বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সমাজ প্রগতির লক্ষ্যে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ভূমিকা অনন্য অভিযাত্রীর। তাঁর সমগ্র জীবনই ‘আন্দোলনের প্রতিষ্ঠান’রূপে সর্বজনীন স্বীকৃতি পেয়েছে। সামাজিক-সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক-মানবাধিকার আন্দোলনের ক্ষেত্রে তিনি কাজের অভিন্ন প্রেক্ষাপট তৈরি করেছেন। তাঁর জীবনের এক ও অদ্বিতীয় সংগ্রাম ছিল মানবাধিকার অর্জন বাস্তবায়ন করা। সেই লক্ষ্যে নিরলস কাজ করেছেন। নারীশিক্ষার প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনা; ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা, সাহিত্যচর্চা ও সাধনা, ভোটাধিকার অর্জনের কমিটিতে যুক্ত হয়ে কাজ করা ছিল তাঁর জীবনসাধনার সাফল্য।

নারীর ভোটাধিকারের দাবি পেশ করেছেন তিনি ইংরেজ সরকার বা মন্টেগু-চেমসফোর্ড কমিটির কাছে। জীবনের সব অভিজ্ঞতার সূত্রে রোকেয়ার কর্মসাধনার মূল ব্রত হিসেবে উৎসারিত হয়েছে শিক্ষা আন্দোলন। মুক্তি পেতে হলে অবরোধবাসিনীকে শিক্ষা অর্জন করতে হবে—এই লক্ষ্য থেকে তিনি সবার উদ্দেশে লিখেছিলেন: ‘কন্যাগুলিকে সুশিক্ষিত করিয়া কার্যক্ষেত্রে ছাড়িয়া দাও, নিজের অন্নবস্ত্র উপার্জন করুক।’ বিভিন্ন সময়ে তিনি বারবার বলেছেন: শিক্ষা ছাড়া ব্যক্তিত্বের বিকাশ সম্ভব নয়; আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিষয়ে মানুষ ও সমাজের ক্রমবিকাশ বিষয়ে নারী-পুরুষ সবাইকে জানতে হবে। নারীর স্বাধিকারবিরোধী ব্যবস্থাপত্র পুরুষের সুখ-সুবিধার দিকে তাকিয়েই রচিত হয়েছিল বলে আজীবন তিনি স্থির নিশ্চিত ছিলেন।

সমাজ প্রগতির লক্ষ্যে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ভূমিকা অনন্য অভিযাত্রীর। তাঁর সমগ্র জীবনই ‘আন্দোলনের প্রতিষ্ঠান’রূপে সর্বজনীন স্বীকৃতি পেয়েছে। সামাজিক-সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক-মানবাধিকার আন্দোলনের ক্ষেত্রে তিনি কাজের অভিন্ন প্রেক্ষাপট তৈরি করেছেন। তাঁর জীবনের এক ও অদ্বিতীয় সংগ্রাম ছিল মানবাধিকার অর্জন বাস্তবায়ন করা। সেই লক্ষ্যে নিরলস কাজ করেছেন।

‘স্ত্রীজাতির অবনতি’ প্রবন্ধে রোকেয়া বলেছেন, ‘অশিক্ষিত স্ত্রীলোকের দোষ সমাজ অম্লান বদনে ক্ষমা করিয়া থাকে। কিন্তু সামান্য শিক্ষাপ্রাপ্ত মহিলা কোনো দোষ না করিলেও সমাজ কোনো কল্পিত দোষ শতগুণ বাড়াইয়া—ওই “শিক্ষার” ঘাড়ে চাপাইয়া দেয়।’...

তিনি বলেছেন যে ‘সক্ষমতা’ ও ‘সমকক্ষতা’ অর্জনের পূর্বশর্ত ‘শিক্ষা’। তিনি জীবনভর বলেছেন, লিখেছেন, প্রচার করেছেন যে ছেলেদের মতো মেয়েদেরও শিক্ষার সমসুযোগ দেওয়ার দায়িত্ব অভিভাবক ও রাষ্ট্রের। ছেলে ও মেয়েকে সমদৃষ্টিতে দেখার জন্য তিনি সারা জীবন আন্দোলন করেছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন ১৯১৬ সালে কলকাতায় তাঁর কর্মস্থলে ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম’ নামে নারী সমিতি। সামাজিকভাবে লাঞ্ছিত, নিপীড়িত নারী ও শিশুর সাহায্যে, নারীশিক্ষার প্রসারে, নারীকে অবরোধ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে এই সংগঠন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। অবরোধের বাধা দূর করে সমাজের কাজে নারীদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য তিনি তৎপর ছিলেন।

রোকেয়া লিখেছেন, বক্তব্য দিয়েছেন সভা-সমিতিতে, ‘যদি সমাজের কাজ করিতে চাও, তবে গায়ের চামড়াকে এতখানি পুরু করিয়া লইতে হইবে, যেন নিন্দা-গ্লানি, উপেক্ষা-অপমান কিছুই তাহাকে আঘাত করিতে না পারে; মাথার খুলিকে এমন মজবুত করিয়া লইতে হইবে, যেন ঝড়-ঝঞ্ঝা, বজ্রবিদ্যুৎ সকলই তাহাতে প্রতিহত হইয়া ফিরিয়া আসে।’

নারী জাগরণের কর্মী প্রেরণাদাতা ও অবিসংবাদী নেত্রী রোকেয়া নিজে অবরোধের যন্ত্রণা ভোগ করেছিলেন, নারীর মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হতে দেখেছিলেন। তাঁর বক্তব্যে, বিভিন্ন লেখায় দুঃখ করে, প্রতিবাদ করে বলেছেন যে দাস ব্যবসা নিষিদ্ধ হলেও ঘরে ঘরে নারীদের অবস্থা ক্রীতদাসীদের থেকে কোনো অবস্থায় ভালো নয়; দাসরা তবু তো মুক্তির স্বপ্ন দেখেন কিন্তু নারীসমাজ সেই স্বপ্ন দেখার কথা ভাবতেও পারে না—এমন জড়ত্বপ্রাপ্ত হয়েছে তারা। তিনি বলেছেন, লিখেছেন যে মেয়েদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার মূল বাধা রয়েছে সমাজের প্রচলিত ব্যবস্থার মধ্যে।

‘স্ত্রীজাতির অবনতি’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন:

‘যদি এখন স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জন করিলে স্বাধীনতা লাভ হয় তবে তাহাই করিব। উপার্জন করিব না কেন? আমাদের কি হাত নাই, না পা নাই, না বুদ্ধি নাই? যে পরিশ্রম আমরা স্বামীর গৃহকার্যে ব্যবহার করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা কি স্বাধীন ব্যবসায় করিতে পারিব না?’ কৃষিকাজ ও ব্যবসাকে মেয়েদের ব্যবসা হিসেবে গ্রহণের জন্য রোকেয়া বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

অবরোধবাসিনী বইয়ে তিনি লিখেছেন:

‘কাব্য উপন্যাস নহে, এমন জীবন

নাট্যশালা নহে, ইহা প্রকৃতভবন।

অবরোধবাসিনীদের পক্ষ হইতে

বলিতে ইচ্ছা করিল,

কেন আসিলাম হায়! এ পোড়া সংসারে,

কেন জন্ম লভিলাম পর্দানশীন ঘরে।’

তাঁর মাত্র ৫২ বছরের জীবনের পুরো সময়টুকুই ছিল সংগ্রামমুখর। বাংলা, ইংরেজি ও উর্দু—এই তিন ভাষাতেই তিনি সুশিক্ষিত ছিলেন। সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে, সভা-সংগঠনে, ভাষণ ও আলোচনায়, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথাবার্তায় এবং চিঠি লেখার সময় তিনি ব্যবহার করেছেন উল্লিখিত তিন ভাষা। তিনি নিজের বই সুলতানাস ড্রিম অনুবাদ করেছেন নিজেই। বাংলায় শিরোনাম দিয়েছেন সুলতানার স্বপ্ন। মিস মেরি করেলি রচিত মার্ডার অব ডেলিশিয়ার ভাবানুবাদ করে লিখেছেন ডেলিশিয়া হত্যা

তাঁর জীবনী পাঠে আমরা জানতে পারি পারিবারিক-বিবাহিত জীবনসঙ্গী সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন (১৮৫৮-১৯০৯) ছিলেন রোকেয়ার প্রগতিবাদী জীবনসংগ্রামের সহযোদ্ধা, সমর্থক ও উৎসাহদাতা। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন শুধু বাংলাদেশের নারী-মানবাধিকার আন্দোলনেরই আদর্শিক নেত্রী নন, বিশ্ব পরিসরেও যাঁরা নারীবাদী তাত্ত্বিক ও সক্রিয়তাবাদী, তাঁদের সমসারিতেই তাঁর অবস্থান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের চিন্তাচেতনা ও নারীমুক্তি আন্দোলনের দর্শন শতাব্দী পেরিয়ে আজও বিশ্বের নারীসমাজের সমানাধিকারের আন্দোলন ও নারীবাদী দর্শনের সমপর্যায়ে উন্নীত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশের সব সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে রোকেয়ার রচনা আজ পাঠ্য। নারী আন্দোলনের সনদ বা ঘোষণাপত্র হয়ে উঠেছে রোকেয়ার রচনাবলি। সেই রচনাগুলোই রোকেয়ার লড়াই ও জীবনদর্শন, যা সাম্প্রতিক কালেও প্রাসঙ্গিক বলেই স্বীকৃত।

  • মালেকা বেগম অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সোশিওলজি অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন