default-image

কয়েক বছর ধরেই বিএনপির নীতি-কৌশলে কোনো ধরনের স্থিরতা নেই। দলটি কখন কী করে বসবে বোঝা মুশকিল। একবার বলছে নির্বাচনে যাব না। আবার যাচ্ছে। কিছু কিছু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেয়। আবার নেয় না। বলছে সংসদে যাব না। কিন্তু যাচ্ছে। দলের মহাসচিব সংসদে শপথ নিলেন না। শপথ না নেওয়ায় তাঁর শূন্য আসনে আবার বিএনপি প্রার্থী দিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এক চরম দিগ্ভ্রান্ত অবস্থায় পতিত হয়েছে বিএনপি। বিএনপিকে খুবই ছন্নছাড়া মনে হচ্ছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনেক সিদ্ধান্তই পরিবর্তন করতে হয়। রাজনীতিতে সিদ্ধান্ত বা দলীয় অবস্থানের পরিবর্তন খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সিদ্ধান্তগুলো হতে হবে কৌশলী। যাতে দলের জন্য পরিস্থিতি অনুকূল হয় এবং পরিবর্তনের পক্ষে যৌক্তিক ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে হয়। কিন্তু বিএনপির কোনো সিদ্ধান্তই দলটির জন্য ইতিবাচক না হয়ে বরং হাস্যরসের খোরাক হচ্ছে। সকাল-বিকেল সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য সামরিক শাসক জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সুপরিচিত। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বিএনপিও সেই পথেই হাঁটছে।

রুমিন ফারহানা অত্যন্ত বাকপটু নেত্রী। টেলিভিশনে টক শোতে আলোচনা করে তিনি পরিচিতি লাভ করেছেন। শিক্ষাজীবনে তুখোড় বিতার্কিকও ছিলেন বলে শোনা যায়। সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আলোচনায় টক শো গরম করেন। দেশে এখন তিনি তারকা টক শো আলোচকদের একজন। বিএনপির সমর্থকেরা তাঁকে পছন্দ করেন। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে দল থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। পাননি। নির্বাচনের পরও বিভিন্ন টেলিভিশনে নির্বাচনের কঠোর সমালোচনা করেছেন। নির্বাচন কমিশনের আলোচনায় মুখর ছিলেন। গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের কথা বলছেন। কিন্তু তিনিই হুট করে সংসদে ঢুকে গেলেন। কেন? উত্তরে তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সংসদ গণতান্ত্রিক ক্ষেত্র। যেখানে তিনি দেশ ও জনগণের পক্ষে কথা বলবেন। যে সংসদকে তিনি অবৈধ বলে মনে করছেন, সেই সংসদেই কীভাবে গণতন্ত্রের পক্ষে, দেশের মানুষের পক্ষে কথা বলবেন? তাঁর সংসদ সদস্য বৈধ তো? কারণ, তিনি যে স্পিকারের কাছে শপথ নিলেন, তাঁকেই তো তিনি অবৈধ মনে করছেন। কী হাস্যকর! অবৈধ লোকের কাছে গিয়ে তিনি বলছেন, আমাকে বৈধতা দাও। এর আগেও বিএনপির পাঁচ সংসদ সদস্য বলেছিলেন, সংসদে গিয়ে ওনারা খালেদা জিয়ার মুক্তির কথা বলবেন। খুবই উদ্ভট ধরনের যুক্তি দিয়েছেন বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা।

সংসদ কখনো কারও মুক্তির ক্ষেত্র হতে পারে না। খালেদা জিয়ার মুক্তি হবে দেশে আইন মেনে। সংসদ চাইলেও কাউকে মুক্তির ব্যবস্থা করতে পারে না। প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করতে পারে সংসদ। কিন্তু খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য বর্তমান সংসদ কি কোনো আইন প্রণয়ন বা পরিবর্তন করবে বলে বিএনপির সংসদরা বিশ্বাস করেন। যদি তা-ই হয়, তবে ওনারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সংসদ হওয়ার লোভ বিএনপি নেতারা সামলাতে পারেননি। এঁদের অনেকেই আগে একাধিকবার সংসদে নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু নিজেদের এবার সামাল দিতে পারলেন না। সংসদ সদস্য পদের লোভে দলীয় আনুগত্য উধাও। এমনকি রুমিন ফারহানার মতো তুখোড় আলোচক এড়াতে পারলেন না সেই লোভকে। সংসদ গণতান্ত্রিক ক্ষেত্র, কিন্তু একমাত্র জায়গা না। গণতন্ত্রের জন্য আরও অনেক জায়গাতেই কথা বলা যায়।

বিএনপির নীতিনির্ধারকদেরও খুব বেশি প্রত্যয়ী মনে হয়নি। হয়তো নীতিনির্ধারকের আশঙ্কা ছিল, নির্বাচিতরা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সংসদে যোগ দিতে পারেন। বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা কি মনে করেন যে বিএনপি থেকে পাঁচজন চলে গেলে দল ভেঙে যাবে? জেনারেল এরশাদের আমলেও অনেকেই বিএনপি থেকে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন। বিএনপি দুই ভাগ হয়েছিল। তাই বলে কি মূল বিএনপি হারিয়ে গিয়েছে রাজনীতি থেকে? বরং এরশাদের পতনের পর সবাইকে অবাক করে সেই বিএনপিই সরকার গঠন করে। কিন্তু বর্তমানে ক্ষমতার বলয়ের বাইরে থাকা বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি স্পষ্ট। আমি নিশ্চিত, বিএনপির বর্তমান নীতিনির্ধারকেরা ১৯৮৬ সালে দায়িত্বে থাকলে নির্বাচনে অংশ নিতেন। লোভ সামলাতে পারতেন না।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আপসহীন নেত্রীর তকমা পাওয়া দলটির কী করুন পরিণতি? এখন মনে হচ্ছে, কী করা উচিত বা কী করতে হবে, তা বিএনপি চিহ্নিত করতে পারছে না। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিএনপি দাঁড়াতে পারেনি। একটি সংগঠিত রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি পুরোপুরিই ব্যর্থ হচ্ছে। রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদলে অনেক দলই বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হতে পারে, ক্রমাগত দমন-নিপীড়নের মুখে দলটির নেতা-কর্মীরা অনেকেই ঘরছাড়া। হাজার হাজার গায়েবি মামলায় বিপর্যস্ত। কিন্তু সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হয়। যারা ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তারাই নতুন ইতিহাস নির্মাণ করে। ইতিহাস তাদেরই মনে রাখে। রাজনীতির ময়দানে বিজয়ী হয়ে টিকে যায়। বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না, সেটা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু বিএনপির মধ্যে সে ধরনের কোনো লক্ষণ নমুনা হিসেবেও দেখা যাচ্ছে না। রাজনীতিতে মূলত দুই ধরনের শক্তি লাগে। একটি হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিক, আরেকটি দলীয় নেতা-কর্মীদের শক্তি। এই দুইয়ের সম্মিলনেই একটি রাজনৈতিক দল বা সংগঠন সফলতা লাভ করে। জনপ্রিয়তা অর্জন করে। কিন্তু বিএনপিতে এই দুইয়ের সম্মিলন নেই। বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গা থেকে বিএনপি দেউলিয়াত্বের পর্যায়ে আছে। ফলে, দলীয় নেতা-কর্মীদের সঠিক দিকনির্দেশনাও দিতে পারছেন না বিএনপির নেতারা।

নিকট অতীতে সুচিন্তিত কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বিএনপি দিতে পারেনি। হরতাল, ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন এখন আর চলে না। বিএনপি দেশের গণতন্ত্রের জন্য, মানুষের জন্য কোনো কর্মসূচি দিয়েছে বলে আমার মনে পড়ছে না। অথচ বিএনপি তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের কাছ থেকেই উদাহরণ নিতে পারে। ফুলবাড়ী উন্মুক্ত কয়লাখনি আন্দোলন, কনসাটের বিদ্যুৎ নিয়ে আন্দোলন বা তারও আগে দিনাজপুরে ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডে আওয়ামী লীগ যৌক্তিকভাবেই জনসাধারণের পাশে দাঁড়িয়েছিল বিরোধী দলে থাকা অবস্থায়। বিএনপিবিরোধী দল হিসেবে এ রকম কোনো জনসম্পৃক্ত আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছে বলে আমার জানা নেই। বিএনপি পাটকলশ্রমিকদের পক্ষে কোনো কথা বলে না। কোটা সংস্কারের পক্ষে কথা বলতে গড়িমসি করে। রামপাল নিয়ে কথা বলতে ভয় পায়। গোপনে টেলিফোনে বিএনপির নেতারা কী সব নির্দেশ দেন। সেই টেলিফোন আলাপ আবার ফাঁসও হয়। ভয়কে কীভাবে জয় করতে হয়, এর জন্য খুব বেশি দূরে যেতে হবে না। নেপালের বামপন্থীদের কাছ থেকে বিএনপি শিক্ষা নিতে পারে।

শুধু দেশের রাজনীতিই না; বিএনপির রাজনীতির অন্যতম ব্যর্থতা হচ্ছে নাইন/ইলেভেন-পরবর্তী বৈশ্বিক রাজনীতির সঙ্গে বিএনপি তাল মেলাতে পারেনি। ওই সময়ের পর বিশ্বের রাজনীতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। নতুন নতুন মেরুকরণ হয়েছে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির গতিপ্রকৃতি অনুধাবন মোটেও করতে পারেনি। বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে দূরদর্শিতায় সফল হননি। আঞ্চলিক ও বিশ্ব শক্তির আস্থা অর্জন করতে পারেনি বিএনপি।

মোদ্দাকথা, রাজনৈতিক দল পরিচালনার জন্য শুধু জনসমর্থন থাকলেই হয় না; কর্মী ও জনসমর্থনকে সংগঠিত করে রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য একটি থিংক ট্যাংক বা বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরের প্রয়োজন। এরাই দলের নীতিনির্ধারণ করে। বিএনপি সে পথে না হেঁটে বরং এক হযবরল অবস্থার সৃষ্টি করেছে। সব ধুলায় অন্ধকার। বলছি না যে বিএনপি সংসদে যাবে না। তারা সংসদে যেতেই পারে। তবে বিএনপি যদি সবকিছু মেনে সংসদেই যায়, তবে পেট্রলবোমায় যারা দগ্ধ হলো, যারা কোনো এক রাতে হারিয়ে গেল আর ফিরে এল না, যাদের খালে–বিলে বেওয়ারিশ হিসেবে পাওয়া গেল, তাদের পিঠে কি বিএনপি ছুরি বসিয়ে দিল না? বিএনপির এসব কাজকর্ম দেখে লোকজন মুখ টিপে হাসাহাসি করছে। বিএনপি হয়তো সেটা বুঝতে পারছে না বা সেটা বোঝার ক্ষমতাই নেই। এ কারণেই স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের আপসহীন দল ধীরে ধীরে রাজনৈতিক জোকারের দলে পরিণত হচ্ছে।

ড. মারুফ মল্লিক, ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো, ইনস্টিটিউট অব ওরিয়েন্ট অ্যান্ড এশিয়ান স্টাডিজ, ইউনিভার্সিটি অব বন

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন