আজ পয়লা মে, মহান মে দিবস। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে প্রেরণা দানকারী এই দিনটি সারা বিশ্বের শ্রমিকসমাজের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। শিকাগোর হে মার্কেটে শ্রমিকদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে যে ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় দেশে দেশে শ্রমিকশ্রেণি মে দিবসকে মুক্তির দিশারি হিসেবে গর্ব ও প্রত্যয়ের সঙ্গে পালন করে আসছে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে বিভিন্ন স্লোগানে এই দিবসটি পালিত হয়। উন্নত দেশগুলোয় শ্রমিকেরা তাঁদের অধিকার আরও সংহত করার আওয়াজ তোলেন এই দিনে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোয় মে দিবস দাবি ও অধিকার আদায়ের দিন হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। শ্রমিকেরা উৎসবমুখর পরিবেশে দিনটি পালন করে থাকেন। সভা–সমাবেশ ও লাল পতাকার মিছিলের মাধ্যমে রাজপথকে মাতিয়ে রাখেন শ্রমিকেরা।

এবারের মে দিবসের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস গোটা পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই বন্ধ রয়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বন্ধ রয়েছে কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য গত ২৬ মার্চ থেকে আমাদের দেশে সাধারণ ছুটি (অঘোষিত লকডাউন) চলছে। এর ফলে বাংলাদেশেও বন্ধ রয়েছে ছোট–বড় সব কলকারখানা, অফিস–আদালত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।

আমাদের দেশে পরিবারসহ প্রায় ৭ কোটি শ্রমজীবী মানুষ রয়েছে। গার্মেন্টস, নির্মাণ, প্রবাসী শ্রমিক, পাট, চা, চামড়া, পরিবহন, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, রাবার, স্টিল, রি-রোলিং, চিংড়ি চাষ, শিপ ব্রেকিং, চাতাল, সুতা, সিরামিক, প্লাস্টিক, রিকশা, গৃহশ্রমিকসহ প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মরত এসব শ্রমিক হলেন বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। তাঁদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে বৃদ্ধি পেয়েছে আমাদের দেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার।

দেশে সাধারণ ছুটির কারণে রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি বন্ধ থাকায় সরকার এই শিল্পের শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের জন্য ২ শতাংশ সুদে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু এখনো অনেক শিল্পকারখানার শ্রমিকদের মার্চ মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়নি। একই সঙ্গে মহামারি চলাকালে সময় কোনো শ্রমিককে চাকরিচ্যুত কিংবা কোনো কারখানা বন্ধ না করার সরকারি নির্দেশনা থাকলেও গার্মেন্টস, ট্যানারিসহ অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে এবং কারখানা লে-অফ করা হচ্ছে। অথচ এই সময় মালিকদের উচিত ছিল খানিকটা উদার হয়ে নাগরিক দায়িত্ব এবং শিল্পের ভবিষ্যৎ বিকাশের প্রয়োজনেই নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষকে বাঁচিয়ে রেখে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

লকডাউনের ফলে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে গণপরিবহন। এতে লাখ লাখ পরিবহনশ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। বন্ধ রয়েছে নির্মাণশ্রমিকদের কাজ। বন্ধ রয়েছে ট্যানারি, শিপ ব্রেকিং, চিংড়ি, চাতাল, হোটেল রেস্টুরেন্টসহ সব অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকের কাজ। পরিবার–পরিজনসহ এসব সেক্টরের শ্রমিকেরা অর্ধাহারে–অনাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। গার্মেন্টস সেক্টরের জন্য কিছু প্রণোদনা প্রদান করলেও পরিবহন, নির্মাণ, ট্যানারি, চিংড়ি, শিপ ব্রেকিং, চাতাল, হোটেল রেস্টুরেন্টসহ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত পুরোপুরিভাবে বন্ধ থাকলেও তাঁদের বেতন-ভাতা ও জীবন–জীবিকার কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি।

ঢাকাসহ বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোয় লাখ লাখ গৃহশ্রমিক কাজ করতেন। আজ এসব গৃহশ্রমিকের কোনো কাজ নেই। এসব শ্রমিকের উপার্জনেই তাঁদের পরিবারের জীবিকা নির্বাহ হতো। তাঁদের কাজও বন্ধ, বেতনও বন্ধ। তাঁরা বর্তমানে আরও বেশি মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এখন পর্যন্ত তাঁদের বিষয়েও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

এই মহামারি যেহেতু সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে, সে কারণে প্রবাসী শ্রমিকেরাও আজ সেখানে কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। অথচ লাখ লাখ প্রবাসী শ্রমিক হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল ও সমৃদ্ধ করেছেন। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে প্রবাসী শ্রমিকদের সাহায্য ও তাঁদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টিও আজ গুরুত্বপূর্ণ।

সরকার দেশব্যাপী নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে ত্রাণ বিতরণ করছে। ১০ টাকা মূল্যের চাল বিক্রয় করছে। ন্যায্য মূল্যে তেল, চিনি, ডালসহ অন্যান্য সামগ্রীও বিক্রয় করছে। কিন্তু তা একেবারেই যৎসামান্য। এগুলো কোনোভাবেই নিম্ন আয়ের মানুষের খেয়ে–পরে বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়। তা ছাড়া এসব ত্রাণসামগ্রী বিলিবণ্টনে অহরহ চুরি ও অনিয়মের বিষয়টি প্রতিনিয়ত পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনে প্রচারিত হচ্ছে।

শ্রমজীবী মানুষই হলো সব সৃষ্টি–উৎপাদনের মূল কারিগর। তাই শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে, শিল্পের বিকাশের স্বার্থে এবং মহামারি–পরবর্তী সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলার স্বার্থে এই শ্রমিক, কর্মচারী, মেহনতি মানুষকে তাঁদের পরিবার–পরিজনসহ খেয়ে–পরে স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরি।

সে কারণে পরিবহন, নির্মাণ, ট্যানারিসহ সব অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের দুই মাসের খাদ্য সরবরাহ এবং দুই মাসের বেতন প্রদান করা আজ সময়ের দাবি। কারণ, এসব শ্রমিক টিকে থাকলেই দেশের শিল্প ও অর্থনীতি টিকে থাকবে। এমতাবস্থায় শিল্পমালিকদেরই তাঁদের শিল্পকারখানা রক্ষার স্বার্থেই শ্রমিকদের অধিকার ও তাঁদের সুরক্ষায় উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে এবং সরকারকেও দেশ ও শিল্পের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে হবে।

ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন