বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে কোনো কাজেই আসেনি। আফগানিস্তানের নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য হানিফ সংখ্যালঘু তাজিক সম্প্রদায়ের। উত্তর-পুবের বাদাখশান প্রদেশের বাসিন্দা তিনি। ২০০১ সালে তালেবানের বিরুদ্ধে মার্কিন বিমান হামলা সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল।

২০০৯-২০১১ পর্যন্ত ইউএসএআইডির তহবিল থেকে আসা সহযোগিতার ৮০ শতাংশ ব্যয় হয়েছে আফগানিস্তানের দক্ষিণ ও পূর্ব অঞ্চলে। এই অঞ্চল আগে থেকেই ছিল তালেবানের ঘাঁটি। মার্কিন সিনেটের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এমনকি সহযোগিতার এ টাকাও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্পের বদলে স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার নানা কর্মসূচিতে ব্যবহৃত হয়েছে।

হানিফের নিজের প্রদেশ বাদাখশান এবং এর আশপাশের অঞ্চল চরম দারিদ্র্যপীড়িত। সেখানে দারিদ্র্যের হার ৬০ শতাংশের বেশি। যখন হানিফ আগের আমলের ব্যর্থতা নিয়ে কথা বলেছিলেন, তখন তাঁর মনে নিশ্চয়ই জন্মভূমির ছবি ভেসে এসেছিল।

হাজার বছর ধরে বাদাখশান নীলকান্তমণির মতো দামি রত্ন-পাথরের ভান্ডার। ২০১০ সালে মার্কিন সেনাবাহিনীর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আফগানিস্তানে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের মূল্যবান খনিজ সম্পদের মজুত রয়েছে। বিবিসির কাছে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আফগানিস্তানের সাবেক সম্পদবিষয়ক মন্ত্রী ওয়াহিদুল্লাহ শাহরানি জানিয়েছিলেন, প্রকৃতপক্ষে সেখানে আরও তিন গুণ বেশি খনিজ রয়েছে।

হামিদ কারজাই ও আশরাফ গনির আমলে শত বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সহযোগিতা সত্ত্বেও তাঁরা আফগান জনগণের মৌলিক প্রয়োজনগুলো মেটাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাঁদের শাসন এবং মার্কিন দখলদারির ২০ বছর পরও এখন তিনজন আফগানের মধ্যে একজনের খাবার জোটে না। ৭২ শতাংশ মানুষ সেখানে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, ৬৫ শতাংশ বিদ্যুৎ–সুবিধা পায় না

১৯৯২ সালের পর আহমেদ শাহ মাসউদ কাবুলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন। সে সময় তিনি পোল্যান্ডের একটি কোম্পানির সঙ্গে বাদাখশানের রত্ন উত্তোলন শুরু করেন। সে সময় প্রতিবছরে আনুমানিক ২০০ মিলিয়ন ডলার রত্ন বিক্রি করা হতো। তালেবান যখন মাসউদকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছিল, তখন তিনি পানশিরে ফিরে যান। ওই অঞ্চলের খনিজ সম্পদ বিক্রির অর্থ তিনি তালেবানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে কাজে লাগান। ২০০১ সালের পর খনির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় নর্দান অ্যালায়েন্সের কমান্ডারদের হাতে।

২০১২ সালে আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদমন্ত্রী ওয়াহিদুল্লাহ শাহরানি খনিজ উত্তোলন চুক্তিতে যে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে, সে তথ্য প্রকাশ করে দেন। তবে তাঁর আমলে নতুন একটি আইন প্রণয়ন করা হয়। ওই আইনে বিদেশি খনি কোম্পানিগুলোকে আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে অনেক বেশি স্বাধীনতা দেওয়া হয়। যুক্তরাজ্যের কোম্পানি সেন্টার, পোল্যান্ডের ধনকুবের জান ক্লুজকসহ বিদেশিরা সেখানকার স্বর্ণ, রৌপ্য ও রত্ন খনি উত্তোলনের উদ্যোগ নেয়। আফগানিস্তানের স্বর্ণ ও খনিজ কোম্পানিকে নিয়ে তারা সেখানে একটা বড় জোট গড়ে তোলে। তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর সেখানকার খনিজ এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে।

তালেবান এখন কী করবে? হানিফের এখন অসাধ্য সাধন করতে হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আফগানিস্তানে তাদের তহবিল স্থগিত করে দিয়েছে। মার্কিন সরকার আফগানিস্তানের রিজার্ভের ১০ বিলিয়ন ডলার আটকে দিয়েছে। তবে কিছু কিছু মানবিক সহায়তা এখন আফগানিস্তানে যাচ্ছে, কিন্তু সেটা পর্যাপ্ত নয়। তালেবানের কঠোর বিধিনিষেধ, বিশেষ করে মেয়েদের ওপর তারা যে বিধিনিষেধ দিয়েছে, তাতে করে অনেক দাতা সংস্থা সেখানে আর ফিরে যাবে না। আফগানিস্তান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেছেন, এখন তালেবান সরকারের সামনে কিছু করার সুযোগ খুব কম। খনিজ কোম্পানিগুলোর ওপর কোনো ধরনের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ গ্রহণযোগ্য হবে না। চুক্তিগুলোতে কিছু মানুষের মুনাফার সুযোগ আছে। কিন্তু পুরো দেশের মানুষের তাতে লাভবান হওয়ার সুযোগ নেই।

সাংহাই সহযোগিতা চুক্তি বাস্তবায়নে তেমন কোনো বাস্তব উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। ওই চুক্তিতে শুধু আন্তসীমানা সন্ত্রাসবাদ নয়, চোরাচালান বন্ধেরও অঙ্গীকার ছিল। আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চল দিয়ে বিপুল পরিমাণ হেরোইন ও আফিমের সঙ্গে টাকা, খনিজ, ধাতু ও রত্ন পাচার হয়ে যাচ্ছে। হানিফ তাঁর বক্তব্যে সরাসরি একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেননি। কিন্তু আফগানিস্তানের সম্পদের নিয়ন্ত্রণ যদি আফগান সরকার নিতে না পারে, তাহলে জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন তারা করতে পারবে না।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া

বিজয় প্রসাদ ভারতীয় ইতিহাসবিদ ও সাংবাদিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন