default-image

‘চরে শতভাগ বাল্যবিবাহ হয়, কিন্তু গ্রামের মানুষ কেউ মুখে স্বীকার করেন না।’ প্রথম আলোয় প্রকাশিত ২৫ জুলাইয়ের একটি প্রতিবেদনে রাজশাহীর একটি চরের অবস্থা এভাবেই তুলে ধরা হয়েছে। এ বাস্তবতা শুধু যে রাজশাহীর চরাঞ্চলে ঘটেছে, তা নয়। সারা দেশের চরগুলোতে একই অবস্থা। তবে চরাঞ্চল ছাড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যেও বাল্যবিবাহের হার কম নয়।

সব আয়োজন কি ব্যর্থ

জন্মনিবন্ধন, বাল্যবিবাহ রোধে কড়া আইন, সামাজিক সচেতনতা কর্মসূচি, অবৈতনিক শিক্ষা, স্কুল মিল, কাজিদের প্রশিক্ষণ—এত কিছুর পরও দেশে বাল্যবিবাহ রোধ করা যাচ্ছে না। এর প্রধানত কারণ, বাল্যবিবাহ রোধে যত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে, তা কর্মসূচি কিংবা বক্তব্যসর্বস্ব। যদি এগুলোর প্রয়োগ যথাযথ হতো, তাহলে বাল্যবিবাহ অনেক আগেই এ ভূখণ্ড থেকে বিদায় নিত। আমাদের সরকারি-বেসরকারি এত উদ্যোগ, এত কর্মসূচি, এত বক্তৃতা সেসবের ফল কি চরাঞ্চলে শতভাগ বাল্যবিবাহ?

বাল্যবিবাহ সহজ

দরিদ্র পরিবারে, বিশেষ করে মেয়েদের কম লেখাপড়া হলে বিয়ে দেওয়া সহজ। মেয়ে যদি এসএসসি পাস করে তাহলে কমপক্ষে এসএসসি পাস ছেলে বর হিসেবে খোঁজা হয়। নয়তো সমান শিক্ষা তো থাকা চাই। বেশি শিক্ষিত ছেলে হলে যৌতুকও বেশি লাগে। ছোট মেয়ের বিয়ে দিতে চাইলে অনেক ছেলে পাওয়া যায়। মেয়ের বয়স বাড়তে থাকলে বিয়ের ছেলে পাওয়া কঠিন হতে থাকে।

চরাঞ্চলে বাল্যবিবাহ কেন বেশি

বাল্যবিবাহ না হওয়ার জন্য যে পারিবারিক-বাস্তবতা থাকতে হয়, চরাঞ্চলে তার সবটাই অনুপস্থিত। চরাঞ্চলে শিক্ষার অভাব, অর্থের অভাব, সচেতনতার অভাব, আইনে প্রয়োগ নেই, কর্মসংস্থানের অভাব, যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল, সর্বোপরি স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নের অভাব। ফলে চরাঞ্চলে বাল্যকালই বিয়ের বয়স। বাল্যকাল উতরে গেলে আর বিয়ের বয়স সেখানে থাকে না। সেটি হয় লেট ম্যারেজ।

দারিদ্র্য

বিত্তবানদের পরিবারে বাল্যবিবাহের হার এখন প্রায় নেই বললেই চলে। নিম্নমধ্যবিত্তের সন্তানেরাও এখন লেখাপড়া করে। ন্যূনতম সামর্থ্য আছে এমন মা-বাবারা সন্তান ছেলে হোক মেয়ে হোক তাদের পড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু যারা বিত্তহীন, সন্তানকে পড়ানোর স্বপ্নটুকু দেখার সাধ্য নেই, তারা সন্তানকে বিয়ে দেওয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকেন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাল্যবিবাহের প্রবণতা বেশি। চরে এখন যঁারা মা-বাবা হয়েছেন, তঁাদেরও বিয়ে হয়েছে শিশু অবস্থায়। ফলে সন্তানকেও তাঁরা সে রকমই জ্ঞান করেন। ফলে যত দ্রুত পারেন, মেয়ের বিয়ে দিতে চান অভিভাবকেরা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকা

অনেক চরে প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। এক চর থেকে আরেক চরে গিয়ে লেখাপড়া করা কঠিন। বন্যার সময় নৌকা লাগে আর শুষ্ক মৌসুমে দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়। লেখাপড়া না জানা মা–বাবারা সন্তানদের লেখাপড়াও করানোর কোনো পথ পান না। ফলে যাঁদের মনে সন্তানের লেখাপড়ার মৃদু আকাঙ্ক্ষা থাকে, তাঁরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া সহজ হয় না বলে বিয়ের দিকেই বেশি মনোযোগ দেন।

বাল্যবিবাহে যৌতুক কম

দরিদ্র পরিবারে এখন যৌতুক ছাড়া বিয়ে প্রায় নেই বললেই চলে। মেয়ের বাবা ছোটবেলা থেকে মেয়ের বিয়ের জন্য টাকা জমান, গরু-ছাগল পালন করতে থাকেন। কোন এনজিও থেকে ঋণ গ্রহণ করবেন, সেটিও ঠিক করা থাকে। অনেকেই মহাজনদের কাছে উচ্চ সুদে ঋণ নেন। সে জন্য মেয়েকে যত কম যৌতুকে বিয়ে দেওয়া যায়, ততই ভালো মনে করেন। বর্তমানে সবচেয়ে গরিব পরিবারের মেয়ের বিয়েতে কখনো কখনো লাখ টাকাও প্রয়োজন হয়। যেহেতু কম বয়সী মেয়ের বিয়ের অনেক ছেলে পাওয়া যায়, তাই যৌতুকও কম লাগে। অসহায় মা–বাবারা তাই কম মূল্যে প্রাপ্ত বরের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেন।

৯৯৯ নম্বরের হাল কী

৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়ে জানালেই সরকারি তৎপরতায় বিয়ে বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু কে এ কাজ করবে? যে মেয়ের বিয়ে হচ্ছে, সে তো নিজের চোখর সামনে তিন বেলা খাওয়ার নিশ্চয়তা পায় না। ছেলেটির ওপরও থাকে মা–বাবার চাপ। তাদের সামনে যে অফুরান সম্ভাবনা আছে, এ স্বপ্ন তাদের মধ্যে কেউ কোনো দিন রোপণও করে দেয়নি। তারা তো তার চারপাশে বাল্যবিবাহ দেখেই বড় হয়েছে। তাদের বিয়েও যে শিশুকালে হবে, এটা ধরে নিয়ে মনে মনে তারাও প্রস্তুত থাকে বাল্যবিবাহের জন্য। ফলে ৯৯৯ নম্বরে ফোন দেওয়ার বিষয়টি জানলেও প্রয়োজন পড়ে না।

বাল্যবিবাহ উপেক্ষার উপায় নেই

রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় তিস্তা চরের এক ব্যক্তির কাছে শুনেছিলাম, সেখানে ১৮ বছরের নিচে ছাড়া ওপরে কোনো ছেলেমেয়ের বিয়ে হয় না। মা-শিশুর কোলে শিশুসন্তানের দৃশ্য চরাঞ্চলে স্বাভাবিক দৃশ্য। এসব বন্ধ করতে হলে আইনের প্রয়োগ থাকতে হবে। অভিভাবকদের প্রতি আরও কঠোর হতে হবে। চরাঞ্চলগুলোতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়াতে হবে। বিয়েতে যৌতুক বন্ধ করতে হবে। শিক্ষায় সবার সমান অধিকার থাকতে হবে। উন্নত জীবনের তথা স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নের বীজ শৈশবেই ছেলেমেয়েদের মধ্যে রোপণ করতে হবে। বাল্যবিবাহ হলে শারীরিক-সামাজিক অসুবিধা আছে, শুধু এ কথা বললেই বাল্যবিবাহ বন্ধ হবে না। বাল্যবিবাহের সব অনুষঙ্গই দূর করতে হবে।

তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক

wadudtuhin@gmail.com

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন