default-image

এই ছোট লেখাটা শুরু করেছিলাম ৩১ অক্টোবর আর শেষ করতে করতে গড়াল পয়লা নভেম্বর পর্যন্ত। সময় একটু বেশি লাগায় চোখে পড়ল এই দুদিনই অর্থাৎ ৩১ অক্টোবর আর পয়লা নভেম্বর সরকারিভাবে ঘোষিত বিশেষ দিবস ছিল। বছরের অনেক দিনই সরকারের উদ্যোগে ‘বিশেষ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। এই দিবসগুলোর অনেকগুলোতেই সংবাদপত্রে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীসহ অনেকের বিশেষ বাণী প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়। সরকারি আয়োজনে অনুষ্ঠানও হয়।

অন্তত কুড়ি বছর ধরে চেষ্টা করেও ৪ নভেম্বর সরকারিভাবে ‘সংবিধান দিবস’-এর ঘোষণা বা মর্যাদা পাচ্ছে না। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদের ভাষায়, ‘আমরা এই সংবিধান রচনা ও বিধিবদ্ধ করিয়া সমবেতভাবে গ্রহণ করিলাম।’ সেই সময় গণপরিষদে উপস্থিত ৩৮৬ জন সদস্য স্বহস্তে সংবিধানের মূল কপিতে স্বাক্ষর করেন। তাঁদের স্বাক্ষরসংবলিত একটা কপি শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য সংরক্ষিত আছে। সেই কপিটিতে প্রথম স্বাক্ষর হিসেবে যে নাম লেখা আছে, সেটা শেখ মুজিবুর রহমান।

ঘটনাচক্রে গতকাল ৪ নভেম্বর ছিল প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। সংবিধানে বাক্‌স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার দেওয়া হয়েছিল ৩৯ অনুচ্ছেদে। ওই অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা অবারিত এবং নিরঙ্কুশ। বাক্‌ ও সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা শর্তসাপেক্ষ। অর্থাৎ জনশৃঙ্খলা, শালীনতা, নৈতিকতা, আদালত অবমাননা, অপরাধে প্ররোচনা প্রভৃতির ব্যাপারে আইন প্রণয়ন করে বাক্‌ ও সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা সীমিত করা যাবে। এই ‘সীমিত করা যাবে’–এর সুযোগ নিয়ে আইনের মাধ্যমে বাক্‌স্বাধীনতা এতটাই খর্ব করা হয়েছে যে এখন অনেক বিষয়ে স্তুতি বা ভীষণ প্রশংসা করা ছাড়া আর কোনো ধরনের মতপ্রকাশ করতে গেলে কেরানীগঞ্জ বা কাশিমপুরে দীর্ঘস্থায়ী বসবাসের সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রকট হয়ে যায়। সংবাদপত্রের অভিজ্ঞ সম্পাদকদের মাথায় তো চুল থাকার কথা নয়। কী ছাপানো যাবে, আর কী যাবে না, প্রতিদিন সেই দুশ্চিন্তায় তাঁদের মাথার চুল নিশ্চয়ই বিলুপ্তির পথে। আর অনেকেই ভুলতে বসেছেন যে বাক্‌স্বাধীনতা ছাড়া উন্নতি, গণতন্ত্র বা আইনের শাসন—কোনোটিই সত্যিকার অর্থে সম্ভব নয়। অবশ্য যাঁরা বাক্‌স্বাধীনতা খর্ব করেন, তাঁরা কখনোই এটা মানতে রাজি নন।

বিজ্ঞাপন

২.

১৯৭২ সালে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে লেখা হয়েছিল, অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতিসহ নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকবে। ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে অধস্তন আদালতের বিচারক নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব চলে যায় রাষ্ট্রপতির হাতে। আর বর্তমান অবস্থা হলো রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে নিয়োগ, বদলি ও নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করবেন। অর্থাৎ, ১৯৭২ সালের সংবিধান বিচার বিভাগকে পৃথক্‌করণের মাধ্যমে যে স্বাধীনতার বিধান করেছিল, সেটাতে আজও আমরা ফিরে যেতে পারিনি। অর্থাৎ সরকার বিচার বিভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে অনাগ্রহী। তাই আমাদের আইনের শাসন সীমিতই থেকে যাচ্ছে।

সংবিধানে বিচারপতি নিয়োগসংক্রান্ত আইন প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে, যা এখনো হয়নি। তবে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬২(১) (গ) অনুযায়ী প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোর প্রধানদের (নিয়োগ, বেতন, ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা) আইন, ২০১৮ প্রণীত হয়েছে।

নিম্ন আদালতকে নিয়ন্ত্রণ করবেন একমাত্র সুপ্রিম কোর্ট, এইটাই দুনিয়ার রীতি, অন্তত গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনের দেশে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগে আইন ছাড়া আর নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ কিছুটা হলেও সরকারের হাতে রেখে যতই বলুন না কেন যে আমরা কাউকে ছাড় দেব না বা দেশে আইনের শাসন আছে, সেটাতে কাজ হবে না। শুধু মুখের কথায় গণতন্ত্র ও আইনের শাসন হয় না। বরং ঘাটতি যত বেশি, সরকারি লোকজন চেঁচায় ততটা তারস্বরে।

সংবিধানের প্রদত্ত নাগরিকের সবচেয়ে মূল্যবান রক্ষাকবচ দেওয়া আছে ৩৫ অনুচ্ছেদে। কিন্তু ফৌজদারি বিচারে রিমান্ডে আর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সবচেয়ে বেশি অবজ্ঞার শিকার হচ্ছে এই ৩৫ অনুচ্ছেদ। এভাবে অপরাধ দমানো যাবে না, অপরাধ দমাতে হলে সংবিধানের প্রতিটি অক্ষরের গুরুত্ব বুঝে তা মানতে হবে—চৌকিদার, কনস্টেবল থেকে অনেক ওপরের মহল পর্যন্ত

৩.

সংবিধান ধূসর হচ্ছে বলেই চারদিকে অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতা বাড়ছে। বলা বাহুল্য, মৃত্যুদণ্ড দিয়ে যাঁরা এর সমাধানের কথা ভাবেন, তাঁরা স্পষ্টতই আইন, অপরাধ, শাস্তি, মৃত্যুদণ্ড প্রভৃতিসংক্রান্ত গোটা পাঁচেক বইও হয়তো পড়েননি। মনে রাখতে হবে, বাক্‌স্বাধীনতা যত খর্ব হবে, বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে যত বেশি পক্ষপাতিত্ব থাকবে আর শাস্তির প্রকটতা যত বাড়বে, তত বেশি সমাজটা অস্থির ও দয়ামায়াহীন হয়ে পড়বে। মানুষ এখন গণপিটুনিতে হত্যা করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, মৃতদেহ পুড়িয়েও দিচ্ছে। গণধর্ষণ নিত্যনৈমিত্তিক অপরাধে পরিণত হয়ে যাচ্ছে, যদিও গণধর্ষণে মৃত্যু হলে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড আছে বহু বছর ধরে।

একটা সভ্য, ক্রম অগ্রসরমাণ, উদার, সহনশীল ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধানে অনেকগুলি যথার্থ বিধান আছে সেই ১৯৭২ সাল থেকে। সংবিধান প্রণীত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনায় এবং সম্ভবত একই কারণে স্বাধীনতার এক বছরের মাথায় আমরা সংবিধান পেয়েছিলাম। ভারতের লেগেছিল প্রায় ৪ বছর, আর পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণয়ন করতে লেগে গিয়েছিল ৯টি বছর।

সংসদে ব্যবসায়ীদের সংখ্যাধিক্যে এটা স্পষ্ট যে সংবিধান তার গুরুত্ব হারিয়েছে, কেননা এমন ধারণা করা নিশ্চয়ই অযৌক্তিক হবে না যে বেশির ভাগ সাংসদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাঁদের স্ব স্ব ব্যাংক ব্যালান্স। একইভাবে, সংবিধানের প্রদত্ত নাগরিকের সবচেয়ে মূল্যবান রক্ষাকবচ দেওয়া আছে ৩৫ অনুচ্ছেদে। কিন্তু ফৌজদারি বিচারে রিমান্ডে আর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সবচেয়ে বেশি অবজ্ঞার শিকার হচ্ছে এই ৩৫ অনুচ্ছেদ। এভাবে অপরাধ দমানো যাবে না, অপরাধ দমাতে হলে সংবিধানের প্রতিটি অক্ষরের গুরুত্ব বুঝে তা মানতে হবে—চৌকিদার, কনস্টেবল থেকে অনেক ওপরের মহল পর্যন্ত।

বহু বছর ধরে আশায় ছিলাম, এত ভালো একটা সংবিধানকে আমরা ৪ নভেম্বর সংবিধান দিবস হিসেবে জাতীয়ভাবে উদ্‌যাপন করব, অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছি। আজকের লেখাটা হয়তো সেই ক্লান্তিরই বহিঃপ্রকাশ।

ড. শাহদীন মালিক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0