বিশেষ সাক্ষাৎকার: মুশতাক হোসেন

শনাক্ত ও মৃত্যু কমলেই পরীক্ষা কমানো নয়

বিজ্ঞাপন
default-image

ডা. মুশতাক হোসেন। ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চের (আইইডিসিআর) অন্যতম উপদেষ্টা। এর আগে এই প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসা সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ছিলেন। বাংলাদেশে করোনা রোগী শনাক্তের ছয় মাস পূর্তি হলো আজ। করোনা মোকাবিলায় এই ছয় মাসে বাংলাদেশের উদ্যোগ ও কার্যক্রমের মূল্যায়ন এবং সামনের সংক্রমণ পরিস্থিতি—এসব নিয়ে তিনি কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিজানুর রহমান খান

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: করোনা মোকাবিলার ছয় মাসে দেখা গেল সরকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও জনগণ সবাই যেন হাল ছেড়ে দিচ্ছে। অবশ্য প্রতিদিনের মৃতের সংখ্যা আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে।

মুশতাক হোসেন: মানুষ তাদের জীবন–জীবিকার তাগিদে করোনাকে অগ্রাহ্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে দু–এক দিনের পরিসংখ্যান দিয়ে আমরা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি না। অন্তত টানা তিন দিন বা এক সপ্তাহের মাত্রা দেখতে হবে। গত এক সপ্তাহে দেখেছি, মৃত্যুর সংখ্যা ৪০–এর নিচে থাকছে। তার আগের দুই সপ্তাহে সংখ্যাটি ৪০–এর ওপরে ছিল। সংক্রমণ কম হলে মৃত্যুর আনুপাতিক সংখ্যা কমবে। বেশি হলে মৃত্যুঝুঁকি বৃদ্ধির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, সেটা নির্ভর করে সংক্রমণের সার্বিক মাত্রার ওপরে।

প্রথম আলো: ছয় মাস বা তিন মাস আগে সংক্রমণ, আক্রান্ত, হাসপাতালে ও বাড়িতে মৃত্যু ইত্যাদি বিষয়ে তথ্যের যথার্থতা নিয়ে বেশ প্রশ্ন ছিল। এখন সরকার যা বলছে, তা কতটা নির্ভরযোগ্য? আগের চেয়ে কি উন্নতি ঘটেছে?

মুশতাক হোসেন: কোনো দেশের পক্ষেই রোগীদের সামগ্রিক তথ্য জানা সম্ভব নয়। দেখতে হবে প্রাপ্ত তথ্য প্রতিনিধিত্বমূলক কি না। প্রতিটি জেলা থেকে আসা তথ্য প্রতিনিধিত্বমূলক। তবে যঁারা হাসপাতালে আসছেন, তাঁদের থেকেই মূলত একটা চিত্র পাওয়া যায়। জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাসেই সংক্রমণের সর্বোচ্চ মাত্রা আমরা দেখেছি। এখন আগস্টের শেষ সপ্তাহে এসে আমরা সংক্রমণের মাত্রা কম দেখছি।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: নিউজিল্যান্ড বা ভিয়েতনামের মতো দেশেও সংক্রমণ একদম কমে আবার ফিরে এসেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই আশঙ্কা রয়েছি কি? আমরা ছয় মাসে কী ধরনের সামর্থ্য বাড়াতে পেরেছি?

মুশতাক হোসেন: এখানে শুধু হাসপাতালের ব্যবস্থাপনাগত উন্নতিকে বিবেচনায় নিলে চলবে না। দেখতে হবে রোগের সংক্রমণ প্রতিরোধ করার জনস্বাস্থ্য এবং চিকিৎসাব্যবস্থার সক্ষমতা বেড়েছে কি না। সংক্রমণ প্রতিরোধের সক্ষমতা বাড়ানোর আরও সুযোগ রয়েছে। অতিমারি মোকাবিলায় সমন্বয় ও নেতৃত্ব আরও ভালো করার সুযোগ ছিল। সেখানে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী আমরা সবকিছু করতে পারিনি। তবে মোটের ওপরে আমরা অনেকখানি সামাল দিতে পেরেছি। ২৬ মার্চে গোটা দেশ বন্ধ করা হলো, না হলে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই সংক্রমণের চূড়াটা হয়তো দেখা যেত। সেটা ঘটেনি। ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে লকডাউন কাজে দিয়েছে। একই পদক্ষেপ ইউরোপ ও উন্নত দেশগুলো কিন্তু গোড়াতেই নিতে না পারার মাশুল দিয়েছে। আবার উন্নত দেশগুলো গভীরভাবে ভেন্টিলেটর–সংকটে পড়েছিল। পরে আমরা জেনেছি, রোগীদের বাঁচিয়ে তুলতে ভেন্টিলেটরের চেয়ে হাই ফ্লো অক্সিজেন অনেক বেশি কার্যকরী। এই অভিজ্ঞতার সুফল আমরা পেয়েছি। এ ছাড়া করোনাভাইরাস কারও দেহে ৮ থেকে ১০ দিনের বেশি বেঁচে থাকে না, এই তথ্য জানা এবং লক্ষণ দেখে চিকিৎসা করার ফলেও আমরা মৃত্যুর হার নিম্ন পর্যায়ে রাখতে পেরেছি।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: আমরা তাহলে চূড়ায় যাব না, সে বিষয়ে বাংলাদেশ নিশ্চিত? এখনো কেন আমরা বিশ্বের সব থেকে খারাপ ১০টির অন্যতম?

মুশতাক হোসেন: না, না কখনোই নয়। এখন সংক্রমণ একটা ধীরগতিতে আছে। যদি আমরা উদাসীন হই, শনাক্ত হওয়া রোগীকে আইসোলেশন ও তাঁদের স্বজনদের কোয়ারেন্টিন না করি, স্বাস্থ্যবিধি না মানি, আমার আশঙ্কা যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো জায়গায় সংক্রমণের স্পাইক (চূড়ায় ওঠা) ঘটতে পারে। ছয় মাস পরও এই আশঙ্কাটা পুরোপুরি রয়েছে। আপনি যেমনটা বলছিলেন যে নিউজিল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও জাপানও নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছিল। পরে আবার বিস্তার ঘটেছে। আর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে করোনাভাইরাস তার বৈশিষ্ট্য বদলাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তাতে বিপদ কমছে এমনটি বলা যাচ্ছে না। আপনি বৈশ্বিক সূচকের কথা বললেন, সে ক্ষেত্রে দেখতে হবে কোন নির্দেশকটি ব্যবহার করা হয়েছে। আমরা অষ্টম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ। যেখানে যত বেশি লোকসংখ্যা, সেখানে রোগী তত বেশি হবে। চীন অবশ্য আরও বেশি জনসংখ্যা নিয়েও ভালো অবস্থানে। আমাদের সমান জনসংখ্যার দেশের সঙ্গে তুলনাটা হতে পারে। এটা বলতে হবে যে সংক্রমণের যে হার রয়েছে, সেটা আরও কমিয়ে আনা সম্ভব।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: কিন্তু চারপাশে আমরা কী দেখছি? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক বর্ণিত ‘থ্রি সি’তেই ডুবে আছে দেশ। ক্লোজ স্পেসেস, ক্রাউডেড প্লেসেস, ক্লোজ কন্ট্যাক্টস। এর জন্য জনগণকে দায়ী করবেন, নাকি শাসনগত ব্যর্থতা?

মুশতাক হোসেন: এই অবস্থার বদল আপনি শাসন করে করতে পারবেন না। নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা ছাড়াই মানুষ মার্চ-এপ্রিলে ঘরে থেকেছিল। এখন ছয় মাসের মাথায় জনগণকে সম্পৃক্ত করতেই হবে। কিন্তু জরিমানা বা লাঠির ভয় দেখিয়ে এটা করবেন, সেটা খুবই ভুল দৃষ্টিভঙ্গি। জনগণকে সঠিক তথ্য দিয়ে এমনভাবে ক্ষমতায়িত করতে হবে, যাতে তারা ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। টোলারবাগ থেকে শুরু করে মাদারীপুরের শিবচর, গাইবান্ধা, ওয়ারী, পূর্ব রাজাবাজারসহ আরও অনেক জায়গায় কমিউনিটি সম্পৃক্ততার সাফল্যের ভালো উদাহরণ তৈরি হয়েছে। লাঠি কোথাও জয়যুক্ত হয়নি।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান আরাফাতের আশঙ্কা, করোনার চিকিৎসায় মানুষ যেভাবে যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক নিচ্ছে, তাতে অ্যান্টিবায়োটিকে আর কাজ দেবে না। দেশে আরেকটি মহামারির মতো বিপর্যয় দেখা দেবে।

মুশতাক হোসেন: আমি তাঁর সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। শুধু চিকিৎসকেরাই নন, মানুষ নিজ থেকেই বাসায় এর মজুত গড়ছেন এবং সেবন করছেন। তাঁরা এমনকি স্টেরয়েড নিচ্ছেন, প্লাজমা থেরাপির ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। একে কমিয়ে আনতে সম্ভব সব পদক্ষেপ দ্রুত নিতে হবে। কারণ, করোনা–পরবর্তীকালে এটা একটা নতুন সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: এই মুহূর্তে তিনটি অগ্রাধিকারের কথা বলুন।

মুশতাক হোসেন: প্রথমত, হঠাৎ করে কোনো এলাকায় সংক্রমণ বিস্ফোরিত হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি এবং এ ক্ষেত্রে ঘাটতিগুলো দূর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জনগণের সম্পৃক্ততা যা ঘটেছে, তা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে হয়েছে, একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। তৃতীয়ত, করোনা রোগীদের করোনা–পরবর্তী যে স্বাস্থ্য সমস্যা, সেটা মোকাবিলার জন্য কিছু উদ্যোগ হাসপাতালগুলোতে রয়েছে, কিন্তু একে পুরো স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে বলব, করোনা নয়, এমন যেসব স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে, তার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতেও সব রকমের পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: ৯৩টি ল্যাব চালু থাকলেও পরীক্ষা ১০ হাজারের নিচে নামছে। সরকারি মহল বলছে, পরীক্ষা বাড়িয়ে আর লাভ কী?

মুশতাক হোসেন: সংক্রমণ কমে গেলে পরীক্ষা কমানো এটা কোনো রোগতাত্ত্বিক কথা নয়। সংক্রমণ কমেছে, তাই পরীক্ষা কমাও, এটা সরকারের কেউ বলেছেন বলে আমার জানা নেই। সংক্রমণ সত্যিই কমেছে কি না, সেটা নির্ভর করছে প্রতিনিধিত্বমূলক পরীক্ষা করছি কি না, তার ওপর। সেটা পর্যাপ্ত পরীক্ষা করেই জানা সম্ভব, কমিয়ে নয়। রোগী শনাক্ত ও মৃতের সংখ্যা কমলেই পরীক্ষা কমানো যুক্তিগ্রাহ্য হয় না। সারা দেশে এখনো কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বিদ্যমান। তাই মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তঁাদের লক্ষণ জেনে পরীক্ষা করতে হবে। যাঁর করোনা পজিটিভ হবে, তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগে থাকা সবার (লক্ষণ থাক বা না থাক) পরীক্ষা করাতে হবে। এই নীতি নেওয়া হলে প্রতিদিন ২০ হাজার পরীক্ষা করলেও যথেষ্ট হবে না। কারিগরি কমিটির আগের সুপারিশ অনুযায়ী প্রতিদিন ৩০ হাজার পর্যন্ত পরীক্ষাই দরকার। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা শুধু বলেছেন যে একবার যাঁর পজিটিভ হয়েছে, তাঁরা নেগেটিভ হলেন কি না, সে জন্য দ্বিতীয় পরীক্ষার দরকার নেই। তঁারা রোগী শনাক্তের জন্য পরীক্ষা কমাতে পরামর্শ দেননি।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: প্রাথমিক স্কুলগুলোসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কবে খুলে দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করেন?

মুশতাক হোসেন: সংক্রমণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে গেলে এটা সম্ভব হবে। আমার মতে, প্রতিদিন কমপক্ষে ২০ হাজার পরীক্ষা এবং এক শ জনকে পরীক্ষা করে যদি ৫ জন শনাক্ত হয় এবং এই হার যদি পরপর তিন সপ্তাহ বজায় রাখা যায়, তাহলে সংক্রমণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে বলে ধরে নেওয়া যায়। অবশ্য কোনো অঞ্চলে উচ্চমাত্রার সংক্রমণ থাকলে সেখানে দেরি করা যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

মুশতাক হোসেন: ধন্যবাদ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন