বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রপতি যখন জাতীয় সংসদে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি পরমতসহিষ্ণুতা দেখানোর উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন, তখন আমরা বাস্তবে কী দেখছি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আন্তদলীয় সংঘাত বরাবরই ছিল। অথচ হালে আন্তদলীয় কোন্দলের চেয়ে অন্তর্দলীয় কোন্দল প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে। শীর্ষ নেতৃত্বের হুঁশিয়ারি, সমন জারি, বহিষ্কারাদেশ কিছুই অন্তর্দলীয় সংঘাত থামাতে পারছে না। চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের মধ্যে যে প্রাণঘাতী লড়াই চলছে, তাকে মধ্যযুগের গোত্রবিবাদের সঙ্গে তুলনা করলেও ভুল হবে না।

এর অর্থ আওয়ামী লীগ গঠনতন্ত্র নির্দেশিত পথে চলছে না। আওয়ামী লীগ সঠিক পথে না চললে সরকারও ভুল পথে চালিত হবে। সাংসদেরা রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা শুরু করেছেন। বিরোধী বিএনপির সাংসদদের কথা সরকার ধর্তব্যের মধ্যেই হয়তো নেবে না। কিন্তু সরকারের নির্বাচনী জোটসঙ্গী জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের নেতারা দেশের যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তা খুবই হতাশাজনক। তাঁরা গণমাধ্যমকে স্বাধীনতা দেওয়ার কথা বলেছেন। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। রাজনীতি রাজনীতিকদের হাতে নেই বলে আক্ষেপ করেছেন। মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানে উদ্বিগ্ন হয়েছেন। তাহলে একটানা ১৩ বছর আওয়ামী লীগ শাসনের অর্জনটা কী?

হাফ পাসের দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামল, সড়ক অবরোধ করল। পরিবহনশ্রমিকদের সঙ্গে কোথাও কোথাও তাদের অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটল। এরই মধ্যে সরকার সমর্থক ছাত্রলীগের কর্মীরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালালেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময়ও ছাত্রলীগ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করেছিল।

আমাদের মন্ত্রী-সাংসদেরা যখন স্বাধীনতার ৫০ বছরের অর্জন–অনার্জন নিয়ে কথা বলছেন, তখন শিক্ষার্থীরা রাজপথে আন্দোলন করছেন গণপরিবহনে হাফ পাসের দাবিতে। উনসত্তরে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা দাবিতে যে গণ-অভ্যুত্থান গড়ে তোলে, তার অন্যতম দাবি ছিল বাস, ট্রেন, লঞ্চ, স্টিমারে হাফ পাস চালু করা। পাকিস্তান সরকার ছাত্রদের দাবি মেনে নিয়েছিল। স্বাধীনতার পরও অনেক গণপরিবহনে শিক্ষার্থীরা সেই সুবিধা পেতেন। কিন্তু এবার পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর পর বাসমালিকেরা বেঁকে বসলেন, বললেন হাফ পাস দেওয়া যাবে না। হাফ পাস দিলে তঁাদের লোকসান হবে। এমনকি গত বৃহস্পতিবার বিআরটিএর সঙ্গে বৈঠকে তঁারা হুমকি দিয়েছেন, হাফ পাস চাপিয়ে দেওয়া হলে ধর্মঘটে যাবেন। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যখন রাজপথে আন্দোলন করছে, তখন গতকাল পর্যন্ত কোনো মন্ত্রী মালিকদের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন বোধ করেননি। এতে বোঝা যায়, সরকার বিষয়টি কত লঘুভাবে দেখছে।

হাফ পাসের দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামল, সড়ক অবরোধ করল। পরিবহনশ্রমিকদের সঙ্গে কোথাও কোথাও তাদের অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটল। এরই মধ্যে সরকার সমর্থক ছাত্রলীগের কর্মীরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালালেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময়ও ছাত্রলীগ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করেছিল। ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময়ও দেখেছি, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের হামলার শিকার হয়েছে।

ছাত্রদের হাফ পাস আন্দোলন চলাকালেই ঢাকায় আরেক আন্দোলন শুরু হয়েছে গত বুধবার; নিরাপদ সড়কের দাবিতে। ওই দিন দুপুরে নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান যখন গুলিস্তান হলের সামনের সড়ক পার হচ্ছিল, তখন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একটি ময়লার গাড়ি তাকে চাপা দেয়। প্রথমে নটর ডেমে নাঈমের সতীর্থরা এবং পরে ঢাকার বিভিন্ন কলেজ ও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে। তারা সরকারের কাছে ছয় দফা দাবি পেশ করেছে, যার মধ্যে নাঈমের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর করার কথাও আছে।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে ৩১ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে দুই কলেজশিক্ষার্থীকে একটি বাস চাপা দিলে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে এবং ৯ দিনের জন্য তারা ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরের যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করেছিল। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই সরকার দ্রুত সড়ক পরবহন আইন পাস করে। কিন্তু পরিবহন মালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠনের চাপে সরকার সেই আইন বাস্তবায়ন করেনি।

সড়কে কেউ আইন মানে না, যেন সবাই রাজা। যে যেভাবে পারছেন গাড়ি চালাচ্ছেন, ওভারটেক করছেন। আর ওভারটেক করার ঘটনা কেবল সড়কেই ঘটছে না। রাষ্ট্রের সবখানেই ওভারটেকের ঘটনা ঘটছে। নির্বাচনে ওভারটেক, পরীক্ষার ফলে ওভারটেক, চাকরির পদোন্নতিতে ওভারটেক, রাজনীতিতে ওভারটেক।

নাঈম হত্যার এক দিন পর গত বৃহস্পতিবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আরেকটি ময়লার গাড়ি আহসান কবীর খান নামের এক সংবাদকর্মীকে চাপা দেয়। তিনি ছিলেন প্রথম আলোর সাবেক কর্মী। এক ঢাকা সিটি করপোরেশন ভেঙে সরকার দুই সিটি করপোরেশন করেছে। দুই সিটি করপোরেশনের নাগরিকদের সেবা না দিয়ে এখন ময়লার গাড়ির নিচে চাপা দিয়ে মানুষ মারছে।

কেবল ঢাকা নয়, সারা দেশেই সড়কগুলো মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। বৃহস্পতিবার সড়কে ঝরেছে আরও চার শিক্ষার্থীর প্রাণ। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের মাস্টার্স পরীক্ষার্থী ঊর্মি মজুমদার, সাদ্দাম হোসেন ও চাঁদপুর সরকারি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী রিফাত হোসেন কচুয়া বাইপাস থেকে অটোরিকশায় যাচ্ছিলেন হাজীগঞ্জ। বিপরীত দিক থেকে আসা বিআরটিসির বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে তাঁরা নিহত যান। একই দিন উত্তরায় মারা যান ইউসুফ মিয়া নামের আরেক শিক্ষার্থী, তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালাতেন। কামরাঙ্গীরচর থেকে বাসে-রিকশায়-হেঁটে নটর ডেম কলেজে যাওয়া শিক্ষার্থী নাঈম হাসান কিংবা অনার্স প্রথম বর্ষের যে শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি ভাড়ায় বাইক চালিয়ে সংসারের খরচ নির্বাহ করতেন, তঁাদের কাছে সরকারের উন্নয়নের গল্প পৌঁছায়নি। দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে, তবে কতিপয় মানুষের। বাকিরা দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত।

সড়কে কেউ আইন মানে না, যেন সবাই রাজা। যে যেভাবে পারছেন গাড়ি চালাচ্ছেন, ওভারটেক করছেন। আর ওভারটেক করার ঘটনা কেবল সড়কেই ঘটছে না। রাষ্ট্রের সবখানেই ওভারটেকের ঘটনা ঘটছে। নির্বাচনে ওভারটেক, পরীক্ষার ফলে ওভারটেক, চাকরির পদোন্নতিতে ওভারটেক, রাজনীতিতে ওভারটেক। সারা জীবন রাজনীতি করে, জেল-জুলুম সহ্য করেও অনেকে দলের মনোনয়ন পান না। আবার উড়ে এসে কেউ টাকা ও ক্ষমতার জোরে নেতা-সাংসদ এমনকি মন্ত্রীও হয়ে যান।

মানুষের চলাচলের জন্য যেমন নিরাপদ সড়ক দরকার, তেমনি রাষ্ট্রের চলার জন্যও একটি নির্বিঘ্ন পথ থাকা দরকার। সেটা হলো সংবিধানে বর্ণিত গণতন্ত্রের পথ, ন্যায়বিচারের পথ। আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও সেই সড়ক নির্মাণ করতে পারিনি। রাষ্ট্রপতির ভাষণে কিছুটা হলেও সেই সত্য বেরিয়ে এসেছে। রাষ্ট্র ঠিক না থাকলে সড়ক ঠিক থাকবে কীভাবে?

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন