default-image

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে, আহত হচ্ছে, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারাচ্ছে। স্বজনদের শোক-দুঃখ, আহাজারি, অসহায়ত্ব, মাঝেমধ্যে প্রতিবাদ, সঙ্গে আছে ক্রোধ—কিন্তু পরিবর্তন তো নেই, এমনকি পরিবর্তনের কোনো আভাস-ইঙ্গিতও নেই।

বলা হচ্ছে বিচারের কথা, আইন সংশোধনের কথা। নতুন একটা আইনও হয়েছে, তবে এখনো কার্যকর হয়নি। সরকারি উদ্যোগে বিরাট শতাধিক সুপারিশের একটি সুপারিশমালা তৈরি হয়েছে। অনেকেই হয়তো এসব সুপারিশের বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছেন। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালক-হেলপারদের শাস্তি চাওয়া হচ্ছে। তিন বছর নয়, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, নাকি মৃত্যুদণ্ড—এসব নিয়ে চলছে তুলকালাম বিতর্ক।


আমরা সমাধান খুঁজছি ফৌজদারি মামলা আর চালক-মালিকের দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর কারাদণ্ডের। তাকিয়ে আছি সরকার ও ট্রাফিক পুলিশের পানে। সরকার সুপারিশ বাস্তবায়ন করবে, ট্রাফিক পুলিশ আইন প্রয়োগ করবে, রাস্তা ব্যবহারকারী, মালিক-শ্রমিক সমিতিগুলো সবাই ভালো হয়ে যাবে—এই আশায়ই আমরা বুক বেঁধে আছি। এসব কোনো একদিন হবে হয়তো। তত দিন পর্যন্ত নিয়তই নিহত আর আহত হবে শত শত লোক। আমরা কাঁদব, লিখব, হয়তো প্রতিবাদ করব আর সবার ব্যর্থতাকে দুষব।

কিন্তু আইনি একটা সমাধান আছে। এটা সম্পূর্ণ সমাধান নয়, কিন্তু এই সমাধানের পথে এগোনো তুলনামূলকভাবে সহজ। প্রয়োজন হবে ভুক্তভোগীদের কিছু ধৈর্য, অর্থ, সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের কিছু নিষ্ঠা আর বিচারকদের সহানুভূতি।

আমরা এখন পর্যন্ত যে সমাধানের খোঁজে আছি, এককথায় সেটা হলো ফৌজদারি আইনের সমাধান। অর্থাৎ, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করে বিচার শেষে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডের মাধ্যমে। অন্যটি হলো প্রশাসনিক সমাধান। অর্থাৎ, সরকার শত শত সুপারিশ বাস্তবায়ন করবে—সড়ক ভালো করবে, ফুটপাত প্রশস্ত করবে, গাড়ির ফিটনেস নিশ্চিত করবে, লাইসেন্সবিহীন চালক থাকবে না, পথচারী ঠিকমতো রাস্তা পারাপার করবে, ট্রাফিক সিগন্যাল কাজ করবে আর ট্রাফিক পুলিশ পারদর্শী হবে। বলা বাহুল্য, ফৌজদারি শাস্তি আর প্রশাসনিক সুব্যবস্থা দুটোই প্রয়োজন। কিন্তু এই পথে অবস্থার উন্নতির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা না করে ক্ষতিপূরণের জন্য দেওয়ানি মামলা অনেক বেশি বাস্তবসম্মত সমাধান। মাঝেমধ্যে আইনজীবী মহলে হাহাকার শুনি, আমাদের দেওয়ানি ক্ষতিপূরণের কোনো আইন নেই। আইন আছে কিন্তু আইনটা এত পুরোনো যে আমরা ভুলেই গেছি। দ্য ফ্যাটাল অ্যাকসিডেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৫৫ (The Fatal Accidents Act, 1855) আইনটি ১৬৪ বছরের পুরোনো।

সড়ক দুর্ঘটনায় ফৌজদারি মামলা দায়ের, আসামিদের গ্রেপ্তার, তদন্ত, আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল, সাক্ষীসাবুদ জোগাড় করা (নিহত ব্যক্তির পোস্টমর্টেম রিপোর্ট, গাড়িচালকের লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস, ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী, দুর্ঘটনাসংক্রান্ত বিশেষজ্ঞদের সাক্ষ্য, ভিকটিমের নিকটজনের সাক্ষ্য ইত্যাদি)—এই সবকিছুর দায়িত্ব বর্তায় পুলিশের ওপর। বিচারপ্রার্থীদের সম্পূর্ণ মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয় পুলিশের তৎপরতার ওপর। তদন্তকালে তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা বদলি হলে সবকিছুই পিছিয়ে যায় অনেক মাস। চার্জশিটের পর মামলা পরিচালনার দায়িত্ব পড়ে সরকার নিয়োজিত, অর্থাৎ প্রায় সব ক্ষেত্রেই সরকারি দলের সমর্থক পিপি বা এপিপির ওপর। তাঁদের তৎপরতায় প্রায়ই মামলা গড়ায় মাসের পর মাস। নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের এ দুয়ারে-ও দুয়ারে ঘোরাঘুরি ছাড়া বিশেষ কিছুই করার থাকে না। এসব কিছু থেকেও বড় বাধা হলো, ফৌজদারি মামলায় দোষী সাব্যস্ত করার আগে বিচারককে নিশ্চিত হতে হবে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। একটু সন্দেহ থাকলেই আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি দেওয়া যায় না। তাই ফৌজদারি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে গাড়িচালক-সহকারীর কারাদণ্ডের দৃষ্টান্ত অতি অল্প।


ক্ষতিপূরণ চেয়ে দেওয়ানি মামলার রায় বাদীর পক্ষে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে সুবিধার দিকটা হচ্ছে, বাদী ও বিবাদীর যুক্তিতর্ক শুনে বিচারক যদি মনে করেন যুক্তি ও প্রমাণের পাল্লাটা বাদীর দিকেই ভারী, তাহলে রায় বাদীর পক্ষে যাবে। ফৌজদারি মামলায় একটু সন্দেহ থাকলেই আসামি খালাস পাবেন। কিন্তু দেওয়ানি মামলায় বাদীর দাবিটার ব্যাপারে সন্দেহ থাকলেও সার্বিকভাবে বিচারকের যদি মনে হয় বাদীর কথা সঠিক বলেই মনে হচ্ছে, তাহলেই বাদী তাঁর পক্ষে রায় পাবেন। বিবাদীর কিছু কথা ঠিক কিন্তু বাদীর বেশির ভাগ কথাই ঠিক, তাহলেই চলবে।

দ্বিতীয়ত, দুর্ঘটনায় মৃত্যুর জন্য ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলাটা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করবেন বাদী, অর্থাৎ নিহত ব্যক্তির নিকটাত্মীয়। এখানে পুলিশ নেই, রাষ্ট্র নেই, নেই রাষ্ট্রের পিপি-এপিপি। থাকবেন বাদীর নিয়োজিত নিজস্ব আইনজীবী।

সাক্ষীর অভাবে অনেক ফৌজদারি মামলা হয় বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, না হয় খারিজ হয়ে যায়। সড়ক দুর্ঘটনায় ফৌজদারি মামলায় চালক দোষী প্রমাণিত হলে তিনি জেলে যাবেন, কিন্তু এতে মানসিক প্রশান্তি এবং ন্যায়বিচারের সন্তুষ্টি ছাড়া নিহত ব্যক্তির নিকটাত্মীয়ের আর কোনো লাভ নেই। দেওয়ানি মামলাও অনেক ক্ষেত্রে বছরের পর বছর চলে, কিন্তু বাদী এসব মামলায় হাল ছাড়েন না, কারণ মামলা শেষে তিনি ওই জমি ফেরত পাবেন, ধার দেওয়া টাকাটা সুদে-আসলে পাবেন অথবা পাবেন ক্ষতিপূরণের অর্থ। মানসিক প্রশান্তির সঙ্গে সঙ্গে আছে অর্থলাভ। অর্থলাভের জন্য দেওয়ানি মামলার বাদী অনায়াসে কষ্ট স্বীকার করবেন।

দ্য ফ্যাটাল অ্যাকসিডেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৫৫ মাত্র দুই পৃষ্ঠার ছোট্ট একটা আইন। এর মোদ্দা কথাটা হলো কোনো দুর্ঘটনায় কেউ নিহত হলে বিচারক যৌক্তিক যেকোনো অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দিতে পারেন। ক্ষতিপূরণের অর্থ পাবেন নিহত ব্যক্তির নিকটাত্মীয়, অর্থাৎ মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান ইত্যাদি। বলা বাহুল্য, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যানবাহনটির যদি ফিটনেস না থাকে অথবা চালকের লাইসেন্স না থাকে, তাহলে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ অনেক বেশি হতে পারে। আর ৫০ লাখ টাকা একবার ক্ষতিপূরণ দিলে মালিক আর কখনোই লাইসেন্সবিহীন চালককে দিয়ে ফিটনেস ছাড়া গাড়ি রাস্তায় বের করবেন না। এক ঢিলে অনেক পাখি সহজেই মারা যাবে। অবশ্য আমাদের উচ্চ আদালত কিছু ক্ষেত্রে এটির প্রয়োগ করেছেন। ১৯৬৯ ও ১৯৭২ সালে করেছেন। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ বেভারেজ বনাম রওশন আক্তার মামলায় আপিল বিভাগ ওই আইনটির উল্লেখ করেন। কিন্তু পরিহাস হলো, ৩০ বছর আগে নিহত সংবাদ–এর বার্তা সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেনের স্ত্রী রওশন আক্তার আদালত নির্দেশিত প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ আজও পাননি।

শতাধিক সুপারিশ বাস্তবায়নের আগে সরকার কোর্ট ফি অ্যাক্ট, ১৮৭০–তে একটা ছোট্ট সংশোধন এনে দেওয়ানি মামলার পথ সুগম করে দুর্ঘটনা রোধে বিরাট সাহায্য করতে পারে। বড় দাগে এ আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের মামলায় কাঙ্ক্ষিত ক্ষতিপূরণের অর্থের পরিমাণের ওপর শতকরা ২ দশমিক ৫ টাকা হারে কোর্ট ফি বা আদালতের খরচ বাদীকে জমা দিতে হয়। সর্বোচ্চ কোর্ট ফি ৫০ হাজার টাকা। এই কোর্ট ফি অ্যাক্টে একটা ছোট্ট সংশোধন করে দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার কারণে ক্ষতিপূরণ মামলার কোর্ট ফি শতকরা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা করে দিলে নিহত ব্যক্তির নিকটাত্মীয়ের পক্ষে মামলাগুলো করা অনেক সহজ হবে।

তবে আগেই বলেছি, এই পুরোনো আইনের চর্চা আইনজীবীদের করতে হবে। ক্ষতিপূরণের পরিমাণটা কীভাবে নির্ধারণ করতে হবে, সেটাও বুঝতে হবে এবং এই ক্ষতিপূরণের মামলাগুলো সম্পূর্ণ অর্থ আয়ের নতুন পন্থা হয়েছে বিবেচনা না করে দুর্ঘটনা রোধে আইনজীবীদের অবদান হিসেবে কিছুটা জনসেবী মনোভাব নিয়ে কাজ করলে ভালো হয়। আইন সহায়তাকারী বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও আর বার অ্যাসোসিয়েশন ক্ষতিপূরণের আইনচর্চায় উদ্যোগী হলে ফলাফল পাওয়া যাবে আরও তাড়াতাড়ি।

গাড়িচালকের তিন বা পাঁচ বছরের জন্য জেলে হলে মালিকের বেশি কিছু যায়-আসে না। সহজেই নতুন চালক নিয়োগ করতে পারবেন। কিন্তু এক-দুবার ২০ লাখ-৫০ লাখ টাকা বাসের মালিকদের ক্ষতিপূরণ দিতে হলে ফিটনেস আর লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি তখন রাস্তায় খুঁজেই পাওয়া যাবে না। সমস্যার সমাধান অনেক সহজেই হবে।

শতাধিক সুপারিশ বাস্তবায়ন ও দোষী চালকের শাস্তি লাগবে, কিন্তু যানবাহনমালিকের পকেটে হাত দিতে পারলে সমাধান হবে অনেক সহজেই। আর নিহত ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল মা-বাবা, স্ত্রী আর সন্তানদের অর্থকষ্ট লাঘব হবে, শোক-দুঃখ কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিক জীবনে ফেরত যেতে ক্ষতিপূরণের টাকাটা নিশ্চয় সহায়ক হবে।

ড. শাহদীন মালিক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের আইনের শিক্ষক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন