এ বছর ১০০-এর মধ্যে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ স্কোর হচ্ছে ৩৬ দশমিক ৬৩। এক বছরে এ স্কোর কমেছে ১৩ দশমিক ২৬। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার এত দ্রুত অবনতি ঘটেছে খুব কম দেশেই। যেসব দেশ নিজেদের গণতান্ত্রিক দেশ বলে দাবি করে, তাদের পাশাপাশি রাখলে সহজেই ভয়াবহ রকমের পতনের বিষয়টি বোঝা যায়। এ অবস্থান বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার তালিকায় সবচেয়ে নিচেই রেখেছে। কিন্তু বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার এ পতনের বিষয় উপলব্ধি করার জন্য কেবল গত বছরের সঙ্গে তুলনা করলে হবে না, গত এক দশকের ধারাবাহিকতার মধ্যে তাকে আনতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের বোঝা দরকার, এ পরিসংখ্যান কোন বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্রমাবনতির কারণগুলো আলোচনা ছাড়া এ তালিকা ও পরিসংখ্যান নিয়ে কথাবার্তা বা ক্ষোভ প্রকাশ এ অবস্থা বদলের কোনো পথে দেখাতে পারবে না।

আরএসএফের গত বছরগুলোর হিসাবে দেখা যায়, ২০১১ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৫৭। পরবর্তী বছরগুলোয় এ স্কোর কমেছে। সামান্য উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা আর কখনোই ২০১১ সালের জায়গার ফিরে আসেনি। ২০২২ সালে যখন আমরা মোট স্কোর ৩০ দশমিক ৬৩টি উপস্থিত হতে দেখি, তখন আমাদের স্মরণ করা দরকার, এটি প্রায় এক দশক আগের চেয়ে ২৬ দশমিক ৩৭ পয়েন্ট কম।

খুব মোটাদাগে বললে ২০১১ সালে বাংলাদেশের সংবাদক্ষেত্র যতটা স্বাধীনতা ভোগ করত, এখন তার অর্ধেকও ভোগ করে না। বাংলাদেশের সংবাদক্ষেত্র ২০১১ সালেও ছিল অনেক বেশি শৃঙ্খলিত। সেখান থেকে যখন তা অর্ধেকে নেমে আসে, তখন এটা বোঝা দুরূহ নয় যে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ২০১১ সালকে এ বিবেচনার সূচনা বা ভিত্তিবর্ষ হিসেবে বিবেচনার দুটি কারণ আছে।

প্রথমত, আরএসএফের হাতে যে তথ্য আছে, তাতে বাংলাদেশের অবস্থা সে সময়েই ছিল সবচেয়ে ভালো। যেকোনো তুলনামূলক বিবেচনায় আমাদের নিতে হবে সে বছরকেই, যা দেশটির সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সময়কে প্রতিনিধিত্ব করে। এই ভিত্তিবর্ষ নেওয়া হয়েছে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এ দফায় ক্ষমতায় আসার পর। এটি হচ্ছে একই দলের ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় পরিস্থিতির বিবেচনা করা।

দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতি, বিশেষ করে শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি বড় ঘটনা ঘটে। সেটি হচ্ছে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করা। এর মধ্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অবসান ঘটে। তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা বাতিলের মধ্য দিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে সংঘাতময় অবস্থার আশঙ্কা তৈরি হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, ক্ষমতাসীনদের তত্ত্বাবধানে এর পরে দুটি ‘নির্বাচন’ অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেগুলোকে না অন্তর্ভুক্তিমূলক, না সুষ্ঠু বলে বর্ণনা করা যায়।

এ সময়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও নির্বাচনী ব্যবস্থায় বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে। এর অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রত্যক্ষভাবেই আছে। ফ্রিডম হাউসের তথ্য আমাদের অবস্থাটি বুঝতে সাহায্য করে। সার্বিকভাবে বাংলাদেশের গণতন্ত্র স্কোর ২০১১ সালে ছিল ৬০। ২০২২ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে ৩৯।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কতটা অবনতি ঘটেছে, তা বোঝা যায় বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থাকে কীভাবে বর্ণনা করছে, তা দিয়ে। জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠান বার্টেলসম্যান ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত এ বছরের প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে বলা হয়েছে ‘মডারেট অটোক্র্যাসি’ বা ‘পরিমার্জিত স্বৈরতন্ত্র’।

একই সময়ে সবচেয়ে বড় ধরনের ধস নেমেছে নির্বাচনী ব্যবস্থায়। ২০১১ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৯, যা ২০২২ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৪-এ, অর্থাৎ অর্ধেকের চেয়েও কম। স্বাভাবিক কারণেই বড় ধরনের পতন ঘটেছে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে। সূত্র: ফ্রিডম হাউস।

অনেকে এ প্রশ্ন করতে পারেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার যোগাযোগ কোথায়। নির্বাচনী প্রক্রিয়া হচ্ছে একটি শাসনব্যবস্থার অন্যতম জবাবদিহির ব্যবস্থা। একে বলা হয় ভার্টিক্যাল অ্যাকাউন্টিবিলিটি বা খাড়াখাড়ি জবাবদিহি। সংবাদমাধ্যম হচ্ছে এমন এক ব্যবস্থা, যা ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির মুখোমুখি করে। একে বলা হয় হরাইজন্টাল অ্যাকাউন্টিবিলিটি বা আনুভূমিক জবাবদিহি। যে শাসনব্যবস্থায় নির্বাচনের মতো মৌলিক জবাবদিহির ব্যবস্থা দুর্বল বা অনুপস্থিত, সেখানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা অবারিত হতে পারে না।

ফলে আরএসএফের বার্ষিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আসলে কেবল সংবাদমাধ্যমের বিষয় নয়, বলা যাতে পারে এটি দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির ইঙ্গিত। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের এ পরিস্থিতিকে এই সার্বিক অবস্থার আলোকেই বিবেচনা করতে হবে।

সামগ্রিক এ রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত আছে সুনির্দিষ্টভাবে সংবাদমাধ্যমের কতিপয় দিক, যা স্বাধীনতার পথে বড় রকমের বাধা তৈরি করে আসছে। এগুলোর কিছু আইনি এবং কিছু আইনবহির্ভূত। এর মধ্যে চারটি বিষয়কে সহজেই চিহ্নিত করা যায়।
এগুলো হচ্ছে প্রচলিত আইন, সাংবাদিকদের ওপরে প্রত্যক্ষ হামলা, সাংবাদিকদের দলীয়করণ এবং গণমাধ্যমের মালিকানা।

২০১৩ সালে সংশোধিত আইসিটি অ্যাক্ট–২০০৬ এবং পরে তার চেয়েও কঠোর বাধানিষেধ–সংবলিত ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট–২০১৮ কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ২০১৮ সালের অক্টোবরে কার্যকর ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট যে মতপ্রকাশে বাধা হয়ে উঠবে, সেটা সবাই জানতেন এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল। কিন্তু সরকার তা উপেক্ষা করেছে। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৬ মাসে এই আইনের প্রয়োগ বিষয়ে গবেষণা চালিয়ে আমি দেখিয়েছি, এ সময়ে অন্ততপক্ষে ২০৭ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে এ আইনে অভিযোগ আনা হয়েছে এবং ৫৯ জনকে আটক করা হয়েছে (ঢাকা: সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ, এপ্রিল ২০২২)। এ আইনের শিকার কেবল সাংবাদিকেরাই হননি; গোটা সমাজেই এর প্রভাব পড়েছে। কিন্তু এর ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছে এবং সেলফ সেন্সরশিপ স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের ব্যবহারও আমরা দেখেছি।

আইনের বাইরেও বিভিন্ন রকমের চাপের কথাও শোনা যায়। কিন্তু যা সহজে দৃশ্যমান, তা হচ্ছে প্রত্যক্ষ হামলা। প্রকাশ্যেই ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা সাংবাদিকদের ওপরে চড়াও হন। হেলমেট পরিহিত এই বাহিনীর আক্রমণের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা থেকে এটা স্পষ্ট যে এ বাহিনীর সদস্যরা একধরনের দায়মুক্তি উপভোগ করেন। এ ধরনের আক্রমণের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আটক করা হলেও সাংবাদিকদের ওপরে হামলার জন্য তাঁদের বিচার, এমনকি ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের ভর্ৎসনা পর্যন্ত শুনতে হয় না।

এ রকম পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে এবং এ নিয়ে সাংবাদিকেরা সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদ পর্যন্ত করেন না। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে সাংবাদিকদের দলীয়করণ। সাংবাদিকতা এবং সাংবাদিকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য যে সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোর কাজ করার কথা, তারা দলীয় পরিচয়ে বিভক্ত হয়েছে। সমাজের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতোই সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো দলীয় ভিত্তিতে ভাগ হয়েছে। এতে ব্যক্তিগতভাবে সাংবাদিকনেতাদের লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্রমাগতভাবে অপসৃত হয়েছে। দলের প্রতি তাঁদের আনুগত্যের কারণে সাংবাদিকেরা এসব বিষয়ে মৌনতা পালন করেন অথবা প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেন।

এক দশকের কিছু বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের জগতে যে বড় পরিবর্তন ঘটেছে, তা হচ্ছে মালিকানার কাঠামো পরিবর্তন। এ বিষয়ে আমি এবং মোহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমান ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত একটি সমীক্ষা চালিয়েছি। তাতে আমরা দেখতে পাই, ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ না হয়ে গণমাধ্যমের, বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই (ঢাকা: সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ, জানুয়ারি ২০২১)।

ফলে বাংলাদেশে অনেক মিডিয়া থাকলেও স্বাধীন মিডিয়ার উপস্থিতি নেই।গণমাধ্যমজগতের এই বৈশিষ্ট্যগুলো যে রাজনীতির বাইরে নয়, তা কারোরই বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ফলে আরএসএফের হিসাবে যখন বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসে, তখন তা নিয়ে আলোচনা গণমাধ্যমজগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলেই হবে না। ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সংকট বিরাজমান রাজনীতির সংকটের সঙ্গেই জড়িত; একে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো অবকাশ নেই।

আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট।