default-image

পাড়াগাঁয়ে নানান কেলাসের মাতবর আছে। তার মধ্যে এক কিসিমের মাতবরের নাম ‘চুটকা মাতুব্বর’। এই মাতুব্বরের লিডারশিপ মারাত্মক। এরা এমনিতে পটকা, কিন্তু আওয়াজ করে অ্যাটম বোমা বরাবর। ধরুন, কারও সঙ্গে কারও ঝগড়া লাগল, হাতাহাতি শুরু হলো, লোকজন জড়ো হয়ে গেল। ১০ মিনিটের মধ্যে সেখানে মিনিমাম একজন চুটকা মাতুব্বর উদিত হবে। সেখানে এসে প্রথমেই সে তার মহান উপস্থিতি ঘোষণাসূচক বিরাট একটি কাশি দেবে। তারপর সবার উদ্দেশে বলবে, ‘অ্যাই, সর তোরা! পাতলা হ! আমি দেখতেছি!’

এই ‘আমি দেখতেছি’ কথাটাই হলো চুটকা মাতুব্বরদের আসল কথা। ‘খুব খিয়াল কৈরে’ দেখলে বোঝা যাবে ‘আমি দেখতেছি’ শব্দটার মধ্য দিয়ে সে বুঝিয়ে দেয় সে যদু-মধু না, সে কেষ্ট-বিষ্টু গোছের কেউ। এর মধ্য দিয়েই সে মাইক ছাড়াই অমায়িক গলায় নিজেদের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের ঘোষণা দিয়ে দেয়। ‘আমি দেখতেছি’ শুনে জটলা বাঁধা লোকদের সবাই আন্দাজ করে সে ‘দেখলেই’ যত বড় ঝামেলা হোক মিটে যাবে, যত বড় প্যাঁচ বাঁধুক তা ছাড়ানো যাবে। শেষমেশ দেখা যায়, সে প্যাঁচটাকে আরও পেঁচিয়ে একেবারে ‘বিষ গিরে’ দিয়ে ফেলেছে।

বিজ্ঞাপন

মূলত সামাজিক অনুশাসন ও আদবকায়দা মেইনটেইন করার গুরুভার কে বা কারা এই মাতুব্বরদের হাতে দিয়ে থাকেন। এরা নরম-সরম কাউকে পেলেই বিনে পয়সায় জ্ঞান দিয়ে থাকে। রাস্তাঘাট দিয়ে চলার সময় নিরীহ গোছের কে কে তাদের আদাব-সালাম দিল না, কার জামার কলার ফ্যাশন করে ওঠানো থাকল, কোন মেয়েটা ঠিকমতো ওড়না সামলে চলল না, কোন বখাটে তাদের দেখেও হাতে থাকা বিড়ি-সিগারেট সামলাল না, কোন ছেলেটা স্টাইল করে চুল ছাঁটল—চুটকা মাতুব্বরদের কাছে এই সব বিরাট উদ্বেগের বিষয়। এত গুরুতর সামাজিক দায়িত্ব পালনের পরও পাড়ায় কোনো কুকীর্তি হলে পুলিশ কেন জানি এদেরই আগে সন্দেহ করে থাকে।

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার পাটলী ইউনিয়নবাসীর কপাল খারাপ না। সেখানে সামাজিক অনুশাসন প্রতিষ্ঠায় নিবেদিতপ্রাণ অন্তত হাফ ডজন ‘সামাজিক পুলিশ’ পাওয়া গেছে। গরিব এবং সংখ্যালঘু হয়ে ‘স্টাইল’ করে চুল ছাঁটা ও দাড়ি কাটানো যে কত বড় সমাজবিরোধী সন্ত্রাসীর লক্ষণ, তা তারা ছাড়া বেশি লোক বুঝতে পারেনি। এই অপরাধে লিপ্ত ৫ তরুণকে তারা খুব করে শাসন করে দিয়েছে। মেরেধরে তাদের মাথা ন্যাড়াও করে দিয়েছে।

অতি আফসোসের কথা, এই ছেলেপেলেরা সেই মারধরের মহতী উদ্দেশ্য ধরতে পারেনি। তারা শুধু শাসনটাই দেখেছে, শোধনটা দেখেনি। এ কারণেই তাদের চুল কেটে দেওয়ার পর তারা রাগ করে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশের কাছে নালিশ দিয়েছে। আর পুলিশ এসে অতি অবিবেচকের মতো কয়েকজনকে ধরে নিয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

খবর পড়ে যা জানা গেল, তার চুম্বক কথা হলো: সুবেন্দ্র কর, সুবাস কর, নয়ন কর, হৃদয় কর ও লিপন দাস নামের পাঁচ তরুণের বাড়ি পাটলী ইউনিয়নের সমসপুর গ্রামে। শুক্রবার সন্ধ্যায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে তাদের যাওয়ার কথা ছিল। সে জন্য তারা রসুলগঞ্জ বাজারের ‘লোকনাথ হেয়ার স্টাইল’ সেলুনে গিয়ে একটু কায়দা করে চুল কাটছিল। এ সময় সেখানে হাজির হন মইজপুর গ্রামের সিরাজ মিয়া, লোহারগাঁও গ্রামের ফুল মিয়া, পাটলী চক গ্রামের আনর মিয়া, আবদুল্লাহপুর গ্রামের শাহীন মিয়া ও পাটলী চক গ্রামের আতাউর রহমান। তাঁরা দেখলেন, যারা চুল ছাঁটছে তারা একে অতি দরিদ্র, দুইয়ে বয়সে ছেলে ছোকরা, তিনে অবলা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। সম্ভবত তাদের মধ্যে এই তিনটি বৈশিষ্ট্য দেখেই সিরাজ মিয়াদের মনে ‘তোরা সর, আমি দেখতেছি’ টাইপের চেতনা জাগ্রত হয়। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তাঁরা ছেলেগুলোকে টিটকিরি দেওয়া শুরু করেন।

ছেলেগুলো অল্প শিক্ষিত বলে সিরাজ মিয়াদের পৃষ্ঠপোষকতাসুলভ ভর্ৎসনার মর্মার্থ ধরতে পারেনি। তারা বেয়াদবের মতো প্রতিবাদ করতে গেছে। ফলে কথা-কাটাকাটি হয়েছে। উপায় না পেয়ে সিরাজ মিয়ারা কড়া শাসনের কায়দায় ছেলেগুলোকে প্রথমে আচ্ছা করে পিটুনি দিয়েছেন। তারপর জোর করে মাথা ন্যাড়া করে দিয়েছেন। ছেলেগুলোর মধ্যে দু-একজন স্টাইল করে দাড়ি রেখেছিল। চুলের সঙ্গে তাদের দাঁড়িও কামিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। মাথাভর্তি চুলের বদলে আস্ত টাক নিয়ে বিয়েবাড়িতে যাওয়াটা ভালো দেখায় না বুঝতে পেরে লিপন দাস ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে নালিশ দেয়। রাতেই পুলিশ অভিযান চালিয়ে সিরাজ মিয়া, আনর মিয়া ও শ্যামল মিয়াকে ধরে নিয়ে যায়। পুলিশ বলেছে, বাকি অভিযুক্তদেরও ধরার চেষ্টা তারা করছে।

সুনামগঞ্জের এই ঘটনাকে যদি আমরা ট্রেলার হিসেবে নিই, তাহলে পুরো ছবি দেখা যাবে গোটা বাংলাদেশের পাড়ামহল্লার রুপালি পর্দায়। চুটকা মাতুব্বরদের সমাজ রক্ষা আন্দোলনের সেই ছবির পরিচালক কারা, শ্রেষ্ঠাংশে কারা তা সবাই জানে। তাঁরা পাড়ার মতো ছোট কোর্টে খেলেন না। তাঁদের এরিয়া গোটা দেশ। দু-একটা বৈঠকে, তিন-চারটে সই করে তাঁরা একমুহূর্তে অগণিত মানুষের মাথা মুড়িয়ে দেন। এঁদের ব্যাপারে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করবে কোন লিপন দাস?

সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন