আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক উপকমিটির তালিকা দেখে প্রশ্ন হচ্ছে একটি সাংবিধানিক পদে আসীন কেউ একটি দলের (বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের) কোনো পদে বহাল থাকতে পারেন কি না। এ বিষয়ে আইনি বাধা নেই, সেটা আমরা জানি কিন্তু নৈতিক বিবেচনায়, দলের সঙ্গে রাষ্ট্রের যে সীমারেখা তা বহাল রাখার বিবেচনায় এটি কি গ্রহণযোগ্য? নৈতিকতার কথাটি স্মরণ করা দরকার একাধিক কারণে। প্রথমত একজন অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে সরকার এবং দলের কী সম্পর্ক হতে পারে, তার উদাহরণ আমরা দুই দশক আগেও দেখেছি। মাহমুদুল ইসলামের একটি দিনের কথা লিখেছিলেন মিজানুর রহমান খান, ‘তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল হওয়ার পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুপ্রিম কোর্টে এসেছেন। সর্বত্র ত্রস্ত ভাব। প্রধানমন্ত্রী আসবেন বলে আদালতের প্রতিবেশী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে হাজির। কিন্তু খোদ অ্যাটর্নি জেনারেলকে দেখা গেল তাঁর প্রাত্যহিক নিয়মে কোনো পরিবর্তন নেই। তাঁকে নির্দিষ্ট সময়ে বাসায় যেতে দেখা গেল। শশব্যস্ত হয়ে কেউ জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যধারার মধ্যে এখানে তাঁর কোনো অংশগ্রহণ তিনি দেখেন না। দল এবং সরকারপ্রধানের উপস্থিতির সময়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের উপস্থিতি যে দরকার নয়, সেটা সহজে বোধগম্য। এটি আইনি বিষয় নয়, নৈতিক বিষয়। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে যে কোনো শাসন কেবল আইনি এবং সাংবিধানিক বিষয় নয়, মোরাল বা নৈতিক বিষয়ও। রাষ্ট্রকে তাঁর বৈধতার জন্যই এ নৈতিক বিষয়ে সচেতন থাকতে হয়।

অ্যাটর্নি জেনারেলের দলের কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির ঘটনা একার্থে আসলে বিস্ময়েরও নয়। কেননা গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে রাষ্ট্র এবং ক্ষমতাসীন দলকে একাকার হয়ে যেতে দেখেছি। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান এখন দলের অনুগত অংশে পরিণত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের আচরণ থেকেই আমরা তা জানি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে আইন প্রয়োগকারী বাহিনী, প্রশাসন, দল এবং নির্বাচন কমিশন এক কাতারে দাঁড়িয়েছে। চলমান স্থানীয় নির্বাচনে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। রাষ্ট্রের আর কোনো অংশই যে দলের বাইরে নেই, সাম্প্রতিক কালে বিভিন্নভাবেই তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এ নিয়ে যতই উচ্চবাচ্য করা হোক, এ বাস্তবতা উধাও হবে না। সংসদ এবং সংসদের বাইরে কার্যত যে একদলীয় ব্যবস্থা বহাল হয়েছে, তার একটা উদাহরণ হচ্ছে এ ঘটনা। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বিষয়ে জনপ্রশাসনের কর্মচারীরা যে ধরনের বক্তব্য দেন, ক্ষমতাসীন দলের হয়ে যেভাবে সভা সমাবেশ করেন, তাতে এটা পার্থক্য করা দুরূহ যে তাঁরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী না দলের নেতা। এ ধরনের কার্যক্রমে এমনকি বিচারকেরাও যে পিছিয়ে নেই, সেটা গত ডিসেম্বরে দেখা গেছে। এগুলো স্বাধীন বিচার বিভাগের ইঙ্গিত দেয় না। ঘটনাগুলোকে আলাদা করে দেখার সূযোগও নেই। এগুলো এটাই স্পষ্ট করে যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো এক নতুন রূপ নিয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক হলো বিরোধী দলগুলো তো বটেই, এমনকি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও সেই উপলব্ধি অনুপস্থিত।

আওয়ামী লীগের এ উপকমিটির সদস্যদের তালিকায় আছেন ‘শিক্ষক’ এবং ‘সাংবাদিক’। তাঁদের অধিকাংশ আগের থেকেই দলীয় পরিচয়ে পরিচিত। ফলে এটাকে নতুন ভাবার কারণ নেই। কিন্তু সাংবাদিক পরিচয়ে পরিচিতরা যখন এ তালিকাকে ‘সমৃদ্ধ’ করেন, তখন বোঝা যায় তাঁদের ভূমিকা কী। দলের তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক উপকমিটি বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ও রাষ্ট্রীয় কর্মপরিকল্পনাসমূহ বাস্তবায়ন এবং আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা টেকসই করার লক্ষ্যে দলকে তথ্য-উপাত্ত ও গবেষণাকর্মের মাধ্যমে সর্বতোভাবে সহায়তা করাই আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা উপকমিটির কাজ।’ আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা শক্তিশালী করা কি রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তার কাজ, না সাংবাদিকের?


আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন