বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

‘ছাত্রলীগ ও লাঠি’ সার্চ দিলে গুগল মোট ৫৬ হাজার ৩০০ রেজাল্ট দেখায়।

কিন্তু মানুষের মনের ভেতরে কি গুগল সার্চ করা যায়! আপনি যদি আজকে বাংলাদেশের শিশু-কিশোর-তরুণ শিক্ষার্থীদের মনের মধ্যে এ ধরনের একটা গুগল সার্চ করতে পারেন, দেখবেন, রেজাল্ট আসবে ‘ভীতি’, ‘আতঙ্ক’, ‘অপছন্দ’। আমাদের কোমলমতি কিশোর-তরুণদের কাছে একটি ছাত্রসংগঠন এখন ভীতির নাম, আতঙ্কের নাম, অপছন্দের নাম। তাদের ইমেজ বা প্রতিচ্ছবি হলো লাঠি হাতে ছুটে আসা একটা পেটোয়া বাহিনী। আমি ‘অপছন্দ’ শব্দটা ব্যবহার করলাম, কিন্তু আমার পরিচিত শিশু-কিশোর ছাত্রছাত্রীরা এর চেয়েও নেতিবাচক একটা শব্দ ব্যবহার করে এই সংগঠনটির নাম শুনলেই!

এই মুহূর্তে মনে পড়ছে অকালপ্রয়াত মাহবুবুল হক শাকিলের কথা। তিনি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ছিলেন। ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর মারা যান। ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। ছিলেন রাজপথের সংগ্রামী পরিশ্রমী নেতা। ছিলেন কবি ও গল্পকার। একদিন তিনি আমাকে ফোন করে কাঁদতে থাকেন। আমি বলি, এই শাকিল ভাই, কী হয়েছে? তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আনিস ভাই, এই কি সেই ছাত্রলীগ, যা আমি করেছি, বঙ্গবন্ধু গড়েছেন? আমি বলি, কী হয়েছে, খুলে বলুন। তিনি বলেন, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের ছেলেরা শিক্ষকদের সমাবেশে হামলা করেছে!

হাফ ভাড়ার প্রশ্নে সরকারের কোনো দায়িত্বশীল মহল কোনো কথা বলছে না কেন? সমস্যাটা জটিল। কারণ, বাসগুলো বেসরকারি। সরকার বললেই হাফ ভাড়া হয়ে যাবে না। কিন্তু ডিজেলের দাম ২৩ ভাগ বাড়তে না বাড়তেই যদি বাসভাড়া ২৭ ভাগ বৃদ্ধি সরকার করে দিতে পারে, এই দাবির ফয়সালা সরকারকেই করতে হবে। তা না করে রাস্তায় লাঠি হাতে পেটায়া বাহিনী মোতায়েন কেন?

শাকিলের সেই কান্না আজ তাঁর মৃত্যুর প্রায় পাঁচ বছর পর আবার মনে পড়ছে! বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার ছাত্রলীগের নেতাদের হাতে প্রকাশ্য জনসভায় বই ও খাতা তুলে দিয়েছেন। এই বই-খাতা-কলম প্রতীক। ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি হোক—তারা পড়াশোনা করে, তারা ছাত্র, মেধাবিকাশে তারা তৎপর, ভবিষ্যতের নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য তারা নিজেদের তৈরি করছে!

বই-খাতার বদলে তারা তুলে নিয়েছে লাঠি! হাফ বাসভাড়া শিক্ষার্থীদের নিজস্ব আন্দোলন। কোটা সংস্কার শিক্ষার্থীদের নিজেদের চাওয়া। নিরাপদ সড়ক শিক্ষার্থীদের নিজস্ব দাবি। যেকোনো ছাত্রসংগঠনের বুদ্ধিমান নেতারা এসব দাবির প্রতি সহমর্মী হবেন, সহবর্তী হবেন, যাতে আন্দোলন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকে, ছাত্রদের মধ্যে তাঁদের সংগঠনের জনপ্রিয়তা বাড়ে। তা না করে লাঠি হাতে সরকারি ছাত্রসংগঠন যদি বেরিয়ে পড়ে, অরাজনৈতিক কিশোর শিক্ষার্থীদের মারধর করে, তাহলে ওই সংগঠনের ভাবমূর্তি দাঁড়ায় আতঙ্ক, ভীতি, অপছন্দ!

আর হাফ ভাড়ার প্রশ্নে সরকারের কোনো দায়িত্বশীল মহল কোনো কথা বলছে না কেন? সমস্যাটা জটিল। কারণ, বাসগুলো বেসরকারি। সরকার বললেই হাফ ভাড়া হয়ে যাবে না। কিন্তু ডিজেলের দাম ২৩ ভাগ বাড়তে না বাড়তেই যদি বাসভাড়া ২৭ ভাগ বৃদ্ধি সরকার করে দিতে পারে, এই দাবির ফয়সালা সরকারকেই করতে হবে। তা না করে রাস্তায় লাঠি হাতে পেটায়া বাহিনী মোতায়েন কেন? তবে আশার কথা হলো সরকার শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়ার আইনি ভিত্তি দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে।

এদিকে গত বুধবার ময়লার গাড়ির নিচে চাপা পড়ে নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা আবার রাস্তায় নেমেছে। শিক্ষার্থীরা যখন রাজপথে, তখনই গতকাল রাজধানীর পান্থপথে ময়লার গাড়ির নিচে চাপা পড়ে মারা গেছেন আরও একজন। পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আগেই যেন তা সামাল দেওয়া হয়। ছাত্রলীগকে যেন কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের প্রতিপক্ষ হিসেবে হেলমেট মাথায় ও লাঠি হাতে রাস্তায় নামানো না হয়।

আমার আবারও মাহবুবুল হক শাকিলের কান্নার শব্দ মনে পড়ছে। যাঁরা ছাত্রলীগকে ভালোবাসেন, ছাত্রলীগের ভালো চান, চান যে দেশের শিক্ষার্থীরা এই সংগঠনকে ভালোবাসুক, পরিস্থিতি দেখে কান্না ছাড়া তাঁরা আর কীই-বা করতে পারেন?

নিশ্চয়ই কিছু করার আছে। ছাত্রদের মনে একটা ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। এটা নিরসন করার উদ্যোগ নিতে হবে। ধোঁয়া আছে, মানে আগুনও আছে। সেই আগুন নেভাতে হবে। দেশে সব সমস্যার সমাধান কি একা প্রধানমন্ত্রী করবেন? আর নেতারা কই? মন্ত্রীরা কই? করোনার সময় কঠোর বিধিনিষেধ করতে হবে, কিন্তু নেতা-মন্ত্রী-এমপিদের এলাকায় কি জনমত তৈরি করতে দেখা গেছে? দেশে মন্দিরে হামলা হচ্ছে, নেতারা কেন ছুটে যাবেন না এলাকায় এলাকায়, কেন শান্তির পক্ষে সম্প্রীতির পক্ষে জনমত তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন না?

নেতারা থাকেন ঢাকায়। কলেজছাত্ররা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছেন, কোনো নেতা-মন্ত্রী কোনো কথা বলেন না। তাঁরা চেয়ে আছেন ওই একজনের দিকে। তিনি সব করতে পারেন, কাজেই তিনিই সব করবেন।

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়া অনুষ্ঠানে সমবেত শিশু-কিশোরদের বলেছিলেন, তোমরা বই পড়ে কি শুধু ঘরে বসে থাকবে? দেশের প্রয়োজন হলে রাস্তায় নামবে না? দেশের প্রয়োজন হলে সংগ্রাম করবে না? শিক্ষার্থীরা বলেছিলে, করব। হ্যাঁ, দেশের প্রয়োজনে লাঠি ধরতে হতে পারে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পুরান ঢাকায় আওয়ামী লীগের সভা করবেন—সে ১৯৫০-এর দশকের কথা—মুসলিম লীগ গুন্ডা পাঠিয়েছে জনসভা পণ্ড করতে, যুবক শেখ মুজিব একা ছুটে গেলেন মঞ্চের দিকে, গুন্ডারা পালিয়ে গেল। ষাটের দশকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা করতে আসছে একদল হামলাবাজ, সংবাদপত্র অফিস থেকে লাঠি হাতে দুজন সঙ্গীসহ বেরিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ধাওয়া দিলেন দাঙ্গাকারীদের, দাঙ্গাবাজেরা পালিয়ে গেল। লাঠি ধরতে হবে হামলাবাজদের বিরুদ্ধে, দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে। আজকে সরকারি ছাত্রসংগঠন যদি সারা দেশে সম্প্রীতি কমিটি করে সাম্প্রদায়িক হামলাবাজদের রুখে দেওয়ার কর্মসূচি দিত, তাহলে তা হতো একটা কাজের কাজ! তা না করে তারা ব্যবহৃত হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা করার কাজে!

কাঁদুন, মাহবুবুল হক শাকিল, কাঁদুন।

আনিসুল হক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন