default-image

লকডাউনে রাস্তা খাঁ খাঁ। মিনিট দশেক দাঁড়িয়ে আছি মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে বিশ্বরোডে, লোহার ফুটওভার ব্রিজটার নিচে। যাব মালিবাগ রেলগেটে। রিকশা যায়, রিকশা আসে। কিন্তু সবই ‘ভরা’। খালি আর আসে না। যা–ও দু–একটা আসে, তাদের যেই বলি, ‘এই....মালিবাগ রেলগেট?’ রিকশাওয়ালারা না সূচক মাথা দোলাতে দোলাতে দ্রুত প্যাডেল মেরে চলে যান।

‘মামা, মালিবাগ যাইবেন?’—একটা চিকন শিশুতোষ গলা শুনে পেছনে তাকালাম। দেখি ঠিক পেছনে আমার প্রায় গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে একটা ছেলে। বয়স ১১ বা বড়জোর ১২ বছর। ন্যাকড়ার মতো একটা জামা পরা। হাফপ্যান্টের অবস্থাও তাই। খালি পা। লিকলিকে ছোট্ট শরীর। হাফশার্টের হাতা এবং হাফপ্যান্টের বাইরে থাকা পা ময়লার আস্তরণে মেটে রং ধরেছে। চুল স্টাইল করে ছাটা। সামনের দিকের বড় চুলগুলোতে ব্রাউন কালার করা। বোঝা যাচ্ছে অনেক দিন তার গোসল করা হয়নি। অথচ তার সেই ধুলো–মলিন চেহারার মধ্যে মায়াবী একটা কিছু আছে। তার চিক চিক করা উজ্জ্বল চোখের দিকে চাইলাম।
‘—হ, মালিবাগ যাব। তুই কই যাবি?’ আমি এমনভাবে বললাম, যেন সে আমার বহুদিনের দোস্ত।
সে হাসি হাসি মুখে বলল, ‘আমি তো যামু খিলগাঁও তালতলা মার্কেট।’ হাসির সঙ্গে হলদেটে দাঁতগুলো বের হয়ে এল। নিচের পাটির একটা দাঁতের অর্ধেকটা ভাঙা।
—কেমনে যাবি? বাস নাই, টেম্পু-মেম্পুও তো নাই!
—আপনে রিকশায় যাইবেন না? আমারে লইয়েন। খিলগাঁও রেলগেডে ছাইড়া দিয়েন। উহান থন হাইট্যা যামু গা।
—ওকে, ডান! একটা খালি পাইলে ঠ্যাকা।

বিজ্ঞাপন

মিনিট পাঁচেক পরে খালি রিকশা পাওয়া গেল। রিকশাওয়ালা প্রথমে যেতে চাইলেন না। বললেন, পুলিশে ধরবে। তাঁকে পুলিশসংক্রান্ত ঝামেলায় পড়তে হবে না, আশ্বস্ত করার পর তিনি রাজি হলেন। আমার পাশে ছেলেটা অতি সহজ এবং জড়তাহীন ভঙ্গিতে বসল। রিকশা চলতে লাগল। এবার আলাপের পালা। আলাপের আদিতে হলো নাম।
‘কী নাম রে তোর, বাজান?’ জিজ্ঞেস করতেই সে খুব মিষ্টি করে হাসল। বলল, ‘আমার দুইডি নাম। কুনডি কমু।’
—দুইডাই ক।
—একডি নাম ‘হজরত’। আরেকডি অইলো ‘চকলেট বয়’।
আমি ফিক করে হেসে ফেললাম।
—চকলেট বয় নামটা কি তুই নিজেই লাগাইছিস?
সে–ও শব্দ করে হাসল। বলল, ‘হ, ধইরা ফেললেন কেমনে?’
—আন্দাজে ধরছি। আমি তোরে কী কমু, বাপ? হজরত, নাকি চকলেট বয়?
—চকলেট বয় কন।
—ওকে, চকলেট বয়, তোর বাসা কই?
—বাসা নাইক্যাহ্।
নিচের ঠোঁট উল্টিয়ে চকলেট বয় এমনভাবে কথাটা বলল, যেন মানুষের পক্ষে বাসা থাকার মতো গ্লানিকর বিষয় আর নেই।

ফাঁকা রাস্তায় রিকশা চলছে। বাসাবোর কাছাকাছি আসতে আসতে যতটুকু জানা গেল, তা হচ্ছে চকলেট বয়ের মা কবে মারা গেছে, সেটা সে নিজেও বলতে পারে না। তার বাবা আবার বিয়ে করেছে কবে, সেটাও সে বলতে পারে না। তবে সৎমা তাকে ঘর থেকে কবে বের করে দিয়েছে, সেটা তার মনে আছে। সেটা হলো, ‘ম্যালাদিন আগে’। এখন তার ‘বিশ্বজোড়া’ ঘর। ক্ষুধা লাগলে লোকের কাছে চায়। তারাই খেতে দেয়। যেখানে রাত হয়, সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ে। কখনো থাকে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া। কখনো কমলাপুর রেলস্টেশনে। কখনো খিলগাঁও তালতলা মার্কেটে। সে ট্রেনে চড়া চট্টগ্রামেও যায়। কয়েক দিন থেকে আবার চলে আসে। তার সবচেয়ে পছন্দ হয়েছে বরিশাল শহর। জিজ্ঞেস করলাম, ‘বরিশাল কেমনে গেলি?’
সে বলল, ‘এইডা কুনো ব্যাপার? সদরঘাডে লঞ্চে ডাইরেক বরিশাল। বরিশালে সবচাইতে মজা।’
—মজা ক্যান? কী আছে বরিশালে?
—এই যে মুনে করেন হাউস মিডায়া গুসুল করন যায়। লঞ্চগুলান যহন দাঁড়ায় থাহে তহন মুনে করেন, লঞ্চের ছাদের থিকা নদীর মাইদ্যে লাফায়া পড়া যায়। কিন্তুক এই লকডাউন সব শ্যাষ কইর‍্যা ফালাইলো।
—ক্যান, তোর শ্যাষ হওয়ার কী আছে? তোর তো যেহানে রাইত সেহানে কাইত। খাবার চাইলে লোকজন দেয় না?

বিজ্ঞাপন

চকলেট বয় এবার দুই হাতের আঙুলগুলো একটার মধ্যে আরেকটা ঢুকিয়ে টক শোর বুদ্ধিজীবীদের মতো আলতো করে চাপ দিতে দিতে বলল, ‘হুটেল মুটেল খোলা নাই। খাওয়াও নাই। কুত্তাগুলানের কষ্ট আমগো চাইতে বেশি। অরা এক্কেরে না খায়া আছে। হুটেল খোলা থাকলে খাওয়া চাইলে মানুষ খাওয়া দেয়। ট্যাকা চাইলে দেয় না। ভাবে ট্যাকা দিয়ে ড্যান্ডি (নেশার দ্রব্য বিশেষ) খামু। বাস নাই, ট্রেন নাই, লঞ্চ নাই যে চিটাগাং, বরিশাল যামু। কুনোহানে লরবার পারি না।

রিকশা খিলগাঁও ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে চলছে। সড়ক বিভাজকের ওপর চকলেট বয়ের চেয়ে বয়সে বড় কয়েকজন শুয়ে আছে। তাদের দিকে হাত তুলে চকলেট বয় হাত নাড়ল। তারাও হাত নাড়ল।
—অগো তুই চিনিস নাকি?
—হ, চিনি তো। একলগে থাহি।
—ওরা কী করে?
—কেউ ভিক্ষা করে, কেউ পেলাস্টিক টুকায়। কিন্তুক হগলতেরই অহন রুজি বন্ধ। সেই কারণে সবগুলা দেহেন না দাঁত কেটকি মাইরা শুইয়া আছে! ভবিষ্যৎ যে কী আছে আল্লায় জানে। এই ভুয়া লকডাউন যে কেডায় দিল!

দশ বছর বয়সী চকলেট বয়ের মুখের এমন ভারী ভারী কথায় আমার মুখে হাসি আসতে গিয়েও থেমে গেল। কারণ, তার চেহারায় সত্যিকারের উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার ছায়া ততক্ষণে ফুটে উঠেছে। বললাম, ‘ক্যান? লকডাউনরে ভুয়া কইলি ক্যান?’
—দ্যাহেন না? কামকাজ নাই, রিশকাগুলানরে উল্টায়া ফালায়া রাখতাছে। কিছু কইলে পুলিশ মারতাছে। দ্যাহেন পেরাইবেট গাড়ি-গুড়ি আবার ঠিকই চলতাছে। পুলিশ অগো কিছু কয় না। ধরলে সবডিরে ধরুক, ধরে খালি গরিবরে! কাইল এক রিকশাআলারে এক পুলিশ পিডাইতেছে দেইখ্যা আমি দূর থেইকা পুলিশরে এট্টা ভ্যাঙানি দিছিলাম। পরে আমারে দুইজন পুলিশ ধাওয়ায়ে ধইরা মাইর দিছে। এই দেহেন. .
চকলেট বয় তার জামা ওল্টালো। পিঠে মারের দাগ। লাঠির দাগ।
একরত্তি ছেলেটার সারা মুখে ক্ষোভের মেঘ নেমে এসেছে। ততক্ষণে রিকশা খিলগাঁও রেলগেট এসে গেছে।

২.
দুদিন আগে ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও চিত্রে আরেক ‘চকলেট বয়’কে দেখলাম। সেখানে একটি বেসরকারি টেলিভিশন কিংবা কোনো অনলাইন পত্রিকার একটি লাইভ অনুষ্ঠানে রিপোর্টার বুম হাতে ধারাভাষ্য দিচ্ছিলেন। আচমকা ফ্রেমে ঢুকে পড়ে এক পথশিশু। রিপোর্টার কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে বলতে থাকে, ‘আচ্ছা, এই যে লকডাউন দিয়েছে, সামনে ঈদ, মানুষ খাবে কী? মাননীয় মন্ত্রী যে লকডাউন দিয়েছে,....এটা একটা ভুয়া। থ্যাংক ইউ।’ ছেলেটির সাবলীলভাবে কথাগুলো বলা ও স্মার্টলি ফ্রেম থেকে বেরিয়ে যাওয়া দেখে হতভম্ব হয়ে গেছি। গতকাল ফেসবুকে তার ফোলা মুখের ছবি ভেসে বেড়িয়েছে। বলা হচ্ছে, এই পথশিশুর নাম মারুফ। লাইভের ওই অনুষ্ঠানে ঢুকে ওই কথা বলায় তাকে বেধড়ক পেটানো হয়েছে। মূলধারার কোনো সংবাদমাধ্যম অবশ্য এ খবরের সত্যতা এখনো নিশ্চিত করেনি।

লকডাউন নিয়ে এই পথশিশু আর সেই চকলেট বয়ের ভাষ্য এবং দুজনের গায়ের মারের দাগে এত মিল কী করে এল কে জানে!

সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
[email protected]

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন