া (রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার নিষ্ফল প্রক্রিয়া) নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ–সম্পর্কিত বিরোধের সমাধানের পরিবর্তে আবারও আমাদের বিষফলই উপহার দিতে পারে। আমরা আবারও একটি পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশন পেতে পারি, যা পূর্বসূরিদেরই অনুসরণ করবে। আর এ কাজে তারা ভোটার ভেরিফায়েড পেপার অডিট ট্রেইলবিহীন (ভিভিপিএটি) একটি নিকৃষ্ট মানের ইভিএম ব্যবহার করতে পারে, যে ইভিএমে কারসাজির মাধ্যমে ফলাফল পাল্টে দেওয়া যায়। আর নির্বাচনী ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেলে সংকটে নিপতিত হতে পারি।

সর্বশেষ খবর হলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও কমিশনার নিয়োগের জন্য আইনের খসড়া গতকাল চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। আইনের খসড়ায় অনুসন্ধান (সার্চ) কমিটির মাধ্যমে সিইসি ও কমিশনার নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। ছয় সদস্যের এ অনুসন্ধান কমিটির প্রধান হিসেবে থাকবেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি।

এ ছাড়া সদস্য হিসেবে থাকবেন হাইকোর্টের একজন বিচারপতি, মহাহিসাবনিরীক্ষক, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান এবং রাষ্ট্রপতির মনোনীত দুজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন এই আইনের অধীনে হবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেছেন, ‘আশা করা যায়, এই আইন চূড়ান্ত হতে বেশি সময় লাগবে না।’

আইন করে নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবি আমরা অনেক আগে থেকে জানিয়ে এসেছি। শেষ পর্যন্ত সরকার যে আইনের খসড়া অনুমোদন করল, তা পুরোনো রীতিকেই বহাল রেখেছে। অর্থাৎ সার্চ কমিটির মাধ্যমেই নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে। সে ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের জনগণের যে আকাঙ্ক্ষা, তার প্রতিফলন হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ।

  • ড. বদিউল আলম মজুমদার সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন