‘ভারত বনাম বাংলাদেশ’ তুলনাটি ক্ষতিকর
অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বিভিন্ন সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনামূলক পর্যালোচনা করেছেন, দেখিয়েছেন মানবসম্পদের প্রায় সব কটি সূচকেই ভারত ও পাকিস্তান থেকে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। আপাতদৃষ্টিতে এটি ভালো সংবাদ। কিন্তু আমাদের ভারতকেন্দ্রিক চিন্তায় এই ‘ভারত বনাম বাংলাদেশ’ তুলনাটি আদতে ক্ষতিকর। কারণ, উন্নয়নের চূড়ান্ত ‘স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে আমরা ধরেই নিয়েছি ভারতকে। অর্থাৎ ভারত থেকে সব কটি সূচকে এগিয়ে থাকলেই বাংলাদেশ খুব ভালো করছে। কিন্তু সত্য এটাই যে ভয়াবহ দারিদ্র্যের দেশ ভারত কিংবা মৌলবাদ ও ফৌজিতন্ত্রের খপ্পরে পড়া পাকিস্তানকে মানদণ্ড ধরলে আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের অবস্থান সন্তোষজনক মনে হলেও বাংলাদেশের প্রকৃত ভগ্ন ও নগ্ন দশাটি আড়ালেই থেকে যায়। আবার অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত শ্রীলঙ্কা মানবসম্পদের প্রায় প্রতিটি সূচকেই বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে থাকলেও শ্রীলঙ্কা নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না। মহাগরিবির দেশ ভারত ও পাকিস্তানকেই একমাত্র মানদণ্ড ধরায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, পুষ্টিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে বহুগুণ এগিয়ে থাকা শ্রীলঙ্কার সূচকগুলো আমাদের মধ্যে কোনো আগ্রহেরও তৈরি করে না।

উন্নয়নের সূচকগুলো কি সমালোচনার ঊর্ধ্বে?
‘উন্নয়নশীল’ হতে হলে যোগ্যতার মাপকাঠি তিনটি—মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ঝুঁকিহ্রাস। অথচ এই সূচকগুলো সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। বিশেষত মাথাপিছু আয়ের হিসাবটা বরাবরই লেজেগোবরে। এই হিসাবে সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, ফার্মার্স ব্যাংক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ বা হল-মার্ক, এমনকি শেয়ারবাজার লুটেরাদের কুক্ষিগত সম্পদকেও সমাজের দশজনের গড় সম্পদ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। হকার, রিকশাচালক, গার্মেন্টস মালিক—সবাইকে মধ্যবিত্ত দেখায়, আর মাঝখান থেকে লুটেরাদের ফুলে-ফেঁপে ওঠার দৃশ্যটা ঢাকা পড়ে যায়।

ভারতে যখন জিডিপিতে ৮ শতাংশ ছাড়িয়েছে, তখনো বিশ্বের ক্ষুধার্ত মানুষের তালিকায় ভারত ছিল শীর্ষে—প্রায় ৮০ কোটি ভারতীয় দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেছে, ১৯ কোটি ভারতীয় অপুষ্টিতে ভুগেছে, আর প্রতিদিন আত্মহত্যা করেছেন ৪১ জন করে ভারতীয় কৃষক। যেমন সিপিডির এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে গত ছয় বছরে জিডিপি বাড়ার দিনগুলোয় সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ মানুষের আয় বেড়েছে ৩২ হাজার কোটি টাকা, আর সবচেয়ে গরিব ৫ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে ১০৫৮ টাকা। অর্থাৎ মাথাপিছু আয়ের এই সূচকটি আসলে উন্নয়ন, আইনের শাসন, মানুষের ভালো থাকা, খারাপ থাকা—এসবের কিছুই বোঝায় না।

অন্য সূচকগুলোও যথেষ্ট বিভ্রান্তিকর। যেমন সূচক বলছে, মেয়েদের মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তির হার বেড়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০১৭ বলছে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া ৪১ শতাংশ মেয়েই দশম শ্রেণির আগেই ঝরে পড়ছে। আবার জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফ বলছে, বিশ্বে বাল্যবিবাহের হার কমলেও বাংলাদেশে বাড়ছে (অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ)!

বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে শিশুমৃত্যুর হার কমেছে। কিন্তু পাশাপাশি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে খর্বকায় এবং অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা। দেশের ৩৬ শতাংশ শিশু খর্বকায়। ৫১ শতাংশ শিশু অ্যানিমিয়ায় ভুগছে। মারাত্মক অপুষ্টির ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর তালিকাতেও বাংলাদেশ অন্যতম। অর্থাৎ যে শিশুগুলোকে বাঁচানো যাচ্ছে, তারা ন্যূনতম পুষ্টিকর খাদ্য পাচ্ছে না। বেঁচে থাকা শিশু বড় হচ্ছে ক্ষুধায়, কম খেয়ে, অপুষ্টিতে, খাটো গড়নের হয়ে। তাহলে শিশুদের এমন অমানবিক বেঁচে থাকায় কার উন্নয়ন হলো? অর্থাৎ সূচক খণ্ডিত বা আংশিক চিত্র দিচ্ছে মাত্র।

উন্নয়নের দিনে আইনের শাসন, যৌন সহিংসতা ও জীবনের নিরাপত্তা
‘সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারে’ বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শীর্ষে8! সামগ্রিকভাবে ‘আইনের শাসনে’ ১১৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০২। খেলাপি ঋণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ‘নম্বর ওয়ান’! ক্ষমতাবানদের যোগসাজশে দেদার অর্থ আত্মসাৎ চলছেই। নয় বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে তিন গুণ! আর বিচার? উন্নয়নের দেশে বিচারের কী হাল, তার সাক্ষ্য দিচ্ছে প্রতিদিনের দুঃসংবাদগুলো।

এবার দেখা যাক কেমন আছে উন্নয়নের দেশের মেয়েরা। গত চার বছরে ধর্ষণে শিকার হয়েছে ১৭ হাজার নারী ও শিশু। আন্তর্জাতিক জরিপে ঢাকা পৃথিবীর সপ্তম বিপজ্জনক শহর। যৌন সহিংসতায় ঢাকার অবস্থান চতুর্থ। ২০০২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ধর্ষণ, গণধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যাসংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর ৯৭ শতাংশেরই কোনো সাজা হয়নি। ‘ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রোজেক্ট’ দেখাচ্ছে, ‘সুষ্ঠু তদন্ত’, ‘দ্রুত তদন্ত’, ‘সুষ্ঠু আইনি প্রক্রিয়া’ ইত্যাদি প্রায় সব কটি সূচকেই বাংলাদেশের স্কোর লজ্জাজনক।

‘নাগরিক নিরাপত্তা’র বেলাতেও বাংলাদেশের অবস্থান ১১৩টি দেশের মধ্যে ১০২। প্রতিবছর রাস্তাঘাটে দুর্ঘটনায় মুড়িমুড়কির মতো মরছে গড়ে প্রায় ২০ হাজার মানুষ। পোশাকশিল্প, নির্মাণশিল্প, পাহাড় কাটা, আর জাহাজ ভাঙা খাতে স্রেফ অবহেলাজনিত দুর্ঘটনায় বেঘোরে প্রাণ দেন শত শত শ্রমিক। বৈদ্যুতিক শকে, বিষাক্ত গ্যাসে, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ‘ফায়ার এক্সিটে’র অভাবে, পুরোনো বয়লার ফেটে, উঁচু থেকে পড়ে হাড়গোড় ভেঙে শ্রমিক মরছে তো মরছেই। বছরে গড়ে ৭০০ শ্রমিক নিহত হচ্ছেন। আহত ১ হাজার ৩০০ জন১০। কোথাও কোনো মাথাব্যথা আছে কি?

উন্নয়নের দিনে পরিবেশ ও নদী ধ্বংস
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক সূচকগুলোয় পরিবেশ ধ্বংসের গল্পটি নেই। কৃষকের ‘লাইফলাইন’ বাংলাদেশের নদীগুলোর একের পর এক শুকিয়ে যাওয়ার গল্পটি নেই। তবে আলাদা করে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সমীক্ষা হয়েছে। সেখানেও বাংলাদেশের অবস্থান শোচনীয়। পরিবেশ সুরক্ষায় ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৯১১! পানি, বাতাস, পয়োনিষ্কাশন বা জনস্বাস্থ্য—সব কটি সূচকেই ঢাকার অবস্থান তলানির দিক থেকে শীর্ষে। ভয়াবহ ক্ষতিকর সালফার ডাই-অক্সাইড বা কার্বন মনো-অক্সাইড নির্গমনেও ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষে১২। ঢাকার চারপাশের নদীগুলোতে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম আর সিসার দূষণ ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে১৩। বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষা বলছে, ঢাকায় সিসাদূষণের শিকার ছয় লাখ মানুষ (বেশির ভাগই শিশু)১৪ এবং দেশের ১ কোটি ২৭ লাখ মানুষের দেহে অস্বাভাবিক কোষের বৃদ্ধি ঘটছে১৫। এ ছাড়া পরপর কয়েক বছর ধরেই ঢাকা পৃথিবীর সবচেয়ে বসবাস-অনুপযোগী শহরগুলোর মধ্যেও অন্যতম শীর্ষে১৬। অর্থাৎ আক্ষরিক অর্থেই ভেঙে পড়ছে সবকিছু। তবু রাস্তা আটকিয়ে চলছে উন্নয়নের আনন্দ র‍্যালি! সত্যিই সেলুকাস, এ এক অদ্ভুত উন্নয়নের দেশ!

মাহা মির্জা: আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতি বিষয়ের গবেষক।

তথ্যসূত্র:

১. বাংলাদেশ অর্থনীতি ২০১৭-২০১৮, প্রথম অন্তর্বর্তীকালীন পর্যালোচনা, সিপিডি।
২. প্রথম আলো, ‘বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ বেড়েছে’, মার্চ ৭, ২০১৮।
৩. ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট, ২০১৬।
৪. ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট ২০১৭।
৫. বণিক বার্তা, খেলাপি ঋণের হার: উন্নয়নশীল দেশে শীর্ষে বাংলাদেশ, মার্চ ১৯,২০১৮
৬. চার বছরে ১৭ হাজার ধর্ষণ মামলা, প্রথম আলো, ২০১৮।
৭. থম্পসন রয়টার্স ফাউন্ডেশন। দ্য ওয়ার্ল্ডস মোস্ট ডেঞ্জারাস মেগাসিটিস ফর উইমেন, ২০১৭।
৮. প্রথম আলো, নারী ও শিশুরা বিচার পায় না, মার্চ ৮,২০১৮।
৯. বাংলাদেশ অকুপেশনাল সেফটি, হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ফাউন্ডেশন, ২০১৮।
১০. বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) সমীক্ষা-২০১৬
১১. এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স-২০১৮
১২. ইউএস এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স, মার্চ ২৩, ২০১৮।
১৩. চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্স অ্যান্ড ফিশারিজ। ২০১৮।
১৪. বাংলাদেশ পরিবেশ সমীক্ষা-২০১৭, বিশ্বব্যাংক।
১৫. ক্যানসার কন্ট্রোল ইন বাংলাদেশ, জাপানিজ জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি (জেজেসিও), ২০১৫।
১৬. গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স ২০১৭।

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন