বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে টিকা আমদানি বা তৈরির আর্থিক সক্ষমতা আমাদের আছে। তাই টিকা আমদানি হোক আর দেশে তৈরি হোক, এ ক্ষেত্রে আমরা সফল হব, এটা ভাবা অমূলক নয়। আবার টিকা নিবন্ধন ও তা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও আমরা যথেষ্ট সক্ষমতা অর্জন করেছি। আমরা যারা কোভিড টিকা গ্রহণের সুযোগ পেয়েছি, তারা নিশ্চয়ই টিকাদান প্রক্রিয়ার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় যথেষ্ট সন্তুষ্ট। আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রথম এবং দ্বিতীয় ডোজ টিকা গ্রহণ করেছি। প্রতিবারই আমার সামগ্রিক সন্তুষ্টির মাত্রা এক শ–তে এক শ। শুধু তা-ই নয়, টিকা ব্যবস্থাপনার এ অভিজ্ঞতা হাসপাতালের অন্যান্য সেবার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আমাদের যত অভিযোগ, তা দূর হয়ে যাবে। আশা করি নীতিনির্ধারণী মহল এ অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবে।

আমরা আশাবাদী কোভিড মহামারি হয়তো একদিন শেষ হবে। পৃথিবী হয়তো আবার হাসবে। কোমলমতি সোনামণিরা স্কুলের অঙ্গন মুখরিত করবে। কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চাঞ্চল্য ফিরে আসবে। যুবকেরা বাঁচার আশা খুঁজে পাবেন। বৃদ্ধরা তো হাঁপ ছেড়ে বলবেন, আর কয়েকটা দিন হয়তো বেঁচে থাকা যাবে। হাসপাতালে আইসিইউতে একাকী মরতে হবে না। আর মরে গেলেও দাফন-কাফন বা সৎকারে কেউ মুখ ফিরিয়ে নেবে না। সর্বোপরি মানুষ আবার প্রাণ খুলে হাসতে পারবে এবং বন্ধনমুক্ত জীবনযাপনে ফিরে যাবে।

দেশমাতৃকার কপালের কালো ভাঁজ আজ স্পষ্ট। কারণ, দেশমাতৃকার এখন চিন্তা তঁার যে সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তানেরা জীবন এবং ইজ্জতের বিনিময়ে একাত্তরে তঁার মাথায় স্বাধীনতার সোনালি মুকুট পরালেন, তাঁদের কাছে কী জবাব দেবেন। তাঁরা যদি জিজ্ঞেস করেন, ‘যে অন্যায়, অবিচার, শোষণ, নির্যাতন, কর্মহীনতা ও বাক্‌স্বাধীনতার কণ্ঠরোধ থেকে মুক্তি দেওয়ার তরে তোমাকে স্বাধীনতার এই মহামূল্যবান মুকুট পরালাম, সেগুলো কেন আবার শত গুণে বৃদ্ধি পেয়ে ফিরে এল?’ তাঁরা যদি এ-ও জিজ্ঞেস করেন, ‘কেন ধর্ষণ ও হত্যার সংস্কৃতি ফিরে এল?’ দেশমাতৃকার কাছে এসব প্রশ্নের জবাব নেই। আর দেশমাতৃকা হয়তো কখনোই ভাবেননি তাঁর কুলাঙ্গার সন্তানদের অপকর্মের জন্য শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জীবন দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে। তাই দেশমাতৃকা আজ হয়তো আত্মবিলাপ করে বলছেন, ‘কেন আমার এই দুর্ভাগ্য? যে সূর্যসন্তানেরা আমাকে জীবন দিয়ে, ইজ্জত দিয়ে এত মহিমান্বিত করল, যা পৃথিবীতে অনেক জাতির কপালে এখনো জোটেনি, তাদের উত্তরসূরিরা কেন আমাকে কলঙ্কিত করছে?’ দেশ যখন মেট্রোরেল এবং পদ্মা সেতু চালুর অভাবনীয় যুগে প্রবেশ করছে, সেই মুহূর্তে দেশমাতার খুশি ও সম্মানিত হওয়ার বদলে তাঁর এই আত্মবিলাপ নিশ্চয়ই কারও জন্য শুভ নয়।

তাই কোভিড প্রতিরোধের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনের সর্বস্তরে এ অযোগ্যতা ও রেষারেষি বন্ধের টিকা প্রয়োগ জাতির জন্য অতীব প্রয়োজন। আর এ টিকা তৈরির ফর্মুলা ও কৌশল আমাদের সবারই জানা। এর প্রথম ধাপ হলো কেবল যোগ্যতাকেই সব সরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে বড়-ছোট সব পদে নিয়োগের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয় ধাপ হলো প্রমোশন ও পদায়নের ক্ষেত্রে সততা, দক্ষতা এবং দেশপ্রেমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া, কোনো সিন্ডিকেট চক্রের প্রভাব বা রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিকে নয়। তৃতীয় ধাপ হলো কোনো কাজের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তানো, অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর নয়।

অযোগ্যতা ও রেষারেষির জগদ্দল পাথর সরাতে জাতি হিসেবে এটি ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই। আজ যাঁরা ক্ষমতাবলয়ের বাইরে আছেন, ক্ষমতায় এলে তাঁদেরও একই পন্থা অবলম্বন ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই

তবে তার আগে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা দরকার। আর ডেপুটেশন কালচার এবং মিটিংয়ে উপস্থিতির প্রদেয় ভাতা (খামপ্রথা) বন্ধ করা। এ ফর্মুলার কোনো মেধাস্বত্ব বা কপিরাইট নেই। তাই এ ফর্মুলা প্রয়োগে কোনো আইনি বাধাও নেই। বরং এ ফর্মুলা প্রয়োগে দেশের প্রচলিত আইনের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে এ টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, অর্থাৎ দেশে এর প্রচলন শুরু করা। কেননা, এ টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সময় স্বার্থান্বেষী গ্রুপের ভেতর যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়া হবে, তা ব্যবস্থাপনার জন্য অপরিমেয় প্রজ্ঞা, অসমসাহস এবং একচ্ছত্র রাজনৈতিক শক্তি থাকা প্রয়োজন।

আমরা মনে করি, এসব কার্যকর করার সক্ষমতা সরকারের রয়েছে। আর অযোগ্যতা ও রেষারেষি বন্ধের টিকার ব্যাপকভিত্তিক প্রয়োগের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক মহলসহ সব দেশপ্রেমী ব্যক্তির নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে আসা। অযোগ্যতা ও রেষারেষির জগদ্দল পাথর সরাতে জাতি হিসেবে এটি ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই। আজ যাঁরা ক্ষমতাবলয়ের বাইরে আছেন, ক্ষমতায় এলে তাঁদেরও একই পন্থা অবলম্বন ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।

তাই আসুন, আমরা সবাই অযোগ্যতা ও রেষারেষি বন্ধের টিকার সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়ে দেশমাতৃকার মুখে আবারও হাসি ফোটাই।

ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন