বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

জর্জ বুশ ২০০১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ওপরে আক্রমণকারীদের উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই শত্রুকে জয় করতে সমস্ত সম্পদ ব্যবহার করবে। আমরা বিশ্বকে একত্র করব। আমরা ধৈর্য ধরে থাকব। আমরা মনোনিবেশ করব এবং আমাদের সংকল্পে অবিচল থাকব। এই যুদ্ধে সময় লাগবে এবং সমাধান হবে, কিন্তু এ বিষয়ে কোনো ভুল করবেন না, আমরা জিতব।’ গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের চারজন প্রেসিডেন্ট—জর্জ বুশ, বারাক ওবামা, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেন—দায়িত্ব পালনকালে এই ‘যুদ্ধে’ অবিচল থেকেছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে কমপক্ষে দুই ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে এবং ভবিষ্যতে আরও চার ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। একসময় বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সহানুভূতি ও সমর্থনও পেয়েছে; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ জয়ী হয়েছে—এমন দাবি করা যাবে না। আফগানিস্তানের ক্ষমতায় তালেবানের প্রত্যাবর্তন তার সহজে দৃশ্যমান উদাহরণ। কিন্তু এটাও মনে রাখা দরকার, এই যুদ্ধের প্রকৃতি ও পরিসর কখনোই নির্ধারিত ছিল না। ‘শত্রু’ বলে কাকে, কখন, কীভাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, তার পদ্ধতি কারও জানা ছিল না। যে কারণে বিখ্যাত সাময়িকী ফরেন অ্যাফেয়ার্স–এর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সংখ্যায় যে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ—এ প্রশ্নের উত্তর কখনো পাওয়া যায়নি এই যুদ্ধে ‘বিজয়’ মানে কী?

কথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ বিষয়টি কেবল আফগানিস্তান যুদ্ধ দিয়ে বিবেচনা করলে তা হবে অসম্পূর্ণ। এই যুদ্ধের বাতাবরণে আন্তর্জাতিক আইনের বরখেলাপ ঘটিয়ে ইরাকে আগ্রাসন চালানো হয়েছে।

সন্ত্রাসবাদ একটি কৌশলমাত্র, ফলে ২০০১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ বলে যে ধারণা দিয়েছে, তা কেবল অস্পষ্টই ছিল না, তা ছিল তাদের ভূরাজনীতি এবং অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের পক্ষে সামরিক ব্যবস্থা। যে কারণে আফগানিস্তানে মার্কিন উপস্থিতির দুই দশকে লাভবান হয়েছে অস্ত্র ব্যবসায়ীরা; প্রাণ সংহার হয়েছে, ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, কিন্তু এই উপস্থিতির পরিণাম ইতিবাচক হয়নি। কৌশল বা আদর্শের বিরুদ্ধে কেবল সামরিক অভিযান বিজয়ের নিশ্চয়তা দেয় না, অন্যদিকে অসম যুদ্ধ বা এসেমট্রিক্যাল ওয়ারফেয়ারের কৌশল কী ধরনের হবে, দুই দশক ধরে তার কোনো সুস্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি। আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে এই যুদ্ধ কাউন্টার-টেররিজম থেকে কাউন্টার-ইনসারজেন্সিতে রূপান্তরিত হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র রাষ্ট্র গঠনের কাজে নিয়োজিত হয়েছে এবং ব্যর্থ হয়েছে।

কথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ বিষয়টি কেবল আফগানিস্তান যুদ্ধ দিয়ে বিবেচনা করলে তা হবে অসম্পূর্ণ। এই যুদ্ধের বাতাবরণে আন্তর্জাতিক আইনের বরখেলাপ ঘটিয়ে ইরাকে আগ্রাসন চালানো হয়েছে। যদিও এটাও ঠিক যে যুক্তরাষ্ট্রের নব্যরক্ষণশীল লবি, যাঁদের প্রতিনিধি হচ্ছেন ডিক চেনি, ডোনাল্ড রামসফিল্ড, পল উইলফউইজ, ১৯৯১ সালে থেকেই ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রেসিডেন্টদের ওপরে চাপ দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু ২০০১ সালের পরে তাঁরা একে জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলে পরিণত করতে সক্ষম হন। এই যুদ্ধের নামে দেশে দেশে ড্রোন হামলা হয়েছে, যার শিকার হয়েছে নিরপরাধ মানুষ।

এই যুদ্ধের শরিক কেবল যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ব্রিটেনকে বিবেচনা করলে হবে না; এর নামে দেশে দেশে জনবিচ্ছিন্ন শাসকেরা, বিশেষ করে কর্তৃত্ববাদীরা, তাদের শক্তি ও নজরদারি বৃদ্ধি করেছে, আইন তৈরি করেছে, নাগরিকদের অধিকার সীমিত করেছে। এ জন্য সব সময় যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ও আনুকূল্য দরকার হয়েছে, তা নয়। জর্জ বুশ এই যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে এক বিভাজনের কথা বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর সব অঞ্চলের দেশগুলোকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, হয় সে আমাদের সঙ্গে অথবা সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে।’ এই বিভাজনের সূত্র কেবল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতেই সীমিত থাকেনি; যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে তা বিরাজমান ইসলামভীতিকে এক ভয়াবহ জায়গায় নিয়ে গেছে। এখন মার্কিন রাজনীতিতে যে যুদ্ধংদেহী বিভাজন, শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদ, মুসলিমবিদ্বেষ, তাকে উসকে দেওয়ার পটভূমি অংশত এই মনোভাব।

এ ধরনের বিভাজন যুক্তরাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমা পেরিয়ে অন্যান্য দেশেও প্রসারিত হয়েছে; অন্য শাসকেরাও ব্যবহার করেছেন এবং করছেন—তাঁরা এবং তাঁদের সমর্থকেরা মুখে যতই মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির বিরোধিতা করুক, যতই কথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ বিরুদ্ধে কথা বলুন না কেন—তাঁদের আচরণ ও কার্যক্রমের মধ্যে প্রতিদিন এই বিভাজন, শত্রু তৈরি করার প্রবণতা, ভিন্নমতকে নিশ্চিহ্ন করার প্রবণতা প্রকাশিত। দেশে দেশে এভাবেই গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজে ‘ওয়ার অন টেররের’ ধারণাকে নিজস্ব রূপ দেওয়া হয়েছে; তার সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের উপস্থিতি থাকা না থাকা নির্ভর করেনি, কোথাও কোথাও তা নির্মাণ করা হয়েছে। আর যেখানে সহিংস উগ্রবাদীরা উপস্থিত থেকেছে, সেখানে একে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে আইন ও আইনের বাইরে এক ভয়ের সংস্কৃতির জন্ম দেওয়া হয়েছে।

দেশে দেশে এভাবেই গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজে ‘ওয়ার অন টেররের’ ধারণাকে নিজস্ব রূপ দেওয়া হয়েছে; তার সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের উপস্থিতি থাকা না থাকা নির্ভর করেনি, কোথাও কোথাও তা নির্মাণ করা হয়েছে। আর যেখানে সহিংস উগ্রবাদীরা উপস্থিত থেকেছে, সেখানে একে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে আইন ও আইনের বাইরে এক ভয়ের সংস্কৃতির জন্ম দেওয়া হয়েছে।

কথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে যারা আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছে, তারা যে কেবল প্রতিপক্ষের ওপর নিপীড়ন–নির্যাতনকে স্বাভাবিক রূপ দিয়েছে এবং নাগরিকদের অধিকার হরণ করেছে তা–ই নয়, নিরাপত্তা বৃদ্ধির নামে অর্থ ব্যয় করেছে প্রতিরক্ষা ও অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা খাতেও। নজরদারি থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে দিয়েছে। এসব খাতে বরাদ্দ, যা আরও বেশি কর্মসংস্থান করতে পারত, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে পারত, তা ঘটেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এসব দেশের ভবিষ্যতের জন্য কতটা ক্ষতিকর হবে, তা বিবেচনা করা হয়নি। ‘শত্রু নিধন’ ও ক্ষমতা রক্ষার বিষয় অগ্রাধিকার পেয়েছে।

গত দুই দশকে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় গৃহীত এসব ব্যবস্থা ক্ষেত্রবিশেষে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে; কেননা এগুলো তাদের সাহায্য করেছে আরও বেশি সদস্য সংগ্রহ করতে। এর একটি উদাহরণ হচ্ছে ইরাককে কেন্দ্র করে ২০১৪ সালে গড়ে ওঠা ইসলামিক স্টেট। সহিংস উগ্রবাদ মোকাবিলায় কেবল সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার এটাই কুফল। কিন্তু এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে ২০০১ সালের আগে এ ধরনের সন্ত্রাসী সংগঠন অনুপস্থিত ছিল। ১১ সেপ্টেম্বরে হামলা এবং পূর্ববর্তী বছরগুলোয় আল-কায়েদার শক্তি সঞ্চয়, আফগানিস্তানে ঘাঁটি গড়ে তোলা, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, বিভিন্ন দেশ থেকে জঙ্গিদের আফগানিস্তানে আগমন এবং ১৯৯৩ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের ওপরে হামলা প্রমাণ করে যে সন্ত্রাসী কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। এ ধরনের সংগঠনের ক্ষমতা বিষয়ে ধারণা ও এদের বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থার মাত্রা সঠিক ছিল কি না এবং সঠিক কৌশল অনুসৃত হয়েছে কি না, সেগুলো ভিন্ন প্রশ্ন, সমালোচনার বিষয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের একাংশ আফগানিস্তানে দীর্ঘ অভিযান ও উপস্থিতির পক্ষে যে যুক্তি দেয়, তা আসলে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ পক্ষেরই যুক্তি। তা হচ্ছে এতে একটি কেন্দ্রীয় সংগঠন হিসেবে আল-কায়েদাকে শক্তিহীন করে ফেলা সম্ভব হয়েছে। আল-কায়েদার আদর্শে উজ্জীবিত বিভিন্ন সংগঠন মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় উপস্থিত হয়েছে, কিন্তু তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য আশু হুমকি নয়, একেই তারা বলছে সাফল্য। ২০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র যে বড় ধরনের কোনো ধরনের সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়নি, এটাও তাদের একটি যুক্তি। এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় করা অর্থ এবং কমপক্ষে সাত হাজার মার্কিনের জীবননাশ যথাযথ কি না, সেই প্রশ্নের কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর নেই।

৯/১১-এর ২০ বছর পরে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের লজ্জাজনক পরাজয়ের প্রেক্ষাপটে নিঃসন্দেহে এক নতুন বাস্তবতার সূচনা হয়েছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের বাস্তবতাকে ‘৯/১১-উত্তর যুগ’ (পোস্ট নাইন-ইলেভেন এরা) বলে বর্ণনা করা হতো; এখন সম্ভবত এই যুগের নামকরণ হবে ‘৯/১১-উত্তর-উত্তর যুগ’ (পোস্ট-পোস্ট-৯/১১ এরা)। গত দুই দশকের ঘটনাপ্রবাহ, কৌশল ও ব্যর্থতা থেকে যুক্তরাষ্ট্র কি শিক্ষা নেবে তার ওপরে অংশত নির্ভর করবে বৈশ্বিক রাজনীতিতে, ভূকৌশলের দাবা খেলায় ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কী হবে। এটাই একমাত্র নির্ধারক বিষয় হবে না। কিন্তু ৯/১১-এর ২০ বছর পরে বিশ্ব আরেক বাস্তবতায় প্রবেশ করছে, সেটা অনস্বীকার্য।

  • আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন