বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
যেকোনো খেলার একটা নিয়ম আছে। খেলাটি হয় মাঠে। নির্বাচন হয় ভোটকেন্দ্রে। কিন্তু হুদা কমিশন মাঠ অর্থাৎ ভোটকেন্দ্রের খেলাটি মাঠের বাইরে নিয়ে এসেছে। ভোটের দিন কী হবে না হবে, কতজন ভোটার কেন্দ্রে যাবেন, কতজন পোলিং এজেন্ট কেন্দ্রে থাকবেন, সেসব নিয়ে ইসির কোনো মাথাব্যথা নেই।

যেকোনো নির্বাচনের নিয়ামক শক্তি হলো জনগণ বা ভোটার। অধুনা বাংলাদেশে সেই ভোটারদের ভূমিকাই গৌণ হয়ে পড়েছে। নির্বাচনের যেসব বিধিবিধান আছে, সেগুলো নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল ও প্রার্থী কেউ মানছেন না। বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বরাবর নির্দলীয় ভিত্তিতে হতো। কিন্তু কে এম নূরুল হুদা কমিশনের মাথায় হঠাৎ ভূত চাপল যে ইউপি থেকে সিটি করপোরেশন সব স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করতে হবে। ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে তাঁরা নির্বাচনী ব্যবস্থাটিই ধ্বংস করে দিয়েছেন। তবে সিইসি বিলম্বে হলেও একটি সত্য স্বীকার করেছেন, ‘রাজনৈতিক দল, ভোটার ও প্রার্থীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নির্বাচন সুষ্ঠু হয়। মাঠপর্যায়ে সহনশীলতা না থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না।’ কথা হলো এই সহনশীলতা আনবে কে? রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর নিশ্চয়ই ভূমিকা আছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন ছাড়া কেউ প্রার্থী হতে পারেন না। ফলে প্রার্থী হওয়ার পর ইসির দায়িত্ব হলো তিনি বা তাঁরা নির্বাচনী আচরণবিধি মানছেন কি না। যদি না মেনে থাকেন, ইসি আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে। প্রার্থিতা বাতিল করতে পারে। এমনকি নির্বাচনটিও বাতিল করতে পারে।

যেকোনো খেলার একটা নিয়ম আছে। খেলাটি হয় মাঠে। নির্বাচন হয় ভোটকেন্দ্রে। কিন্তু হুদা কমিশন মাঠ অর্থাৎ ভোটকেন্দ্রের খেলাটি মাঠের বাইরে নিয়ে এসেছে। ভোটের দিন কী হবে না হবে, কতজন ভোটার কেন্দ্রে যাবেন, কতজন পোলিং এজেন্ট কেন্দ্রে থাকবেন, সেসব নিয়ে ইসির কোনো মাথাব্যথা নেই। এরশাদ আমলে একটি জনপ্রিয় স্লোগান ছিল, ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব।’ এবারের ইউপি নির্বাচনে প্রার্থিতা নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে যে সংঘাত ও সংঘর্ষ চলছে, তাতে মনে হয় ভোটারদের প্রয়োজন নেই। ভোটকেন্দ্রের প্রয়োজন নেই। ভোটকেন্দ্রের বাইরে এক পক্ষকে বন্দুক, চাপাতি, কিরিচ, দা-বঁটি ও লাঠি দিয়ে পরাস্ত করেই নির্বাচনী রায় ছিনিয়ে নেবে।

সিইসি নূরুল হুদা আশা করছেন ‘নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে, প্রতিযোগিতামূলক হবে, কিন্তু প্রতিহিংসামূলক হবে না।’ বাস্তবে নির্বাচনটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক না হয়ে প্রতিহিংসামূলকই হচ্ছে। নির্বাচন তখনই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়, যখন সব দল তাতে অংশ নেয়, সব প্রার্থী প্রচারণার সমান সুযোগ পান। ইসি সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেনি। বিএনপিসহ বেশ কিছু দল আনুষ্ঠানিকভাবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বর্জন করেছে। তাদের অভিযোগ, এই ইসির অধীনে ভোট ও ভোটার নিরাপদ নয়। ভোটের অধিকার নিরাপদ না হলে নির্বাচনও নিরাপদ থাকতে পারে না।

নির্বাচনটি যেহেতু দলীয়ভাবে হচ্ছে, সব দলকে নির্বাচনী মাঠে নিয়ে আসাও কমিশনের দায়িত্ব ছিল। সরকারি দল আওয়ামী লীগ বলছে, আমরা প্রতিদ্বন্দ্বী। নির্বাচনটি কেমন হবে সে বিষয়টি দেখার দায়িত্ব ইসির। সেই দায়িত্ব পালনে কিছুই করেনি মাঝেমধ্যে টিভিতে চেহারা দেখানো ছাড়া। কক্সবাজার আওয়ামী লীগের এক নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘নৌকায় ভোট না দিলে কবরস্থানে জায়গা হবে না।’ রাজশাহী অঞ্চলের অপর এক আওয়ামী লীগ নেতা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ‘যাঁরা নৌকায় ভোট দেবেন, কেবল তাঁরাই ভোটকেন্দ্রে যাবেন, অন্য কাউকে ঢুকতে দেওয়া হবে না।’

নৌকার সমর্থকদের বাইরে যদি কোনো প্রার্থী ও ভোটার কেন্দ্রেই যেতে না পারেন, তাহলে তো নির্বাচনী খেলাটা মাঠের বাইরেই থেকে গেল। সিইসি কি মনে করেন, এগুলো নির্বাচনী আইনভঙ্গ নয়?

যদি হয়ে থাকে, তাঁরা কী ব্যবস্থা নিয়েছেন। কেবল ওই দুটি জায়গা নয়, অনেক স্থানেই স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছেন। আর ভোটযুদ্ধটা আওয়ামী লীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগের। ফলে প্রতিপক্ষও ছাড় দিচ্ছে না। এ কারণেই ইউপি নির্বাচনে এত মারামারি-হানাহানির ঘটনা। সিইসি একে ‘হঠাৎ ফৌজদারি অপরাধ বলে যতই লঘু করে দেখুন না কেন, তিনি নিজে এবং তার কমিশন এর দায় এড়াতে পারে না।

ক্ষোভ-বেদনার কথা অনেকবার বলেছি। এবার লজ্জার কথা বলছি। এ লজ্জা নির্বাচন কমিশনের পদাধিকারীদের স্পর্শ করবে না জানি। আবার বিবেকের তাড়নায় কেউ সত্য কথা বললে তাকে ‘মানসিক রোগী’ বানানো হবে। আজকাল মন্ত্রীরাও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু তাদের বোধ হয় জানা নেই অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ হয় না।

ইউপি নির্বাচনে সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় কে এম হুদা সাহেব বিব্রতবোধ করছেন। কিন্তু সেই বিব্রত অবস্থা থেকে কীভাবে উত্তরণ ঘটবে, সে সম্পর্কে কিছুই বলছেন না। তাঁর নেতৃত্বাধীন কমিশন গত পৌনে পাঁচ বছরে যেভাবে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করেছে, তাতে এই দেশের একজন নাগরিক হিসেবে লজ্জিতবোধ করছি। ক্ষোভ-বেদনার কথা অনেকবার বলেছি। এবার লজ্জার কথা বলছি। এ লজ্জা নির্বাচন কমিশনের পদাধিকারীদের স্পর্শ করবে না জানি। আবার বিবেকের তাড়নায় কেউ সত্য কথা বললে তাকে ‘মানসিক রোগী’ বানানো হবে। আজকাল মন্ত্রীরাও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু তাদের বোধ হয় জানা নেই অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ হয় না। কিছু মানুষকে কিছুদিনের জন্য বোকা বানানো যায়। সব মানুষকে সব সময়ের জন্য বোকা বানানো যায় না।

এ নির্বাচন নিয়ে রাজনীতিকেরা গর্ববোধ করতে পারেন। সরকারি দল নিজের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা প্রমাণের আরেকটি সুযোগ পেয়ে আহ্লাদিত হতে পারে। বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করে সরকারকে চ্যালেঞ্জে ফেলে দিয়েছে এ আত্মপ্রসাদ লাভ করতে পারে। কিন্তু এ দেশের ১০ কোটি ভোটার কোথায় যাবেন। তঁাদের একটিই আকাঙ্ক্ষা, নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে একটি ভোট দিয়ে অন্তত এ রাষ্ট্রে তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করবেন। সেই সুযোগ থেকে নির্বাচন কমিশন তাদের বঞ্চিত করেছে। নতুন নির্বাচন কমিশন কীভাবে গঠিত হবে, ইতিমধ্যে তা নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দল মাঠ গরম করছে। কিন্তু জগদ্দল পাথরের মতো জনগণের ওপর যে কমিশনটি চেপে আছে, তার হাত থেকে বাকি কয়েক মাস নিষ্কৃতি পাওয়ার কী উপায়। বাংলাদেশে অনেক নির্বাচন কমিশন এসেছে। কেউ সফল হয়েছে, কেউ ব্যর্থ হয়ে মেয়াদ শেষ করার আগেই বিদায় নিয়েছে। কিন্তু ধারাবাহিক ব্যর্থতা নিয়ে একটি কমিশন পুরো মেয়াদ পার করার দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত নেই। এ জন্য কে এম নূরুল হুদা কমিশন বাহবা পেতে পারে।

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন