১.

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বর্তমান সরকারকে সংবাদকর্মীদের ওপর চড়াও না হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। ঠাকুরগাঁওয়ে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকেও ধ্বংস করে দিয়েছে। আজ সংবাদকর্মী আইন নামে নতুন আইন তৈরি হতে যাচ্ছে। সংবাদকর্মীদের তো আইনের দরকার হয় না। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও সংবাদপত্রের জন্য কোনো আইনের প্রয়োজন হয়নি।’

মির্জা ফখরুল কি সঠিক তথ্য দিলেন? জবাব হচ্ছে ‘না’। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে সংবাদপত্র নিয়ে নিন্দিত ও নন্দিত অনেক আইন হয়েছে। তিনি যে আইন প্রসঙ্গে কথা বলছেন, সেই আইন হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। সে সময়ের সাংবাদিকনেতাদের অনুরোধেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি জারি করেছিলেন নিউজ পেপার (সার্ভিস অ্যান্ড কন্ডিশনস) অ্যাক্ট ১৯৭৪। প্রকৃত সত্য হচ্ছে ২০০৬ সালে কোনো অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা না করেই বিএনপি সরকার এই আইন বাতিল করে দিয়েছে। সাংবাদিকেরা নতুন প্রেক্ষাপটে সে আইনই ফেরত চাইছেন।
সংসদে যে আইন উপস্থাপন করা হয়েছে, তার অনেকাংশ গ্রহণযোগ্য নয় বলেই সাংবাদিকেরা প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। প্রকৃত সত্য হলো আইন ছিল, বিএনপি সেটা বাতিল করেছিল, সাংবাদিকেরা সে আইন ফেরত চাইছেন।

২.

এক প্রভাবশালী মন্ত্রী বলছেন, সরকার দেশের উন্নয়নে কাজ করছে। দেশের উন্নয়ন মানেই প্রতিটি পরিবারের উন্নয়ন। এটি যদি সত্য হয়, তাহলে দেশের সব মানুষের জীবনে স্বস্তি আসার কথা।

কিন্তু পরক্ষণেই কৃষিমন্ত্রীর সরল স্বীকারোক্তি, দেশের মানুষের গড় আয় বেড়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে। প্রায় ২ হাজার ৬০০ ডলারের পার ক্যাপিটা ইনকাম। যদিও আয়ের বড় অংশই গুলশান-বনানীর বড়লোকদের কাছে। কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘দেশ এখন ডিমে, দুধে এবং মাংসে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ।’ গ্রামের অনেক মানুষ এখনো ডিম কিনে খেতে পায় না জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘এখনো গ্রামের একজন মা তার ছেলেকে ডিমসহ বাজারে পাঠিয়ে দেন বিক্রি করার জন্য। ছেলের মুখে ডিম দিতে পারেন না। গরুর দুধ বাজারে পাঠিয়ে দেন, সংসারের খরচ মেটানোর জন্য। এই পরিস্থিতি এখনো রয়েছে।’
এই দুই মন্ত্রীর দুটি বিবৃতিই যদি সত্য হয়, তাহলে আরেকটি সত্য স্বীকার করতে হবে যে দেশে বৈষম্য বেড়েছে। এই প্রকৃত সত্যটি ঘরে ঢোকার দুয়ার খুঁজে পাচ্ছে না। অনেক নীতিনির্ধারক–বাক্যবাগীশ এ সত্য স্বীকার করতেও চান না।

কিছুদিন আগে একই অনুষ্ঠানে দুই মন্ত্রীর সত্যের লড়াই দেখছিলাম। কৃষিমন্ত্রী বলছেন, আমাদের খাদ্যঘাটতি নেই। কিন্তু পরক্ষণেই পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলছেন, ঘাটতি যদি না–ই থাকবে, তাহলে খাদ্য আমদানি করতে হচ্ছে কেন? জবাব মেলেনি। এই দুই মন্ত্রীর বচনের নিচে আসলে কোন সত্য চাপা পড়ল, বলা মুশকিল।

সত্যের চেহারা কি বদল হয়? এই দেশে হয়! তেঁতুলতলা মাঠ। পাড়ার মানুষ বললেন, এটা খেলার মাঠ, মন্ত্রীও বললেন সত্যি। কিন্তু এক দিন পরেই সত্য বদলাল। একই মন্ত্রী বললেন, সেটা তো মাঠই নয়, এক চিলতে পরিত্যক্ত জমি। নতুন রূপ পেল সত্য। এর এক দিন পরেই সেই মন্ত্রীই জানালেন, সেই মাঠ মাঠই থাকবে, বলে দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী। একচিলতে মাঠ নিয়ে সত্য যখন বারবার চেহারা পাল্টায়, তখন বুঝতে হবে আসল সত্য আপন শক্তিতেই অবারিত হয়।

এক মন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, ১৯৭১ সালে তাঁর মা বঙ্গবন্ধুর জন্য নয় মাস রোজা রেখেছিলেন। এক পুত্র তাঁর মা সম্পর্কে বলছেন, এই সত্যি অবিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু এই মায়ের পুত্রটি যখন বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশাতেই তাঁর বিরোধী শিবিরে কট্টর অবস্থান নেন, বৈজ্ঞানিক বিপ্লব করেন, তখন এক ভিন্নতর সত্য প্রত্যক্ষ করি। মায়ের সত্য আর পুত্রের সত্য একেবারেই বিপরীতমুখী। নতুন প্রেক্ষাপটে সেই তিনিই এখন আবার বঙ্গবন্ধুকন্যার মন্ত্রিসভার দাপুটে সদস্য, সেটিও তো আরেক সত্যি!

সেই মন্ত্রী ৭২ বছর পর দাদার ভিটে খুঁজতে যে হেলিকপ্টার অভিযান চালালেন, তা পূর্বপুরুষের ইতিহাস অনুসন্ধানের এক নির্দোষ সত্যি অভিযান বটে, কিন্তু দুষ্টু লোকেরা যখন এই অভিযানকে আগামী নির্বাচনের আসন অনুসন্ধানের অভিযান বলেন, তখন প্রকৃত সত্যের সন্ধানে ধন্দে পড়তেই হয়।

সত্যের চেহারা কি বদল হয়? এই দেশে হয়! তেঁতুলতলা মাঠ। পাড়ার মানুষ বললেন, এটা খেলার মাঠ, মন্ত্রীও বললেন সত্যি। কিন্তু এক দিন পরেই সত্য বদলাল। একই মন্ত্রী বললেন, সেটা তো মাঠই নয়, এক চিলতে পরিত্যক্ত জমি। নতুন রূপ পেল সত্য। এর এক দিন পরেই সেই মন্ত্রীই জানালেন, সেই মাঠ মাঠই থাকবে, বলে দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী। একচিলতে মাঠ নিয়ে সত্য যখন বারবার চেহারা পাল্টায়, তখন বুঝতে হবে আসল সত্য আপন শক্তিতেই অবারিত হয়।

ধরা যাক নিউমার্কেটের ঘটনা। দুজন খুন হলো, সংঘর্ষ হলো, নগরবাসী আর ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ হলো, এসব সত্য তো সবার চোখে দেখা। কিন্তু আরও সত্য বের করার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁদের হাতে পড়ে সত্যের মহাদুর্দশা। বলা হলো এর পেছনে রাজনীতি আছে, তাই ধরা হলো বিএনপির নেতাকে, মামলাও হলো, রিমান্ড হলো। কিন্তু যখন খুনিরা ধরা পড়ছে, দেখা গেল তারা সবাই ছাত্রলীগের কর্মী। মামলার সত্য আর গ্রেপ্তারের সত্যের মধ্যে ফারাক বেজায়। এখন দেখা যাক, বিচারে কোন সত্য বেরিয়ে আসে।

এসব সত্য পাশাপাশি রাখলে আমাদের রাজনীতির যে সত্য চেহারা উন্মোচিত হয়, তার দিকে তাকানো যায় না!

এ দেশে এই ৫০ বছরে সাংবাদিক হত্যা–নির্যাতনের কোনো ঘটনার বিচার হয়নি। কেন হলো না, এ সত্যও জানা যায়নি। সাগর-রুনি হত্যার পেছনের সত্য প্রায় এক দশকেও খুঁজে পাওয়া গেল না। আদালতে ৮৮ বার সময় নিয়ে বাহিনী বলছে, তারা সত্য খুঁজে বেড়াচ্ছে এখনো! কে জানে এই সত্য আদৌ জানা যাবে কি না কোনো দিন।

লেখা প্রায় যখন শেষ করে আনছি, তখন মুখোমুখি হলাম আরেক সত্যের। একজন সাংসদ ভোটারদের ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে তাঁর নির্বাচনী এলাকায় যে পোস্টার ছড়িয়ে দিয়েছেন, সেখানে নিজের ছবিতো আছেই, ওপরে দেখতে পাচ্ছি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি। বড় করে লেখা ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ এবং ‘আল্লাহ সর্বশক্তিমান’। গত নির্বাচনে এই একই নেতা তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় যে পোস্টারে এলাকা ছেয়ে দিয়েছিলেন, তাতে দেখতে পাচ্ছি, নিজের ছবিতো আছেই, মাথার ওপরে বেগম খালেদা জিয়ার ছবি। বড় করে লেখা ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ ও ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’। বিস্ময় কাটে না। কোনটা যে আসল সত্য তা যেমন বুঝতে পাচ্ছি না, কোনটা আসলে মিথ্যা তাও ধরতে পাচ্ছি না। কে জানে এই মহারথী আবার কখন সর্বশেষ কোন সত্য নিয়ে আবির্ভূত হন!

বাংলাদেশের নানা বিষয় নিয়ে কাজ করার জন্য মশহুর এক বিদেশি সাংবাদিকের সাম্প্রতিক এক টুইট বার্তা নিয়ে বলি। তিনি বলছেন, বাংলাদেশে এমন ধারণা প্রচলিত আছে যে ঈদের চাঁদ দেখা কমিটি আর ব্যবসায়ীদের একটি ঐক্য আছে। ঈদের আগে আরও এক দিন ব্যবসার স্বার্থে এরা নাকি ঈদের চাঁদ দেখা এক দিন পিছিয়ে দেয়। তিনি জানতে চেয়েছেন, এটা কি সত্যি? ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে নানা কথা শোনা গেলেও এমন একটি ‘ধারণাগত সত্য’ এই প্রথম জানা গেল। বাংলাদেশে এমন ধারণা প্রচলিত নেই।

আসলে ওই টুইটকর্তার নিজের ধারণা থেকে সৃষ্ট বিষয়কে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করার কৌশলী প্রয়াস এটি। ডাহা মিথ্যাকেও এ ধরনের ‘আরোপিত সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস দেখা যায় দলবাজ বিশ্লেষকদের বেলায়। এ ধরনের সৃজিত সত্য ইদানীং কখনো বাংলাদেশে জন্ম নেয়; ব্রিটেন, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মালয়েশিয়া, কাতার হয়ে আবার বাংলাদেশে আসে। আবার কখনো বিদেশে উৎপাদিত হয়ে বাজারজাত হয় বাংলাদেশে। সত্য যদি প্রকৃত সত্য হয়, তাহলে তার বিশ্বভ্রমণ নিয়ে আপত্তি নেই।
কিছুকাল আগেও কোনো ঘটনা ঘটলেই সরকারি প্রেসনোট দিয়ে সত্য জানানোর চেষ্টা করা হতো। এ সত্য কতটা সত্য, সেটা বোঝার জন্য দ্বারস্থ হই এক কবির। হতাশ কবি প্রেমিকাকে বলছেন, ...‘তোমার প্রেম সরকারি প্রেসনোটের মতোই মিথ্যা!’

৩.

সত্য নিয়ে গবেষণা করেন—এমন পণ্ডিতেরা বড়দাগে সত্যের ছয় রকম চেহারার কথা বলেন।
ক. মানুষ মনে করেন তাঁর প্রিয় বা আস্থাভাজন মানুষ যা বলে, তা–ই সত্যি। কোনো দ্বিধা ছাড়াই তাঁরা এ সত্যকে গ্রহণ করেন।
খ. সংবাদমাধ্যমে যা প্রকাশিত হয়, সব সত্য, এমনটিও মনে করেন অনেকে।
গ. কোনো বিষয় নিয়ে নিজে নিজেই মনের মতো একটি সত্য দাঁড় করান অনেকে।
ঘ. আবার সত্যটা আসলে কী রকম হলে ভালো হয়, অনেকে তেমন একটি সত্যের চেহারাও নিজের ধারণা থেকে তৈরি করেন।
ঙ. বিশেষ উদ্দেশ্য বা মতলব থেকে অসত্য বিষয়কে সত্যের মতো তুলে ধরা হয় কখনো। বিশেষ উদ্দেশ্যের অনুসারীরা কখনো এটাকেই সত্য মনে করেন এবং প্রচার করেন।
চ. কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে তা–ই, যা তথ্য, প্রমাণ, পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণ দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করা যায়।

এই সত্য বড়ই দুর্লভ, কি সাংবাদিকতায়, কি সমাজ বা ব্যক্তিজীবনে।

৪.

সব ‘দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া’ প্রয়াত সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ বহু আগে লিখেছিলেন, ‘সত্যবাবু মারা গেছেন’। ফয়েজ ভাইয়ের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলি, সত্য একেবারে মারা যায়নি। অসত্য, অপতথ্য, সত্য–মিথ্যা মিলিয়ে বিভ্রান্তির এই কালে আসল সত্য কোনটি, তা নিয়েই বড় সমস্যা চলছে। দুয়ার বন্ধ করে দিয়ে অসত্যকে রুখতে গিয়ে আমরা হয়তো প্রকৃত সত্যের পথও রুদ্ধ করে ফেলি। কিন্তু সত্য যদি প্রকৃত সত্য হয়, তাহলে তা আপন শক্তিতেই টিকে থাকে, প্রকাশিত হয়।

প্রকৃত সত্যকে হয়তো কিছুদিন চেপে রাখা যায়, কিন্তু ‘দাবায়ে’ রাখা যায় না।

মনজুরুল আহসান বুলবুল, সাবেক সভাপতি, বিএফইউজে; সাবেক ভাইস চেয়ার, আইপিআই; সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, জাতীয় প্রেসক্লাব

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন