বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আধুনিককালে জিহাদিদের এই বড় জয় খুব শিগগিরই আফগানিস্তানকে সন্ত্রাসীদের জন্য অতি নিরাপদ রাষ্ট্রে পরিণত করবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ধর্মান্ধদের জন্য অস্থায়ী স্বর্গভূমি হবে আফগানিস্তান। যেখানে তারা এসে প্রশিক্ষণ নেবে এবং নিজেদের দেশে গিয়ে সন্ত্রাসী হামলা চালাবে। তালেবানের ‘ইসলামিক আমিরাত’ আন্তর্জাতিক খেলাফতের ভিত্তি হয়ে উঠবে। আল–কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেন এ ধরনের খেলাফতের কথা বলতেন।

নর্দান সিরিয়া থেকে ইরাকে বিস্তারের আগেই ইসলামিক স্টেটের (আইএস) খেলাফতের স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। সেই রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ হচ্ছে আফগানিস্তানে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীর পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। তালেবানের এই জয় আন্তর্জাতিক জিহাদি আন্দোলনের পালে হাওয়া দেবে। মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ ইউরোপ থেকে আফ্রিকা ও এশিয়াতে বিস্তার লাভ করা সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধটা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। কেননা, এটি আরও নতুন নতুন ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়বে।

তালেবানকে ক্ষমতায়িত করার মধ্য দিয়ে আমেরিকা সব কটি ইসলামি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ক্ষমতায়িত করল। বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ পুনর্জন্মের একটা ক্ষেত্র এতে প্রস্তুত হলো। আফগান সরকারের মতো মিত্রের সঙ্গে বেইমানি করেছে আমেরিকা। এ ঘটনার পর অন্য মিত্ররা বুঝতে পারছে, তারা বিপদে পড়লে আমেরিকা তাদের ফেলেই সরে যাবে।

এটা এমন সময়ে ঘটল, যখন আমেরিকার সাম্রাজ্যের ক্ষমতা ক্রমাগত ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। অন্য দেশের ওপর তার প্রভাব এরই মধ্যে কমে এসেছে। পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পথ ধরেই বাইডেন বিভিন্ন দেশ থেকে সেনা প্রত্যাহার অব্যাহত রেখেছেন।

বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে আমেরিকা একের পর এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এসব যুদ্ধে আমেরিকা প্রচুর সম্পদ ব্যয় করতে হয়েছে। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক কালের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, নয়-এগারোর পর আমেরিকা যেসব যুদ্ধে জড়িয়েছে, তাতে ব্যয় হয়েছে ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। বেসামরিক নাগরিক এবং মানবিক সহায়তার কাজে নিয়োজিত কর্মীসহ এসব যুদ্ধে ৯ লাখ মানুষ মারা গেছে। এত কিছুর পরও স্থায়ী কোনো ফলাফল আসেনি।

বাইডেন তাঁর দিক থেকে ‘ভালো সন্ত্রাসী’ ও ‘মন্দ সন্ত্রাসী’, এ রকম একটা পার্থক্য আঁকার চেষ্টা করছেন। দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি দাবি করেছেন, আইএসকে হচ্ছে তালেবানের চিরশত্রু। কিন্তু তিনি স্বীকার করছেন না, আইএসকে, আল–কায়েদার মতো তালেবানও মুক্ত পৃথিবীর চিরশত্রু। কাবুল বিমানবন্দরে বোমা হামলার পর বাইডেন আইএসকের ওপর দায় চাপিয়ে তালেবানকে নিষ্কৃতি দিয়ে দেন। এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেই দিয়েছেন, কাবুলের নতুন সরকারের সঙ্গে তারা ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ কাজ করতে প্রস্তুত।

কিন্তু তালেবান, আল–কায়েদা ও আইএসকে একই মতাদর্শ ধারণ করে এবং সশস্ত্র জিহাদের প্রতি তারা অঙ্গীকারবদ্ধ। পেন্টাগন স্বীকার করেছে, তালেবানের জয়ের পর হাজার হাজার আইএসকের বন্দী মুক্তি পেয়েছে। সাম্প্রতিক কালের জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, তালেবান ও আইএস এখনো খুব ঘনিষ্ঠ মিত্র। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তালেবান আর তাদের বিশেষ বাহিনী হাক্কানি নেটওয়ার্ক পৃথক সত্তা, এমন দাবি করে সত্য আড়াল করতে চাইছে। প্রকৃতপক্ষে তালেবান ও হাক্কানি নেটওয়ার্ক—দুই–ই পাকিস্তানি ‘ডিপ স্টেট’–এর শাখা। নেটওয়ার্কের নেতা সিরাজুদ্দিন হাক্কানি তালেবানের উপনেতা। তালেবান সরকার গঠনের আগে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইর প্রধানের কাবুল সফর এই বার্তা দেয়, আফগানিস্তানে প্রধান খেলোয়াড় পাকিস্তান।

আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ সমর্পণ করে আসার মধ্য দিয়ে আমেরিকা একটা বৃত্ত পূরণ করল। নয়-এগারোর হামলার পরিকল্পনাকারী ওসামা বিন লাদেনকে যারা আশ্রয় দিয়েছিল, তাদের হাতেই তারা ক্ষমতা দিয়ে এল। এই হামলা ১৯৮০–এর দশক থেকে সশস্ত্র ইসলামিক গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আমেরিকার যে মৈত্রী, সেটারই ফলাফল।

আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান মতাদর্শিক অস্ত্র হিসেবে ইসলামকে ব্যবহার করেছিলেন। বিন লাদেন, হাক্কানি নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা থেকে শুরু করে আল–কায়েদার সব নেতার হাতেখড়ি হয়েছিল সিআইএ পরিচালিত গোপন যুদ্ধের সময়। সেই যুদ্ধের আরেকজন ঝানু নেতা হলেন বর্তমান তালেবান নেতৃত্বে থাকা মোহম্মদ হাসান অখুন্দ। জাতিসংঘের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী এবং ২০০১ সালে বামিয়ানে বুদ্ধমূর্তি ধ্বংস করার পরিকল্পনাকারী তিনি।
ফলে নয়-এগারোর শিক্ষা ভুলে যাওয়ার মানে হচ্ছে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক লড়াই থেকে বিচ্যুত হওয়া।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

ব্রহ্ম চেলানি নয়াদিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বিষয়ের অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন