default-image
অধ্যাপক কাজী শহীদুল্লাহ বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান। এর আগে তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। কোভিড–১৯ মহামারিতে উচ্চশিক্ষার হাল, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার পদ্ধতি, বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম–দুর্নীতি নিয়ে তিনি কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোহরাব হাসান
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার জটিলতা কি কাটল?

কাজী শহীদুল্লাহ: না, কাটেনি। আমরা বসেছিলাম। বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় আগেই আলাদাভাবে পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। অনেকে অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার চিন্তা করছেন। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সংগঠন—বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের সঙ্গে বসেছিলাম। তাঁরা নিজেদের মধ্যে আরও কথাবার্তা বলবেন। এরপর ইউজিসি, বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বৈঠক হবে। সে বৈঠকে ভর্তি পরীক্ষার একটা রূপরেখা বেরিয়ে আসবে আশা করি। অনলাইনের পরীক্ষা কীভাবে সবচেয়ে বেশি কার্যকর করা যায়, তা নিয়েও কথাবার্তা হচ্ছে, যাতে পরীক্ষার পর ফল নিয়ে কোনো সংশয় না দেখা দেয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবদুস সোবহান ইউজিসির তদন্তের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ইউজিসি তো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভিভাবক প্রতিষ্ঠান। একজন উপাচার্য কি এ প্রশ্ন তুলতে পারেন?

কাজী শহীদুল্লাহ: তিনি হয়তো ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে এ প্রশ্ন করেছেন। আমরা বিধিবিধানের মধ্যে থেকেই কাজ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে অভিযোগ এসেছে, তা ইউজিসির পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় আমাদের তদন্ত করতে বলেছে; আমরা তদন্ত করেছি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে। এর আগেও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ আমরা তদন্ত করেছি। বেশ কিছু ক্ষেত্রে সরকার ব্যবস্থাও নিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভিভাবক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউজিসির কি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগে ভূমিকা আছে?

কাজী শহীদুল্লাহ: ভূমিকা নেই, কিন্তু থাকা উচিত। ইউজিসিতে যাঁরা আসেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পর্কে তাঁদের জানাশোনাও বেশি। আমি মনে করি, উপাচার্য, সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে একটা মাপকাঠি থাকা উচিত। কতকগুলো একাডেমিক শর্ত পূরণ করতে হবে। উপাচার্যকে অবশ্যই গবেষণা ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে দক্ষ হতে হবে। এ নিয়ে ইউজিসির পক্ষ থেকে কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার উপাচার্য হওয়ার পরই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক অনিয়ম ও শিক্ষকদের মধ্যে রেষারেষি বেড়ে যায়। এর প্রতিকার কী?

কাজী শহীদুল্লাহ: সাধারণত একই ব্যক্তিকে দ্বিতীয়বার উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়া হয় না। দ্বিতীয়বার দিলে দলাদলি বেশি হয়। এ কারণেই আমরা নীতিমালার ওপর জোর দিয়েছি।

ইউজিসিতে যোগদানের পর আপনি কিছু চ্যালেঞ্জের কথা বলেছিলেন। এক বছর পর সেই চ্যালেঞ্জগুলো কি কমেছে?

কাজী শহীদুল্লাহ: প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল উচ্চশিক্ষার মান বাড়ানো। সেই লক্ষ্যে কিছু কাজও শুরু করেছিলাম। কিন্তু করোনা এসে সবকিছু ওলট–পালট করে দিল। করোনার শুরুতে আমরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন পাঠদানের অনুমতি দিই। তখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগ্রহ দেখায়নি। পরে তারাও এসেছে। সমস্যা হলো, আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর্থিকভাবে খুব সচ্ছল নয়। অনলাইনে পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। আমরা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বসলাম, ফোন অপারেটর কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বসলাম। সরকারি অপারেটর টেলিটক একটি প্যাকেজ দিয়েছে। অনেকে অভিযোগ করেছে, তাদের নেটওয়ার্ক দুর্বল। অন্যান্য অপারেটরের সঙ্গেও আমরা কথা বলেছি। আশা করি, শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান হবে।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবছর রাষ্ট্রপতির কাছে আপনারা উচ্চশিক্ষার হালহকিকত দিয়ে একটি প্রতিবেদন জমা দেন। এতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম–দুর্নীতিও উঠে আসে। কিন্তু প্রতিকার কতটা হয়েছে? শিক্ষার মান তো ক্রমেই নিম্নমুখী।

কাজী শহীদুল্লাহ: ইউজিসির প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে আমরা একটু পিছিয়ে আছি। ২০১৮ সালের প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে গত বছর। ২০১৯ সালের প্রতিবেদন এখনো দেওয়া হয়নি। এর মধ্যে করোনা মহামারির কারণে সবকিছু বন্ধ হয়ে গেল। তারপরও আমরা শিক্ষার কারিকুলাম উন্নয়নে কাজ করছি। প্রশাসনিক অনিয়ম দূর করতে কাজ করছি। আশা করি, পরিবেশের উন্নতি হবে। শিক্ষার মান বাড়বে। শিক্ষার মান অবনমনের আরেকটি কারণ হলো নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করা। গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমতি ছাড়াই ইতিহাস বিভাগ খুলে বসল। কোনো শিক্ষক নেই। অথচ তারা ছাত্র ভর্তি করেছে। অন্য বিভাগ থেকে শিক্ষক ধার করে পড়াচ্ছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারিত আসনের বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করছে। শিক্ষার মান উন্নয়ন করতে হলে সবখানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। আমাদের শিক্ষকেরা বিদেশে গিয়ে তো নিয়মকানুন অক্ষরে অক্ষরে মানেন। দেশে মানবেন না কেন?

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়। সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ক্ষতিটা কীভাবে পুষিয়ে নেবেন?

কাজী শহীদুল্লাহ: আমি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম এক সংকটকালে। প্রয়াত উপাচার্য আফতাব আহমাদের পর। সে সময়ে চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা ছিল। আমার মেয়াদে সেটি শৃঙ্খলায় নিয়ে এসেছি। এখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মের মধ্যে চলছে। কিন্তু সমস্যা হলো অধিভুক্ত কলেজগুলোতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের অভাব। তারপরও স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক চাপ থাকে স্নাতক সম্মান ও মাস্টার্স কোর্স খোলার জন্য। শিক্ষার সার্বিক মান বাড়াতে হলে এসব চাপের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পর্কেও নানা অভিযোগ আছে। পুরোনো আইনেই চলছে এসব বিশ্ববিদ্যালয়। সংশোধন করলেন না কেন?

কাজী শহীদুল্লাহ: আমরা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছি। সরকারি–বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই সমস্যা আছে। একশ্রেণির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য শিক্ষাদান নয়, সার্টিফিকেট বিক্রি করে অর্থ উপার্জন। একশ্রেণির শিক্ষার্থীও সার্টিফিকেট পেলে খুশি হয়। উচ্চশিক্ষায় এ প্রবণতা বন্ধ করতেই হবে।

অন্যান্য দেশে ইউজিসির নীতিনির্ধারণী ভূমিকা থাকে। আমাদের দেশে নেই। আপনারা কি ক্ষমতা বাড়াতে চান না?

কাজী শহীদুল্লাহ: ইউজিসির আরেকটু ক্ষমতা থাকলে ভালো হয়। সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে ক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। আপনার প্রস্তাব দিন। আমরা এ নিয়ে কাজ করছি। আবার প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অনেক সময় ব্যক্তির ওপরও নির্ভর করে। ব্যক্তি চাইলে অনেক কাজ করতে পারেন। না চাইলে ক্ষমতা থাকলেও পারেন না।

সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, জেলায় জেলায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হবে। অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় চলছে অভিজ্ঞ শিক্ষক ছাড়াই। অনেক বিভাগ চলছে অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক পর্যন্ত ছাড়াই।

কাজী শহীদুল্লাহ: দেশে আরও বিশ্ববিদ্যালয় দরকার। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা বা কনসেপ্টটাই অনেকে বোঝেন না। তাঁরা মনে করেন, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হলে আরও চাকরির ব্যবস্থা হবে। তাঁদের চোখে বিশ্ববিদ্যালয় আর দশটি কারখানার মতো। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞান বিতরণ করে না, জ্ঞান সৃষ্টিও করে। দক্ষ, যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষক না হলে তা কীভাবে সম্ভব? বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হলে আগে সেই পরিবেশটা তৈরি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থানীয় ও রাজনৈতিক চাপের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে।

আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে ওপরের দিকে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। ইউজিসির চেয়ারম্যান হিসেবে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

কাজী শহীদুল্লাহ: হতাশাজনক। এ ব্যর্থতা স্বীকার করতেই হবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান রক্ষার মূল কাজটি তো করবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কারিকুলাম উন্নয়নে আমরা সহায়তা করতে পারি মাত্র। এ কারণেই আমরা মেধাবী ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগের ওপর জোর দিচ্ছি। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি, তখন বেতন-ভাতার কথা চিন্তা করিনি। ভালোবেসেই শিক্ষকতা পেশা গ্রহণ করেছি। এখন সে অবস্থা অনেকটা অনুপস্থিত। মেধাবীদের অনেকে শিক্ষকতায় আসতে চান না। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। বিদেশে সরাসরি কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান না। তার আগে তাঁকে পরীক্ষা দিতে হয়। গবেষণা করতে হয়। তিনি শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে পারবেন কি না, তা–ও যাচাই করা হয়। আমাদের এখানেও সে রকম কিছু ভাবা যেতে পারে।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

কাজী শহীদুল্লাহ: আপনাকেও ধন্যবাদ।

মন্তব্য পড়ুন 0