সকালে সাড়ে ১১ টায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সন্ধ্যা ৬ টায় সরকারিভাবে শিনজো আবের মৃত্যুর ঘোষণার আগ পর্যন্ত জাপানিরা ছিল উৎকণ্ঠিত। কিন্তু ফিরে আসার প্রার্থনা ও সব প্রত্যাশাকে ফেলে অন্যদেশের যাত্রী হয়ে গেলেন ৬৮ বছর বয়সী এই নেতা।

জাপানিদের সাথে শোকাহত আমরাও। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ-জাপানের সম্পর্কে যে ব্যক্তিটির ছোঁয়ায় ভালোবাসার প্রগাঢ়তা বেড়েছে, তিনি হলেন শিনজো আবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

পড়াশুনার পাশাপাশি জাপানে সাংবাদিকতার সুবাদে প্রতিনিয়ত জাপানের খবরাখবর নিয়ে আপডেট থাকার কারণে, শিনজো আবের বিষয়ে এক ধরনের জানাশোনা তৈরি হয়েছে। যদিও ১০ মাস আগে আমি সাংবাদিকতা থেকে ইস্তেফা দিয়েছি, তবে আজকের ঘটনার পর ইমেইল চেক করতে দেখতে পেলাম, গত সাড়ে ছয় বছরে আমি ২০০টি প্রতিবেদন করেছি, যেখানে শিনজো আবের নাম বিভিন্নভাবে এসেছে। এইসব সংবাদ আওড়াতে গিয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠল, আবের দৃঢ় নেতৃত্বের কথা, তাঁর দুরদর্শীতার কথা।

বছর দুয়েক আগে হঠাৎ করে আবের প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়ার খবরে যতটা নির্বাক হয়েছিলাম, শুক্রবার সকালে গুলিবিদ্ধের পর থেকে মনের ভেতর এক ধরনের শূন্যতা অনুভব করলাম। রক্তের সম্পর্ক না থাকার পরও যেন, প্রিয়জন হারানোর টান অনুভব করছি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নিজেদের আচরণের পরিবর্তন আনা জাপানিদের ভদ্রতা পুরো বিশ্বজুড়ে প্রশংসার দাবি রাখে। শান্তিপ্রিয় এ দেশে বন্দুক ব্যবহারে কড়াকড়ি আইন থাকার কারণে এখানে অবৈধ বন্দুকের ব্যবহার একবারে বিরল ঘটনা। আর এই বিরল ঘটনাটি ঘটল জাপানের সবচেয়ে জনপ্রিয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের কপালে।

১৯৫৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রাজধানী টোকিওতে জন্ম নেওয়া শিনজো আবেকে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর জাপানের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী নেতা মনে করা হয়। বলা হচ্ছে, গত দেড় দশকের জাপানের অর্থনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে এই নেতার ভূমিকাকে সামনে রাখা হয়।

রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা শিনজো আবের নানা নবুসুকে কিশি ছিলেন জাপানের মন্ত্রী। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক করা শিনজো আবে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আগে কোবেতে একটি স্টিল কারখানায় চাকরি করেন। রাজনীতিতে যার রক্তে মিশে আছে, সে কীভাবে এই চাকরিতে টিকবে? তাই আশির দশকে ওই কোম্পানির চাকরি থেকে ইস্তেফা দিয়ে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি বা এলডিপির সাধারণ সম্পাদকের ব্যক্তিগত সচিব হন তিনি। সেখান থেকে রাজনীতিতে পথচলা শুরু তাঁর। অত্যন্ত কম জনপ্রিয় ওই দলটির টিকিটে ১৯৯৩ সালে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন শিনজো আবে। পরবর্তীতে দলটির নেতৃত্বের বলয়ে তিনি মন্ত্রী পরিষদের মূখ্য সচিব হন ২০০৫ সালে। এর কিছুদিন পর ২০০৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে এক বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে দেশের নেতৃত্বে আসেন তিনি।

২০১২ সালের ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে আবের দল এলডিপি জয়ী হওয়ার পর আবারও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। ২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর পর বেশি আয়, বেশি ব্যয় ও বেশি করের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে শিনজো আবে। এই ক্ষেত্রে দেশের কর ৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ৮ শতাংশে করা হলে জাপানিদের মধ্যে কিছুটা ক্ষোভের সঞ্চার হয়। ক্ষমতা পূর্ণ হওয়ার আগেই ফের ২০১৪ সালে জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করে আবে সরকার।

এই মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর জাপানের ইতিহাসে বেশ কিছু পরবর্তন আনেন তিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ক্ষতকে ভুলতে জাপান আইন করে দেশটির সৈন্যদের বহিঃযুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ বন্ধ করে দেয়। যে কারণে, মিত্রদেশগুলোর ডাকে কিংবা জাতিসংঘের শান্তি রক্ষায় জাপানি সৈন্যদের উপস্থিতি ছিল না। এমনকি উত্তর কোরিয়ার সীমাহীন রকেট উৎক্ষেপণ, জাপান সাগরে চীনের আধিপত্যর হুঙ্কার আর বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী কার্যক্রমের প্রেক্ষিতে নিজেদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ওই আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয় আবে সরকার। যদিও ২০১৫ সালে ১৯ সেপ্টেম্বর ওই আইন পাশের আগে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে, পার্লামেন্টে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে, তবে প্রতিরক্ষার ওই বিলটি পাস করা থেকে কিছুতে পিছপা হয়নি আবে সরকার। আর এর মধ্যে দিয়ে জাপানি সৈন্যরা প্রয়োজনে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে শত্রুদের মোকাবেলা করার সুযোগ পায়।

১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের ভূমিকার জন্য জাপান রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমা চায়নি। তবে শিনজো আবের নেতৃত্ব থাকাকালীন তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের বিতর্কিত ভূমিকার জন্য বেশ কয়েকবার ক্ষমা চান। ২০১৫ সালের আগস্টে যুদ্ধের সত্তরতম বার্ষিকী উদযাপনের সময় চীন ও দ. কোরিয়ার কাছে ‘আন্তরিক ক্ষমা’ চান। এমন কি দ. কোরিয়ার ‘যৌনদাসী’, যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানি সৈন্যদের হাতে সম্ভম হারিয়েছিলেন, তাঁদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার মধ্য দিয়ে জাপানের উদারতা বিশ্ববাসীর কাছে প্রস্ফূটিত হয়।

শুধু তাই নয়, পরের বছর ২০১৬ সালে সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে হিরোশিমায় নিয়ে আসেন তিনি। হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা হামলার পর প্রথম কোনো মার্কিন সরকারপ্রধানের হিরোশিমায় সফর ছিল। শুধু তাই নয়, ওই বছরই আবে পার্ল হাবারে ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর জাপানি সৈন্যদের আক্রমণে নিহত ২৪০০ মার্কিন নৌ সেনা ও কয়েক ডজন জাপানি সৈন্য নিহতের স্মরণ করতে সেখানে যান। এ ছাড়াও রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের পারদ কিছুটা হলেও কমিয়ে এনেছিলেন আবে ও তাঁর সরকার।

এরই মধ্যে দেশটির সম্রাট আকিহিতো সিংহাসন ছাড়ার জন্য আইন প্রণয়নে আবের ভূমিকা প্রশংসনীয় বটে। ঐতিহাসিক ওই আইনের বলয়ে আকিহিতো সিংহাসন ত্যাগ করে তাঁর ছেলে নারুহিতোকে ক্ষমতায় আনেন।

শিনজো আবে জাপানিদের কাছে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশেও তিনি জনপ্রিয়তা গড়েছেন নিজের কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে। বাংলাদেশ সফর করেছেন, দেশের উন্নয়নে বড় বড় প্রকল্পে অনেকটা নিঃসংকোচে বরাদ্দ দিয়ে গিয়েছেন তিনি। ২০১৬ সালে ঢাকায় হোলি আর্টিজানে সন্ত্রাসী হামলার পর অন্যান্য দেশ বাংলাদেশের কাছ থেকে সরে যাচ্ছিল, তখন নিজেদের সাত নাগরিক নিহত হওয়ার পরও তিনি বাংলাদেশের প্রতি আস্থার সম্পর্ক অটুট রাখার ঘোষণা দেন। তাঁর এই ঘোষণার মধ্যে দিয়ে অনেকের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল, দুই দেশের সম্পর্ক এতোটুকু ফাটল ধরেনি।

তবে প্রধানমন্ত্রিত্ব থাকাকালিন নিজের কোনো কর্মকাণ্ডে বির্তকে না জড়ালেও স্ত্রীর জন্য কিছুটা সমালোচিত হন তিনি। ২০১৮ সালে ২৮ মার্চ ওসাকার তয়োনাকা সিটিতে স্কুলের জমি ক্রয় সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর স্ত্রী প্র্রধানমন্ত্রী দপ্তরের প্রভাব খাটিয়ে জাল নথি তৈরির করার বিষয়টি গণমাধ্যমে সমালোচিত হওয়ার পর তিনি নিজে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চান।

করোনার মধ্য দেশের অর্থনীতি যখন নড়বড়ে তখন তিনি প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করেন। পুরো জাপানজুড়ে মাথাপিছু অর্থ সহায়তা দিয়ে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে এগিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। ২০২০ সালে দীর্ঘস্থায়ী অন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পর কয়েক মাস অন্তরালে থাকলেও নির্বাচনে দলের নেতাদের প্রচারণায় সব সময় সরব থেকেছেন। তাঁর আর্শীবাদপুষ্ট হয়ে ইয়োশিহিদে সুগা প্রধানমন্ত্রিত্ব করে কিশিদার কাঁধে তুলে দেন, যেখানে অনুঘটক হিসেবে পর্দার আড়ালে ছিলেন শিনজো আবে।

শিনজো আবে জাপানিদের কাছে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশেও তিনি জনপ্রিয়তা গড়েছেন নিজের কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে। বাংলাদেশ সফর করেছেন, দেশের উন্নয়নে বড় বড় প্রকল্পে অনেকটা নিঃসংকোচে বরাদ্দ দিয়ে গিয়েছেন তিনি। ২০১৬ সালে ঢাকায় হোলি আর্টিজানে সন্ত্রাসী হামলার পর অন্যান্য দেশ বাংলাদেশের কাছ থেকে সরে যাচ্ছিল, তখন নিজেদের সাত নাগরিক নিহত হওয়ার পরও তিনি বাংলাদেশের প্রতি আস্থার সম্পর্ক অটুট রাখার ঘোষণা দেন। তাঁর এই ঘোষণার মধ্যে দিয়ে অনেকের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল, দুই দেশের সম্পর্ক এতোটুকু ফাটল ধরেনি।

সবচেয়ে মজার বিষয় ছিল, ওই বছরই জি-৭ আয়োজক দেশ হওয়ায় তিনি এশিয়ার যে কয়েকটি দেশকে আমন্ত্রণের সুযোগ দিয়েছেন, সেখানে দ. এশিয়ার একমাত্র দেশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু যদি জাপান হয়, সেখানে শিনজো আবেকে তার মূল অনুঘটক বলা মোটেই অমূলক হবে না। যদিও জাপানের পররাষ্ট্রনীতি অনেক প্যারামিটারের উপর নির্ভর করে। তবে বাংলাদেশের প্রতি শিনজো আবের যে সহানুভূতি ছিল, তা আমরা সুগা কিংবা কিশিদার মধ্যে দেখতে পাইনি। শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের সাথে জাপানের সম্পর্ক উন্নয়নে বড় ভূমিকায় ছিলের আবে। কয়েক দফা ভারত সফরে গিয়ে জাপানের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক শিনজো আবের ফসল ছিল।

আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারানো আবের এই প্রস্থান মেনে নেওয়ার মতো নয়। বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব শিনজো আবের প্রস্থান কখনো পূরণ হওয়ার নয়। তাঁর মতো নক্ষত্রের ছোঁয়ায় জাপানের যে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছিল, তা থেমে যাবে না গতিশীল থাকবে তা সময় বলে দেবে। তবে আপাতত দৃষ্টিতে শিনজো আবের এই অপ্রত্যাশিত মৃত্যু জাপানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলবে। শান্তিপ্রিয় জাতির তিলকে কলঙ্কমোচনে দায়ভার জাপানিদের উপর এলো।

ঘাতকের বুলেটে শিনজো আবে হয়তো মহাশূন্য হারিয়ে গেছেন, তবে তাঁর ফেলে যাওয়া কর্ম তাঁকে বেঁচে রাখবে, জাপানিদের হৃদয়ে, বিশ্ববাসীর হৃদয়ে। এই মহান ব্যক্তির প্রয়াণে শ্রদ্ধা জানাই।

  • ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাপান। [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন