একজন ঝানু সাংবাদিক ছিলেন তিনি। তাঁর সাহসী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের কণ্ঠস্বর সারা বিশ্বে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। সাংবাদিকতা পেশায় অনেক ঝানু সাংবাদিক আসেন আবার তাঁরা চলেও যান। কিন্তু শিরিন ছিলেন পুরোপুরি ব্যতিক্রম। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে তিনি সাংবাদিকতায় লেগে থেকেছেন। তাঁর জন্মভূমি যারা দখল করে নিয়েছে, তাদের মুখোমুখি হয়েছেন। নির্বাক ফিলিস্তিনিদের তিনি সচকিত স্বর দিয়েছেন।

শিরিনের স্বর ছিল অবিচলিত, উত্তাপহীন ও বিশ্বাসযোগ্য। যেকোনো পরিস্থিতিতে তিনি ছিলেন শান্ত ও স্থির। এমনকি সবচেয়ে ভয়ানক পরিস্থিতি এবং রক্তক্ষয়ী ঘটনার মধ্যে থেকেও তিনি যখন খবর পরিবেশন করেছেন, সে সময়েও তাঁর ভেতরে উত্তেজনার কোনো ছাপ দেখা যেত না। সাংবাদিকতায় এমনটা শুধুই কল্পনা করা যেতে পারে। ফিলিস্তিনের রাস্তায় তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন কিংবা সংবাদ সংগ্রহ করতে শরণার্থীশিবিরের সরু গলিতে গিয়েছেন। বিশ্বের কাছে তিনি নানা ঘটনা এত বাগ্মিতার সঙ্গে এবং এত স্বচ্ছতা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তুলে ধরতেন যে সেটাতে জাদুকরী একটা বিষয় থাকত। সব সময় তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। তাঁর বিবেচনাবোধ ছিল অসাধারণ। কখনোই নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতেন না।

আরবিতে শিরিনের অর্থ হচ্ছে, নিষ্কলুষ সুন্দর। শিরিন আবু আকলেহ তেমনটাই ছিলেন। আজকের দিনটা আমরা শিরিনের জন্য শোক করি। আগামীকাল তাঁর খুনিদের আমরা ঘৃণা করব।

একজন সাংবাদিকের এমন গুণ সত্যিই চমকপ্রদ। শিরিন একজন যুদ্ধ সাংবাদিক ছিলেন। অথচ তাঁর হৃদয় ছিল দয়ায় পূর্ণ। চরম অমানবিক পরিবেশের মধ্যে তিনি ছিলেন অবিশ্বাস্য রকম মানবিক। শিরিন ছিলেন একজন দরদি সাংবাদিক। জন্মভূমি ফিলিস্তিনের দুঃখ-কষ্ট তুলে ধরার ক্ষেত্রে প্রেম ও যন্ত্রণার মিশেলে সেই দরদের প্রকাশ ঘটত। ফিলিস্তিনের হৃদয় বলে খ্যাত জেরুজালেমে জন্মেছিলেন শিরিন। ১৯৬৭ সালে ইসরায়েল যুদ্ধ ও দখলদারির ঠিক পরেই তাঁর জন্ম হয়েছিল। বেথলেহেমের খ্রিষ্টান পরিবার থেকে আসা শিরিন পড়াশোনা করেছেন সাংবাদিকতায়। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থায় শিরিন তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। এমআইএফটিএএইচ নামে একটি সংস্থায় সংলাপ ও গণতন্ত্র নিয়েও কাজ করেন। এরপর সাংবাদিকতার জীবন বেছে নেন।

১৯৯৭ সালে আল–জাজিরায় কর্মজীবন শুরু করেন। ২৫ বছর ধরে গাঢ় অন্ধকার এক যুগের মধ্যে আলোকপ্রভার মতো তিনি তাঁর কাজ করে গেছেন। তাঁর সময়ে তিনি ছিলেন মহান, কখনোই তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। যুদ্ধ সাংবাদিক হিসাবে সুপরিচিত হলেও কয়েক দশক ধরে শিরিন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাও করেছেন। অপরাধবিষয়ক ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য-প্রমাণ জড়ো করা, সূত্র খোঁজার সঙ্গে অপরাধীদেরকে সামনে নিয়ে আসতেন শিরিন। স্মৃতিপটে একটা পুরোনো সংবাদের ভিডিও ঘুরছে। তরুণ শিরিন যেখানে স্থির আত্মবিশ্বাসে কীভাবে তিনি দখলদারির মধ্যে বেড়ে উঠেছেন, সেটা বলে চলেছেন। এই দখলদারি ইতিমধ্যে অর্ধশতাব্দী পেরিয়েছে। আর এর অবসান কবে হবে, তার কোনো নজির দেখা যায় না।

আসুন, গতানুগতিক ধারণা আর ষড়যন্ত্রতত্ত্ব দিয়ে শিরিনের স্মৃতিকে ক্ষতবিক্ষত করা থেকে বিরত থাকি। শিরিন কখনো কোনো কাজ গতানুগতিকভাবে করতেন না।

ইসরায়েলি দখলদারত্বের নির্মম শিকার শিরিন। কে বা কোন সৈন্যটি তাঁকে গুলি করেছে, সেই বিবেচনা এখানে অর্থহীন। ভোরবেলা তাঁকে যদি খুন করতে না পারত, তাহলে বিকেলবেলায় শিরিনের বাড়ি আক্রমণ করতে যেত ইসরায়েলের নিরাপত্তা বাহিনী। কেন? কারণ, তারা এমনই। বাদবাকি আমরা যারা, শিরিনের ভক্ত, বন্ধু ও পরিবারের সদস্য—আসুন, আমরা সবাই মিলে শিরিনকে সম্মান জানাই। বছরের পর বছর ধরে ভালোবাসা আর আন্তরিকতার সঙ্গে শিরিন আমাদের শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। শিরিনের দেখানো পথেই আসুন আমরা তাঁকে শেষশ্রদ্ধা জানায়।

আরবিতে শিরিনের অর্থ হচ্ছে, নিষ্কলুষ সুন্দর। শিরিন আবু আকলেহ তেমনটাই ছিলেন। আজকের দিনটা আমরা শিরিনের জন্য শোক করি। আগামীকাল তাঁর খুনিদের আমরা ঘৃণা করব।

আল-জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ
মারওয়ান বিশারা আল-জাজিরার জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন